প্রায় দেড় দশক ধরে জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে যুগপৎ আন্দোলন করেছে অর্ধ শতাধিক রাজনৈতিক দল।
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর বিএনপির দীর্ঘদিনের মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক আর দৃঢ় হয়েছিল। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসার পর স্পষ্ট করেই দেখা গেছে মিত্রদের সঙ্গে তাদের সম্পর্কে ধুলো জমে গেছে।
দেশের নানা সংকটে ঐক্যবদ্ধ থাকার লক্ষ্যে বিএনপির চেয়াম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারে বলে জানিয়েছেন দলটির একাধিক র্শীর্ষ নেতা। আসন্ন ঈদুল আজহার পরপরই এই সাক্ষাত হতে পারে বলে জানান তারা। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাত হলে সরকারের নানা দফতরের কাজে অংশ নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করবেন অভিমানী ও ‘বঞ্চিত’ দাবি করা একাধিক শরিক দলের নেতারা।
বিএনপির ‘একলা চলো’ নীতি ও শরিকদের অংশীদারিত্বের প্রত্যাশা: দীর্ঘদিন রাজপথে একসঙ্গে লড়াই করলেও সরকার গঠনের পর থেকে শরিকদের মধ্যে এক ধরনের অবহেলার অনুভূতি দানা বেঁধেছে।
শরিকদের অভিযোগ, ক্ষমতার স্বাদ পাওয়ার পর বিএনপি অনেকটা ‘একলা চলো’ নীতি অনুসরণ করছে। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে নির্যাতিত হয়েও জাতীয় নির্বাচনে শরিকদের আশানুরুপ আসন ছাড় দেওয়া হয়নি, নির্বাচনের পর সংরক্ষিত নারী আসনে শরিক দলগুলোকে কোনো মূল্যায়ন করা হয়নি; যা তাদের মধ্যে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
নির্বাচনের আগে কোনো আলোচনা ছাড়াই একতরফাভাবে ২৭২ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করা শরিকদের জন্য ছিল একটি বড় আঘাত। তাদের মতে, বিএনপির সরকার গঠন করার কৃতিত্ব একা বিএনপির নয় বরং শরিকদেরও দীর্ঘ ত্যাগের ফসল; কিন্তু ত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন তারা পাননি।
বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে যুক্ত থাকা অর্ধশত শরিক দলকে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে মাত্র ডজনখানেক আসন ছেড়ে দেয়। তাদের ভোট করতে হয়েছে নিজস্ব প্রতীকেই। একাই ৪ আসন ছাড় পাওয়া দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম হেরে যায় ৪টিতেই।
শরিকদের ১২ আসনের মধ্যে জয় পান- গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর এবং বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) আন্দালিব রহমান পার্থ। এর মধ্যে জোনায়েদ সাকি ও নুরুল হক নুর বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন।
শরিকরা এখন শুধু রাজপথের সঙ্গী হয়ে থাকতে রাজি নয়। তারা চান রাষ্ট্র পরিচালনার কর্মপরিকল্পনায় সরাসরি ভূমিকা রাখতে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আসন্ন বৈঠকে তারা সরকারের তিন মাসের সফলতা ও ব্যর্থতার পর্যালোচনার পাশাপাশি দেশ পরিচালনায় নিজেদের সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ চাইবেন।
শরিক নেতারা জানান, সরকার পরিচালনার কাজে অংশীদারিত্ব দেওয়া কোনো দয়া-দাক্ষিণ্য নয় , বরং এটা তাদের পরিশ্রমের অধিকার।
১২ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা মোস্তফা জামাল হায়দার বলেন, আমরা রাজপথ থেকে একসঙ্গে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছি এবং এই লড়াই এখনো চলমান। আমরা এখন সরকারের সঙ্গে কাজ করার পরিবেশ ও সুযোগ চাই।
বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, প্রধানমন্ত্রী আমাদের ডাকলে মিত্র শরিক হিসেবে অবশ্যই আমরা সেই ডাকে সাড়া দেব।
শরিকদের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক কীভাবে আরও উন্নত করা যায়, সে বিষয়গুলো তুলে ধরব। আমরা গণতন্ত্রকে আরও সুসংহত করতে এবং সরকারের গণতান্ত্রিক কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে চাই।
দল ছেড়ে বিএনপিতে আসা নেতাদেরও দীর্ঘশ্বাস: শুধু জোটের শরিকরাই নয়, বঞ্চনার শিকার হয়েছেন তারেক রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে নিজস্ব দল বিলুপ্ত করে অথবা ওই দলের শীর্ষ পদ ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেওয়া নেতারাও। চলতি বছরের শুরুতে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন শরিক বিভিন্ন দলের সাত নেতা।
তারা হলেন- গণফোরামের সাবেক মহাসচিব ড. রেজা কিবরিয়া, এলডিপির সাবেক মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমদ, এলডিপির (একাংশ) সাবেক চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম, বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা, এনডিপির সাবেক চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ, ফরিদুজ্জামান ফরহাদ ও গণঅধিকার পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান। এদের মধ্যে রেজা কিবরিয়া, শাহাদাত হোসেন সেলিম এবং ববি হাজ্জাজ ধানের শীষ প্রতীকে জয়ী হয়ে সংসদে গিয়েছেন।
এছাড়া যোগদানের চার মাস পেরিয়ে গেলেও নেতারা এখনো কোনো সাংগঠনিক পদ বা সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব পাননি। তাদের অনেকেই এখন সরকারের কোনো দফতরে কিংবা দলের শীর্ষ পর্যায়ে মর্যাদাকর অবস্থানের আশায় প্রহর গুনছেন।
বিএনপির লিয়াজোঁ কমিটি ও স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, শরিকদের সঙ্গে আলোচনা একটি চলমান প্রক্রিয়া। যেহেতু অনেক দল, সেজন্য সবার সঙ্গে বসতে কিছুটা সময় লাগবে। দেশের স্বার্থে ও রাজনীতিতে ঐক্য ধরে রাখতে আমরা সবাইকে নিয়ে চলতে চাই।