ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির রূপরেখা

সুমন হাওলাদার

বাণিজ্য

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম বাজেট যা বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের বাজেট হিসেবে মনে করা হচ্ছে।বৃহস্পতিবার (১১ জুন)আগামী অর্থবছর ২০২৬-২৭ এর

2026-06-11T09:18:23+00:00
2026-06-11T09:18:23+00:00
  শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬,
২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
 
শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬
বাণিজ্য
বাজেট ২০২৬-২৭
ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির রূপরেখা
সুমন হাওলাদার
বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬, ৯:১৮ এএম 
সংগৃহীত ছবি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম বাজেট যা বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের বাজেট হিসেবে মনে করা হচ্ছে।  

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) আগামী অর্থবছর ২০২৬-২৭ এর জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার রেকর্ড বাজেট ঘোষণা করা হবে। জাতীয় সংসদে এই বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

আগের বছরের চেয়ে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সাত হাজার কোটি টাকা কমিয়ে সাত লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। সেই হিসাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রায় ১৯ শতাংশ বেশি হতে যাচ্ছে। 

এর আগে সাধারণত বাজেটের আকার ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে বাড়ানো হতো। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, রাজনৈতিক সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার দ্রুত বাস্তবায়নের চাপ থেকেই বাজেটের আকার বড় হচ্ছে।

অর্থ বিভাগের অভ্যন্তরীণ পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, আগামী অর্থবছরে একসঙ্গে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, ভর্তুকির ক্রমবর্ধমান চাপ সামাল দেওয়া, উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ সঞ্চালন নিশ্চিত করা, ঋণ ধারণ সক্ষমতা বজায় রাখা এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করা। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ালেও প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছে অর্থ বিভাগ।

অর্থ বিভাগ মনে করছে, কৃচ্ছ্রসাধন নীতি থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসার চাপও বাজেট ব্যবস্থাপনাকে জটিল করে তুলবে। বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সারের ভর্তুকি খরচ মেটানোর পাশাপাশি উন্নয়ন প্রকল্পে প্রয়োজনীয় অর্থ ছাড় নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, রাজস্ব আয় বাড়াতে নতুন বাজেটে মোটরসাইকেল ও অটোরিকশার ওপর অগ্রিম আয়কর বসানোর চিন্তা করেছিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। 

বিত্তশালী ব্যক্তিদের ওপরও সম্পদ কর আরোপের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিল সংস্থাটি; কিন্তু সরকারের সর্বোচ্চ মহল থেকে সবুজ সংকেত না পাওয়ায় আপাতত এসব কর আরোপের চিন্তা থেকে পিছু হটেছে এনবিআর। 

এ পরিস্থিতিতে সরকারের উচ্চ বাজেট ব্যয়ের অর্থসংস্থান নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।

সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, দেশের রাজস্ব আদায়ের বর্তমান সক্ষমতা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থপ্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নতুন বাজেটে যে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে, তা উচ্চাভিলাষী। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় সম্ভব না হলে অর্থায়নের চাপ আরও বাড়বে এবং পুরো বাজেটের বাস্তবায়নযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়বে। 

তিনি আরও বলেন, সরকারের নীতিনির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাজেটের আকার নয়, বরং এর বাস্তবায়ন সক্ষমতা। পরিকল্পিত ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকর রাজস্ব আহরণ নিশ্চিত না করা হলে বড় বাজেট কেবল অর্থনৈতিক চাপই বাড়াবে। 

সাবেক এই অর্থ সচিব আরও উল্লেখ করেন, দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করায় দেশে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। তবে এ ধরনের মুদ্রানীতির সঙ্গে যথাযথ সমন্বয় না হলে সরকারি নীতি কাক্সিক্ষত ফল দেবে না এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগও কার্যকর হবে না।

২০২৬-২৭ অর্থবছরে ব্যয়ের অর্থ জোগাতে সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২৩ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা পাঁচ লাখ ৬৯ হাজার কোটি টাকা। প্রকৃত সংগ্রহ কোনোভাবেই পাঁচ লাখ কোটি টাকা ছাড়াবে না বলে ধারণা করছেন অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা। 

২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে চার লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল তিন লাখ ৬৬ হাজার কোটি টাকা।
নতুন অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) জন্য ছয় লাখ চার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে, যা তাদের আগের সর্বোচ্চ আদায়ের তুলনায় প্রায় দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা বেশি। 

২০২৪-২৫ অর্থবছরে এনবিআরের প্রকৃত আদায় ছিল তিন লাখ ৬১ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছর সংস্থাটিকে লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয় চার লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা। 

বিপরীতে প্রথম ৯ মাসে সংস্থাটির ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা, যা যে কোনো সময়ের তুলনায় রেকর্ড। গত অর্থবছরের পুরো সময়ে এনবিআরের ঘাটতি ছিল ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা, যা তখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ছিল।

নতুন অর্থবছরে এনবিআরবহির্ভূত উৎস থেকে ৯১ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহ করতে চায় সরকার। চলতি অর্থবছরে যার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ৬৫ হাজার কোটি টাকা। 

প্রথম ৯ মাসে এ উৎস থেকে রাজস্ব এসেছে প্রায় ৪৭ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যা ছিল ৪৮ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে এসেছিল ৪৭ হাজার কোটি টাকা।

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, ইতোমধ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির পাইলট কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আগামী অর্থবছরে এ কর্মসূচির আওতায় ৪১ লাখ মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় প্রতিটি নারীপ্রধান পরিবার মাসে পাবে দুই হাজার ৫০০ টাকা। এতে আগামী অর্থবছরে ব্যয় হবে ১২ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা।

একইভাবে ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচির পরীক্ষামূলক কার্যক্রমও শুরু হয়েছে, যেখানে প্রথম ধাপে ২০ হাজার কৃষককে দুই হাজার ৫০০ টাকা করে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে এই কর্মসূচি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী অর্থবছর থেকে প্রথমবারের মতো আটটি নতুন সামাজিক কর্মসূচি যুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। 

সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে এক লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা করা হচ্ছে, যা চলতি অর্থবছরের এক লাখ ১৬ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা ও আগের অর্থবছরের এক লাখ ৩৬ হাজার ২৬ কোটি টাকার তুলনায় বেশি।

আগামী অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখা হচ্ছে এক লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের ৯৭ হাজার ৮০০ কোটি টাকা থেকে অনেক বেশি। 

বর্তমানে যে পরিমাণ বরাদ্দ দেওয়া আছে, তা বাস্তবায়নেই অনেক ধীরগতি রয়েছে। শিক্ষা খাতের বাজেটের আওতায় পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৫) প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৯ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা, যার বিপরীতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৯ হাজার ২৯৭ কোটি টাকা। 

স্বাস্থ্য খাতে আগামী অর্থবছরে বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ৬৯ হাজার ৩০০ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের ৩৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকার প্রায় দ্বিগুণ। এত ব্যয়ের সক্ষমতা তৈরি করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রস্তাবিত বাজেটের বিপরীতে ঘাটতি থাকবে প্রায় ২ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির প্রায় ৪ শতাংশ। ঘাটতি পূরণে ব্যাংকিং খাত থেকে প্রায় ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। 

আগামী অর্থবছরে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হচ্ছে প্রায় ৭ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে প্রায় ৬ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা রয়েছে। 

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ধরা হয়েছে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। উন্নয়ন ব্যয়ের বড় অংশ দেশীয় ও বৈদেশিক উৎস থেকে সংগ্রহ করা হবে। 

বাজেটে সরকারের মূল ফোকাস হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে ডি-রেগুলেশন, সৃজনশীল অর্থনীতি এবং দীর্ঘমেয়াদে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির রূপরেখা। 

এছাড়া দারিদ্র্য হ্রাস, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। 

সরকারের ফ্ল্যাগশিপ কর্মসূচি হিসেবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচিকে বাজেটে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে। বাজেট বক্তৃতায় অতীত সরকারের সময়ের ঋণ পরিস্থিতি ও সুদ ব্যয়ের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি তুলে ধরা হতে পারে। 

বিশেষ করে বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ ঋণের বড় ধরনের বৃদ্ধি এবং সুদ ব্যয়ের চাপকে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে উপস্থাপন করা হবে বলে জানা গেছে। আগামী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬.৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশের মধ্যে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।


Loading...
Loading...

বাণিজ্য- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: