সীমান্তে অবৈধভাবে পুশইন, হত্যা এবং জোরপূর্বক কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার ঘটনায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সঙ্গে ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের (বিএসএফ) সম্পর্কের টানাপড়েনের মধ্যেই আজ শুরু হচ্ছে সীমান্ত সম্মেলন।
সোমবার (৮ জুন) ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বিজিবি-বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ে ৫৭তম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। ৫৬তম সম্মেলনটি ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বিগত বছরগুলোতে যেসব সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেখানেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল সীমান্ত হত্যা। বিএসএফ প্রতিশ্রুতি দিয়েও কখনো সীমান্ত হত্যা বন্ধ করেনি। এমন পরিস্থিতিতে এবারও সীমান্ত হত্যার পাশাপাশি অবৈধভাবে পুশ ইন করা এবং শূন্যরেখায় কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া নিয়ে একাধিক সীমান্তে মুখোমুখি হওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে।
এবারের সীমান্ত সম্মেলনে পুশ ইন বন্ধ এবং হুটহাট করে কাঁটাতারের বেড়া না দেওয়ার বিষয়টি সম্মেলনে মূল গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিজিবি সদর দপ্তর জানিয়েছে, বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে মহাপরিচালক পর্যায়ের ৪ দিনব্যাপী ৫৭তম সীমান্ত সম্মেলন চলবে ১১ জুন পর্যন্ত।
এবারের সম্মেলনে বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকীর নেতৃত্বে ১৫ সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল অংশগ্রহণ করছে।
বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলে বিজিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, ভূমি জরিপ অধিদপ্তর ও যৌথ নদী কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রতিনিধিত্ব করবেন।
অপরদিকে, বিএসএফ মহাপরিচালকের নেতৃত্বে ভারতীয় প্রতিনিধিদল সম্মেলনে অংশগ্রহণ করবেন। ভারতীয় প্রতিনিধিদলে বিএসএফের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ছাড়াও ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার কর্মকর্তারা প্রতিনিধিত্ব করবেন।
বিজিবির নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, ৫৬তম সম্মেলনটি গত বছরের আগস্ট মাসে ঢাকায় বিজিবি সদর দপ্তর পিলখানায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই সম্মেলনে প্রধান ইস্যু ছিল সীমান্ত হত্যা বন্ধ করা।
এ ছাড়া অবৈধ চোরাচালান, মাদক ও অবৈধ অস্ত্র পাচার, সীমান্তের দেড়শ গজের মধ্যে অনমুতি ছাড়া যেকোনো কাজ বন্ধসহ বিভিন্ন ইস্যুতে আলোচনা হয়েছিল।
কিন্তু সম্প্রতি বিএসএফ কর্তৃক বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে পুশ ইন করার চেষ্টা শুরু হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শুরু হওয়া পুশইন গত কয়েক মাসে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। অবৈধভাবে এসব পুশ ইন প্রতিরোধ করছে বিজিবি। পুশ ইনের পাশাপাশি সম্প্রতি সীমান্ত হত্যা আগের মতো শুরু হয়েছে। এবারও আলোচনায় পুশ ইন ও সীমান্ত হত্যা বন্ধ আলোচনায় প্রাধান্য পাবে।
সূত্র জানিয়েছে, পুশ ইন ও সীমান্ত হত্যা বন্ধের দাবির পাশাপাশি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এবারের সম্মেলনে আলোচনা হবে। বিশেষ করে ফেনি সীমান্তে মহুরীর চরে বিজিবি কর্তৃক সীমান্ত পিলার নির্মাণের বিষয়টি এবার আলোচনা হবে। বিজিবি মুহুরীর চরে স্থায়ীভাবে সীমান্ত পিলার নির্মাণ করবে।
এ ছাড়া দহগ্রাম সীমান্তে অপটিক ফাইবার স্থাপন নিয়ে আলোচনা হবে। সীমান্ত নিরাপত্তায় দহগ্রামের সীমান্তে অপটিক ফাইবার স্থাপন করতে চায় বাংলাদেশ। বিষয়টি বিএসএফের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।
এ ছাড়া সীমান্তসহ বিভিন্ন ইস্যুতে ভারতীয় গণমাধ্যম কর্তৃক নানা ধরনের গুজব ছড়ানো, মিথ্যা তথ্য দিয়ে বাংলাদেশের বিষয়ে অপপ্রচার না করার বিষয়েও আলোচনা হবে।
সূত্র আরও জানিয়েছে, ভারতের সঙ্গে আন্তঃসীমান্তে যেসব নদী রয়েছে, সেসব নদীর তীর সংরক্ষণে আলোচনা করা হবে। নদীর তীর সংরক্ষণে বিজিবি কর্তৃক কিছু কার্যক্রম হাতে নেওয়া হবে।
এ ছাড়া পার্বত্য অঞ্চলের সীমান্তে বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর যেকোনো ধরনের অপতৎপতা বন্ধে বিজিবি এবং বিএসএফ একসঙ্গে কাজ করার প্রস্তাব বিজিবির পক্ষ থেকে দেওয়া হবে। পার্বত্য অঞ্চলে বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতবাদী সংগঠনগুলো কার্যক্রম পরিচালানার তথ্য পাচ্ছে বিজিবি। এসব সন্ত্রাসী সংগঠনের কার্যক্রম বন্ধে বিজিবি বিএসএফের সহযোগিতা চাইবে।
এ ছাড়া সীমান্ত এলাকার আকাশসীমায় যেকোনো ধরনের ড্রোন ওড়ানো বন্ধ রাখতে বিএসএফকে প্রস্তাব দেওয়া হবে।
সীমান্ত সম্মেলনে অংশ নেওয়া বিজিবি কর্মকর্তারা জানান, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত সম্মেলনে প্রধান ইস্যু থাকে সীমান্ত হত্যা বন্ধ। প্রতিবছর বিএসএফ সীমান্তে নিরীহ বাংলাদেশিদের গুলি করে হত্যার ঘটনা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতি তারা কখনো পালন করে না।
আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন সীমান্ত হত্যা বন্ধে একাধিকবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ভারত। যদিও তারা দাবি করে, বিএসএফ আক্রান্ত হওয়ার কারণে আত্মরক্ষায় তারা গুলি চালায়। অথচ বিজিবি কর্তৃক কখনো সীমান্ত হত্যার ঘটনা ঘটেনি। সীমান্তে মারণাস্ত্র ব্যবহার না করার প্রতিশ্রুতি ছিল বিগত সম্মেলনগুলোতে। কিন্তু তারা সেই প্রতিশ্রুতিও রাখেনি।
মহাপরিচালক পর্যায়ে চার দিনব্যাপী সীমান্ত সম্মেলন প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সীমান্তে অবৈধ পুশ-ইন, সীমান্ত হত্যা এবং অন্যান্য সীমান্ত নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়সহ সামগ্রিক বিষয়গুলো এই বৈঠকে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হবে। বিজিবিসীমান্তে অত্যন্ত সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। যেকোনো ধরনের অবৈধ পুশ-ইন বা অনুপ্রবেশের চেষ্টা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে।
এর আগে একই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মন্ত্রী বলেন, এটি একটি নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া। এই ডায়ালগে মাদক পাচার রোধ ও সীমান্ত নিরাপত্তাসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট সব বিষয় উত্থাপিত হবে।’
সীমান্ত হত্যা প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক আইনি ব্যাখ্যা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ‘অন্য দেশের বাহিনী যদি আমাদের সীমানায় বা জিরো লাইনে এসে হত্যাকা- ঘটায়, তবেই তা সীমান্ত হত্যা। কিন্তু যদি উভয় দেশের সীমান্তের অভ্যন্তরে কোনো অবৈধ অনুপ্রবেশ বা চোরাচালানজনিত অপরাধের কারণে কোনো ঘটনা ঘটে, তবে তা সংশ্লিষ্ট দেশের অভ্যন্তরীণ আইনে নিয়ন্ত্রিত হয়।
পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর পুশ ইনের শঙ্কার বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, সরকার অবৈধ ‘পুশ ইন’ বা ‘পুশ ব্যাক’-এর নীতিগতবিরোধী।
ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে যদি কোনো নাগরিকের ন্যাশনাল আইডি ভেরিফিকেশন সংক্রান্ত কোনো তালিকা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়, তবে তা প্রচলিত কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়ায় সমাধান করা হবে। বর্তমানে এ জাতীয় কোনো বিষয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পেন্ডিং নেই।