রাজধানীর জলাবদ্ধতা ও মশা নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক দল ও নগরবাসীকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুস সালাম। তিনি বলেছেন, রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে ঢাকাকে বাসযোগ্য নগরীতে রূপ দিতে হবে।
শনিবার (২৩ মে) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে নগর উন্নয়ন সাংবাদিক ফোরাম, বাংলাদেশের আয়োজনে ‘ঢাকায় বৃষ্টি ভোগায় কেন?’ শীর্ষক নগর সংলাপে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার এবং প্রকৌশলী-পরিকল্পনাবিদ মো. নুরুল্লাহ। সংগঠনের সভাপতি মতিন আব্দুল্লাহর সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক হাসান ইমনের সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য দেন রিহ্যাব সভাপতি ড. আলী আফজাল, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সহসভাপতি শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান, ঢাকা ওয়াসার সাবেক এমডি এ কে এম শহিদ উদ্দিন, ক্যাপস চেয়ারম্যান আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার ও স্থপতি খালিদ মাহমুদ শাহীন।
ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে ঢাকাকে প্রায়ই দূষিত, দুর্গন্ধময় ও মশার নগরী হিসেবে তুলে ধরা হয়। তবে জনগণ ও সিটি করপোরেশন সমানভাবে দায়িত্ব পালন করলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।
তিনি দাবি করেন, রাজধানীর প্রায় ৯৯ শতাংশ মশার উৎপত্তি জলাবদ্ধতা থেকে। তাই জলাবদ্ধতা দূর করা গেলে ডেঙ্গুর প্রকোপও উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। এ লক্ষ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে প্রথমবারের মতো প্রাক-বর্ষা লার্ভা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ৩৬ জন মাঠকর্মী প্রতিদিন ওয়ার্ডভিত্তিক বাড়ি বাড়ি গিয়ে জরিপ চালাচ্ছেন। ২ হাজার ২৫০টি বাড়ি থেকে লার্ভার নমুনা সংগ্রহ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা শনাক্ত করা হবে।
নাগরিক অসচেতনতার সমালোচনা করে আব্দুস সালাম বলেন, বাসাবাড়ি, ছাদবাগান কিংবা পরিত্যক্ত পাত্রে জমে থাকা পানিতে মশার বংশবিস্তার হলেও দায় চাপানো হয় সিটি করপোরেশনের ওপর।
রাজধানীর জলাবদ্ধতার জন্য অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও খাল-পুকুর ভরাটকে দায়ী করে তিনি বলেন, ঢাকায় কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ধোলাইখালকে বক্স কালভার্টে রূপান্তরের সমালোচনা করে তিনি জানান, নগরীর পানি নিষ্কাশনের জন্য আরও প্রধান ড্রেনেজ চ্যানেল প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, নিউমার্কেট, ধানমন্ডি বা এলিফ্যান্ট রোডের পানি অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। এসব পানি শেষ পর্যন্ত বুড়িগঙ্গা বা শীতলক্ষ্যায় নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে।
রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও হকার বৃদ্ধির প্রসঙ্গ তুলে ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, নিবন্ধনের বাইরে কোনো হকার বা রিকশা চলতে দেওয়া হবে না। কোথায় কতজন হকার বসতে পারবেন, তারও সীমা নির্ধারণ করা হবে। পাশাপাশি সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ‘হলিডে মার্কেট’ চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, নতুন সরকারকে সময় দিতে হবে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ভুলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ ও নগর ব্যবস্থাপনায় সব রাজনৈতিক দলকে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে হবে।
রিহ্যাব সভাপতি ড. আলী আফজাল বলেন, একসময় ঢাকায় প্রায় ৫০টি খাল ও লেক ছিল, যা এখন অনেকটাই বিলুপ্ত। জলাবদ্ধতা নিরসনে একক কোনো সংস্থার পক্ষে কাজ করা সম্ভব নয়; প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ।
তিনি অভিযোগ করেন, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির লাইনের কাজের কারণে সারা বছর সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি চলায় ব্যয় বাড়ছে এবং জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে একটি শহরকে দুই সিটি করপোরেশনে ভাগ করাও ব্যবস্থাপনায় জটিলতা সৃষ্টি করছে।
মশা গবেষক অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার তার গবেষণায় জানান, বেজমেন্ট ও পার্কিং এলাকায় জমে থাকা পানিতে ৬৪ শতাংশ মশার জন্ম হয়। তার মতে, পরিবেশ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মশা নিয়ন্ত্রণই সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি।
তিনি বলেন, কীটনাশক কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। ড্রেনে গাপ্পি মাছ ছাড়া ও পরিবেশবান্ধব বিটিআই ব্যাকটেরিয়ার ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি।
জলাবদ্ধতা নিরসনে উপস্থাপিত প্রস্তাবে দ্রুত ড্রেনেজ সার্কেলের জনবল কাঠামো অনুমোদন, সমন্বিত ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং দুই সিটি করপোরেশনের যৌথ বাস্তবায়ন কার্যক্রমের সুপারিশ করা হয়। পাশাপাশি ওয়ার্ডভিত্তিক নাগরিক কমিটি ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে স্টেকহোল্ডার কমিটি গঠনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়।