ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) তত্ত্বাবধানে রাজধানীর হাজারীবাগ ও কাপ্তানবাজারে নির্মিত ১৩৩ কোটি টাকার দুই আধুনিক পশু জবাইখানা কার্যত অচল অবস্থায় পড়ে আছে। উদ্বোধনের পর সাত বছর পার হলেও হাজারীবাগ জবাইখানায় গরু জবাই হয়েছে মাত্র একবার, আর এরপর আর কোনো পশু জবাই হয়নি বলে জানা গেছে।
নিরাপদ মাংস সরবরাহ নিশ্চিত করা, জবাইয়ের আগে পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার লক্ষ্য নিয়ে এসব জবাইখানা নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই উদ্দেশ্য এখনো পূরণ হয়নি।
নির্মাণ ও ব্যয়
ডিএসসিসি সূত্রে জানা যায়, হাজারীবাগের জবাইখানার নির্মাণ শুরু হয় ২০১৭ সালের আগস্টে এবং শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২০ সালের জুনে। তবে নির্মাণ শেষ হওয়ার আগেই ২০১৯ সালে এটি উদ্বোধন করা হয়।
অন্যদিকে কাপ্তানবাজার জবাইখানার নির্মাণ শুরু হয় ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে, একই সময়ে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পূর্ণ কার্যকর হয়নি।
দুটি জবাইখানায় মোট ব্যয় হয় প্রায় ১৩৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে হাজারীবাগে খরচ হয় প্রায় ৮১ কোটি টাকা এবং কাপ্তানবাজারে প্রায় ৫২ কোটি টাকা।
সক্ষমতা থাকলেও ব্যবহার নেই
অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি থাকা সত্ত্বেও হাজারীবাগ জবাইখানায় ঘণ্টায় প্রায় ৩০টি গরু ও ৬০টি ছাগল জবাইয়ের সক্ষমতা রয়েছে। কাপ্তানবাজারে রয়েছে ঘণ্টায় ১৪টি গরু ও ৩০টি ছাগল জবাইয়ের সক্ষমতা।
তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, হাজারীবাগ জবাইখানার প্রধান ফটক দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। নিরাপত্তা ব্যবস্থাও কার্যত অনুপস্থিত। ভবনের ভেতরের যন্ত্রপাতি নিয়মিত ব্যবহার না হওয়ায় সেগুলো নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
কেন চালু হচ্ছে না
সিটি করপোরেশনের সূত্র বলছে, জবাইখানা দুটি অচল থাকার মূল কারণ ইজারা না পাওয়া এবং পরিচালনাগত জটিলতা। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও কেউ আগ্রহ দেখায়নি।
এর একটি বড় কারণ হিসেবে স্থানীয় মাংস ব্যবসার প্রচলিত কাঠামোকে দায়ী করা হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা নিজেদের দোকান বা বাজারের পাশেই পশু জবাই করেন, ফলে আলাদা পরিবহন বা ফি দিতে হয় না। এই বাস্তবতা বদল না হলে আধুনিক জবাইখানায় আগ্রহ তৈরি হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পরিকল্পনা ও বাস্তবতা
শুরুতে হাজারীবাগ জবাইখানাটি তিন বছরের জন্য ইজারা দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। ইজারামূল্য কয়েক দফা কমিয়েও কোনো দরপত্র পাওয়া যায়নি। পরে আরও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও কার্যত অগ্রগতি হয়নি।
সম্প্রতি আবারও জবাইখানা দুটি চালুর জন্য নতুন করে কমিটি গঠন করেছে ডিএসসিসি। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু কমিটি গঠন নয়, বাস্তবভিত্তিক ব্যবসায়িক মডেল ও কঠোর নীতিমালা ছাড়া প্রকল্পটি সচল করা কঠিন হবে।
প্রশাসনের বক্তব্য
ডিএসসিসির প্রশাসক জানিয়েছেন, আধুনিক জবাইখানা কীভাবে কার্যকর করা যায় তা নিয়ে নতুন করে কাজ চলছে এবং যেকোনোভাবেই এটি চালুর চেষ্টা করা হবে।
তবে নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, কোটি কোটি টাকার এই অবকাঠামো যদি ব্যবহার না হয়, তবে তা নগর উন্নয়নের বড় ব্যর্থতার উদাহরণ হিসেবেই থেকে যাবে।