টানা চার বছরের উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে নতুন অর্থবছরে ৭.৫ শতাংশের মধ্যে আটকে রাখার যে লক্ষ্য ঠিক করেছে বিএনপি সরকার, তা পূরণে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, সেটা অর্জন করতে হলে অনেক ভালো ভালো পদক্ষেপ নিতে হবে। বাস্তবসম্মত মুদ্রানীতি অবলম্বন করতে হবে। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি আরো কিছুদিন চালিয়ে নিতে হবে।
খাদ্য সরবরাহ ঠিক রাখতে হবে। চালে সরবরাহজনিত সমস্যা আছে, উৎপাদনে। সেখানে নজর দিতে হবে। জ্বালনি সংকট রয়েছে; সেটার সমাধান প্রয়োজন।
নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে শুক্রবার (১২ জুন) আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি একথা বলেন। গুলশানের একটি হোটেলে ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬–২৭: সিপিডি’র পর্যালোচনা’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সবশেষ তথ্যে দেখা যায়, মে মাসে মূল্যস্ফীতির হার আরও বেড়ে ১৬ মাসের সর্বোচ্চ হয়েছে। সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে।
পয়েন্ট টু পয়েন্টে ভিত্তিতে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ সার্বিক মূল্যস্ফীতির মানে হল, গত বছর মে মাসে যে পণ্য বা সেবা ১০০ টাকায় মিলেছে, তা চলতি বছরে মে মাসে পেতে খরচ করতে হয়েছে ১০৯ টাকা ৪২ পয়সা।
দেশে বর্তমানে মূল্যস্ফীতির যে পারদ, তা বাড়তে থাকে মূলত কোভিড মহামারীর ধাক্কায়। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে মহামারীর পাশাপাশি রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধকেও সামনে আনে।
কিন্তু কোনো কোনো বিশ্লেষক এবং সরকারবিরোধী অনেক রাজনীতিক উচ্চ মূল্যস্ফীতির পেছনে আওয়ামী লীগ সরকারের দুর্নীতি ও অর্থপাচারের হাত থাকার কথাও বলেন।
চব্বিশের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর প্রায় দেড় বছর রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তবর্তী সরকার।
এ সময়ে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ ও গভর্নর আহসান এইচ মনসুর একাধিকবার আশ্বাস দিয়েছিলেন মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনার। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
পর্যালোচনায় সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন, গত চার বছর ধরেই মূল্যস্ফীত চড়া। এখন একটা ক্রিটিকাল সময়, কারণ হলো জ্বালানি সংকট। সামষ্টিক অর্থনীতির প্রায় সকল সূচক চাপের মুখে রয়েছে।
সামষ্টিক অর্থনীতি দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। রিজার্ভ একটু বাড়ছে, রেমিটেন্স বাড়ছে। অন্যান্য সূচক ভালো অবস্থানে নেই। এমন প্রেক্ষাপটে জিডিপির প্রাক্কলন করা হয় ৬ .৫ শতাংশ। কিন্তু চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত সরকারি হিসাবেই ৪ শতাংশের বেশি; এটা কীভাবে হবে তাও বিবেচনায় নিতে হবে।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, চলতি অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়ন সক্ষমতা দেখলে বোঝা যায় আগামী বাজেট বাস্তবায়নের বড় আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে। এতো বড় বাজেটের বড় আকাঙ্ক্ষাটাই বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি বলেন, ‘ব্যক্তিখাতে ঋণ প্রবাহের প্রবৃদ্ধি আগামী বাজেটে ধরা হয়েছে ৯ দশমিক ৪ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের বাজেটে গত এপ্রিল পর্যন্ত হয় ৪.৭৫ শতাংশ। ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ এখনো নিম্নমুখী ধারায় রয়েছে।
এমন বাস্তবতায় দেখা যায়, ব্যক্তি খাতের এক ধরনের অনীহা ও আস্থার অভাব রয়েছে, লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে তা ফিরিয়ে আনতে হবে।
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে ঋণের নির্ভরতা বাড়ছে মন্তব্য করে ড. ফাহিমদা বলেন, অর্থনীতিতে উন্নয়ন ব্যয় বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়ে ও আয়ের পথ তৈরি হয়। কিন্তু রাজস্ব আদায় কীভাবে বাড়ানো হবে তাও বিবেচনায় নিতে হবে।
আগের দিন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার ব্যয়ের বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। টাকার এই অঙ্ক চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের তুলনায় ১৯ শতাংশ বেশি। বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।
নতুন অর্থবছরের বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬.৫ শতাংশ ও মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশ নির্ধারণের ঘোষণা আসে। ব্যয় মেটাতে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।
তবে বিনিয়োগ খরা, দুর্বল ব্যাংক ও আর্থিক খাত, ধীরগতির রাজস্ব আদায়, রপ্তানির নেতিবাচক ধারা ও চড়া মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা অর্থনীতিতে কীভাবে এ দুই লক্ষ্য অর্জন করা হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পথরেখার আলোকপাত দেখা যায়নি।