স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে রাজনীতির মাঠে নতুন সমীকরণ

আজহারুল হক ফরাজী

জাতীয়

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণের পথ কার্যত বন্ধ করে দেওয়ার প্রস্তুতি

2026-06-07T10:03:18+00:00
2026-06-07T11:56:17+00:00
  সোমবার, ৮ জুন ২০২৬,
২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
 
  ই-পেপার   
           
সোমবার, ৮ জুন ২০২৬
জাতীয়
নিষিদ্ধ সংগঠন নিয়ে ইসির খসড়া নীতিমালা
স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে রাজনীতির মাঠে নতুন সমীকরণ
আজহারুল হক ফরাজী
রোববার, ৭ জুন, ২০২৬, ১০:০৩ এএম  আপডেট: ০৭.০৬.২০২৬ ১১:৫৬ এএম
ফাইল ছবি
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণের পথ কার্যত বন্ধ করে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও সরকার। নির্বাচনী আচরণবিধিতে নতুন বিধান যুক্ত করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের প্রার্থী হওয়া ঠেকানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এই উদ্যোগের বিপরীতে তৃণমূল পর্যায়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। সম্ভাব্য প্রার্থী নির্ধারণ, সাংগঠনিক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং সামাজিকভাবে সক্রিয় হওয়ার মধ্য দিয়ে দলটি রাজনৈতিক মাঠে ফেরার কৌশল আঁটছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

ইসি সূত্র বলছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা ও আচরণবিধি সংশোধনের যে খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে, সেখানে নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী প্রত্যেক প্রার্থীকে একটি অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করতে হবে। ওই অঙ্গীকারনামায় উল্লেখ থাকবে, তিনি কোনো নিষিদ্ধ বা নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। ভুল বা গোপন তথ্য দিলে নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই বিধান কার্যকর হলে আওয়ামী লীগের পদধারী নেতা-কর্মীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় দলটির কার্যক্রম বর্তমানে নিষিদ্ধ রয়েছে।

স্থানীয় নির্বাচনেও নতুন বাধা: নির্বাচন কমিশনের খসড়া সংশোধনী অনুযায়ী, ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রার্থীদের রাজনৈতিক পরিচয় ও সম্পৃক্ততার বিষয়ে অতিরিক্ত যাচাই-বাছাই করা হবে। একই সঙ্গে আচরণবিধির বিভিন্ন ধারায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। ইসি কর্মকর্তাদের ভাষ্য, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যে ধরনের বিধান সংযোজন করা হয়েছিল, স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও তার প্রতিফলন দেখা যাবে। উদ্দেশ্য হচ্ছে নিষিদ্ধ সংগঠনের কোনো ব্যক্তি যেন নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জনপ্রতিনিধি হওয়ার সুযোগ না পান।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নির্বাচন কর্মকর্তা ভোরের ডাককে বলেন, নির্বাচন কমিশনের লক্ষ্য কোনো নির্দিষ্ট দলকে টার্গেট করা নয়। তবে বিদ্যমান আইন ও বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে নতুন বিধান আনা হচ্ছে। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বাস্তবে এই বিধানের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে আওয়ামী লীগের ওপর। কারণ বর্তমানে নিষিদ্ধ কার্যক্রমের আওতায় থাকা সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি হচ্ছে দলটি।

তৃণমূলে প্রস্তুতি থেমে নেই: সরকার ও ইসির এই উদ্যোগের মধ্যেও আওয়ামী লীগের স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীরা নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রস্তুতি শুরু করেছেন। দলীয় সূত্রগুলো বলছে, জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ না পেলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে তারা রাজনৈতিকভাবে পুনর্গঠনের একটি সুযোগ হিসেবে দেখছেন।

দলের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা এবং সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য, জনপ্রিয় এবং বিতর্কমুক্ত ব্যক্তিদেরও সামনে আনার চিন্তা রয়েছে।

আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা জানা গেছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় আওয়ামী লীগকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। স্থানীয় পর্যায়ে আমাদের সাংগঠনিক ভিত্তি এখনো শক্তিশালী। নির্বাচন হলে নেতাকর্মীরা অংশগ্রহণের উপায় খুঁজবেন।

স্থানীয় একাধিক নেতা জানিয়েছেন , কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থেকে নেতাকর্মীদের নির্বাচনী পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এবার দলীয় প্রতীক থাকবে না। দল থেকে নির্দেশনা পেলে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটি।

একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন বিভিন্ন জেলার সম্ভাব্য চেয়ারম্যান ও সদস্য প্রার্থীরাও। তাদের দাবি, নির্বাচন সুষ্ঠু ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হলে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা ভোটের মাঠে থাকার চেষ্টা করবেন।

রাজনৈতিক মাঠে সীমিত উপস্থিতি: ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রমে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বড় অংশ আত্মগোপনে চলে যান, কেউ দেশত্যাগ করেন, আবার অনেকে বিভিন্ন মামলার মুখোমুখি হন।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন জাতীয় দিবস, সামাজিক কর্মসূচি ও পেশাজীবী সংগঠনের ব্যানারে আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাদের সক্রিয়তা বেড়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব কর্মকাণ্ড মূলত রাজনৈতিক মাঠে ফেরার একটি কৌশলগত প্রস্তুতির অংশ। স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে সেই তৎপরতা আরও বাড়তে পারে।

ইসির নতুন বিধানে কী থাকছে: নির্বাচন কমিশনের খসড়া আচরণবিধিতে আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নির্বাচনী প্রচারে কাগজের পোস্টার ও রেক্সিনের তৈরি সামগ্রী ব্যবহার নিষিদ্ধ করা, রাজনৈতিক নেতাদের ছবি ব্যবহার না করা এবং ডিজিটাল প্রচারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের সুযোগ রাখা।

এছাড়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান এবং পৌরসভার মেয়রদের ‘সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে তারা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে কোনো প্রার্থীর পক্ষে প্রচারে অংশ নিতে পারবেন না। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা মনে করছেন, এসব বিধান স্থানীয় নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার কমাতে সহায়ক হবে।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হলেও রাজনৈতিক দলের প্রভাব পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়।

সাবেক নির্বাচন কর্মকর্তা ও নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, দলীয় প্রতীক না থাকলেও রাজনৈতিক দলগুলো অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী সমর্থন দেয় এবং তাদের পক্ষে কাজ করে।

তাদের আশঙ্কা, একদিকে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ সীমিত করার উদ্যোগ, অন্যদিকে তৃণমূলে দলটির প্রস্তুতিÑ এই দুই বাস্তবতা স্থানীয় নির্বাচনকে নতুন রাজনৈতিক বিতর্কের দিকে নিয়ে যেতে পারে।


Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: