সরকার বদলালে বদলে যায় শিক্ষাক্রম, সঙ্গে পাঠ্যপুস্তকের আধেয়। রাজনৈতিক কারণে শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটেছে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে। বিপুল ব্যয়ে প্রণীত একটি শিক্ষাক্রমের বাস্তবায়ন মাঝপথে আটকে দিয়ে চালু করা হয় নতুন-পুরোনোর মিশ্রণে জোড়াতালির এক শিক্ষাব্যবস্থা। দুই শিক্ষাক্রমের মাঝখানে পড়ে এখন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা যেমন বিভ্রান্ত হচ্ছেন তেমনি নিশ্চিত হচ্ছে না শিক্ষার মান। এখনো সংকটের আবর্তে ঘুরছে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা। ন্যাশনাল স্টুডেন্ট অ্যাসেসমেন্টের রিপোর্ট অনুযায়ী, শিক্ষাক্রমে ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী প্রাথমিক শেষ করেও প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন করতে পারছে না। ফলে উচ্চতর শ্রেণিতে ড্রপআউট বা ঝরে পড়ার হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। এই পদ্ধতি আমাদের সক্ষমতা তৈরি বা নতুন নলেজ জেনারেশনে কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বর্তমান সরকার নতুন শিক্ষাক্রম প্রণয়নের পরিকল্পনা করছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় বর্তমান সরকার আবারও শিক্ষাক্রমে বড় পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে পাঠ্যবই পরিমার্জন, কারিকুলাম রিভিউ এবং নতুন শিক্ষাক্রম প্রণয়ন। নতুন পরিকল্পনায় প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, দক্ষতাভিত্তিক পাঠদান এবং বাস্তব জীবনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত শিখনকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি হাতেকলমে শেখা, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা এবং সৃজনশীল চিন্তাভাবনাকে শিক্ষার মূল লক্ষ্য হিসেবে ধরা হয়েছে। ডিজিটাল কনটেন্ট, ইন্টারঅ্যাকটিভ লার্নিং এবং আধুনিক শিক্ষণ পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। বর্তমান সরকার নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন।
তিনি বলেন, শিক্ষা কারিকুলাম পরিবর্তনের প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং সম্ভাব্য তিন মাসের মধ্যেই কারিকুলাম পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা চলছে। উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, পাঠ্যবইয়ে ইতিহাস সংশোধন হচ্ছে, যুক্ত হবে গণ-অভ্যুত্থান। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তকে থাকা ‘একপেশে ইতিহাস’ ও সংশোধন করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, বিশ্বজুড়ে এআই এবং মেশিন লার্নিংয়ের প্রভাবে কর্মবাজারের ধরন বদলে যাচ্ছে। মুখস্থনির্ভরতা থেকে বের হয়ে স্কিল-বেজড এবং ইনোভেশন-বেজড কারিকুলামে যাওয়া তখন সময়ের দাবি ছিল। এজন্য নতুন শিক্ষাক্রমের কাজ হাতে নেওয়া হয়। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রণীত সর্বশেষ এই শিক্ষাক্রম প্রশ্নের ঊর্ধে ছিল না।
বাস্তবায়ন শুরুতেই নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের একটি বড় অংশের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও অসন্তোষ দেখা দেয়। লিখিত পরীক্ষার গুরুত্ব কমে যাওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনায় আগ্রহ হারাচ্ছে এমন অভিযোগ তুলে অভিভাবকরা আন্দোলনে নামেন, লেখালেখি শুরু করেন অনেকেই। ২০২২ সালের শিক্ষাক্রমে দলগত কাজ ও প্রকল্পভিত্তিক কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা হলেও তা বাস্তবে নানা জটিলতার সৃষ্টি করেছিল। অনেক শিক্ষকও মূল্যায়ন পদ্ধতি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা দিতে পারতেন না। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ নিয়েও রয়েছে বড় ধরনের প্রশ্ন। নতুন শিক্ষাক্রমের মতো জটিল ধারণা আয়ত্ত করার জন্য যেখানে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের প্রয়োজন সেখানে অনেক শিক্ষক মাত্র পাঁচ দিনের প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। ফলে তারা শ্রেণিকক্ষে এই পদ্ধতি প্রয়োগে হিমশিম খাচ্ছিলেন। নতুন শিক্ষাক্রমে ব্যবহারিক ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য শিক্ষা উপকরণও অনেক ক্ষেত্রে সহজলভ্য ছিল না। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে এসব উপকরণ সংগ্রহ করা কঠিন ও ব্যয়বহুল। ফলে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চাইলেও কার্যক্রমগুলো ঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারেনি। সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে। সামষ্টিক লিখিত পরীক্ষার পরিবর্তে ধারাবাহিক মূল্যায়নের ওপর জোর দেওয়া হলেও এটি এখনও অধিকাংশের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেনি।
শিক্ষক-অভিভাবকদের বড় একটি অংশের আপত্তির মধ্যেই ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে নতুন জাতীয় শিক্ষাক্রমের বাস্তবায়ন শুরু করে সরকার। প্রথম ধাপে প্রাথমিকের প্রথম শ্রেণি এবং মাধ্যমিকের ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে এই শিক্ষাক্রম চালু করা হয়। পরবর্তীকালে ২০২৪ সালে যুক্ত হয় প্রাথমিকের দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণি এবং মাধ্যমিকের অষ্টম ও নবম শ্রেণি। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৫ সালে চতুর্থ, পঞ্চম ও দশম শ্রেণি, ২০২৬ সালে একাদশ এবং ২০২৭ সালে দ্বাদশ শ্রেণি যুক্ত হয়ে ধাপে ধাপে পুরো শিক্ষাক্রম চালু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাধা আসে নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে। একপর্যায়ে নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নযোগ্য নয় বলে ঘোষণা দেন অন্তর্বর্তী সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা।
অন্তর্বর্তী সরকার ২০২২ সালের নতুন শিক্ষাক্রম থেকে সরে এসে ধাপে ধাপে ২০১২ সালের সৃজনশীল শিক্ষাক্রমে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে জারি করা পরিপত্রের ভিত্তিতে ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিক স্তরের (বিশেষ করে নবম ও দশম শ্রেণি) জন্য ২০১২ সালের জাতীয় শিক্ষাক্রমের আদলে পরিমার্জিত পাঠ্যপুস্তক চালু করা হয়। এতে আবারও বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা এই শাখা বিভাজন বা গ্রুপ সিস্টেম ফিরিয়ে আনা হয়। অন্যদিকে প্রাথমিক ও নিম্ন-মাধ্যমিক স্তরে নতুন শিক্ষাক্রম সম্পূর্ণ বাতিল না করে বরং ধারাবাহিকতা বজায় রেখে পরিমার্জনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রাক-প্রাথমিক থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত বিদ্যমান কাঠামো অনুসরণ করে চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তক সংশোধন করে বই দেওয়া হয়। একইসঙ্গে ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকও ২০২৪ সালের কাঠামো বজায় রেখে সংশোধিত আকারে সরবরাহ করা হয়। মূল্যায়ন ব্যবস্থায়ও পরিবর্তন আনা হয়। আগে চালু থাকা ধারাবাহিক মূল্যায়নের কিছু অংশ সংশোধন করে বিষয়ভিত্তিক মূল্যায়ন কাঠামো পুনর্বিন্যাস করা হয়।
কিন্তু ২০১২ সালের শিক্ষাক্রমে পঞ্চম শ্রেণি শেষে পিইসি এবং অষ্টম শ্রেণি শেষে স্কুলে জেএসসি ও মাদ্রাসায় জেডিসি বোর্ড পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকলেও সেই পরীক্ষাগুলো পুনর্বহাল করা হয়নি। চলতি বছর ২০২৬ সালেও একইভাবে ২০১২ সালের আদলে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের জন্য একটি সংক্ষিপ্ত সিলেবাস প্রণয়ন করা হয়।
বিশেষ করে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা এই বিভাগভিত্তিক কাঠামোর মধ্য থেকেই শিক্ষার্থীদের পাঠ্যসূচি পুনর্বিন্যাস করা হয় যাতে তারা নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা সম্পন্ন করতে পারে। একইসঙ্গে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে কিছু পরিমার্জিত পাঠ্যপুস্তক প্রাথমিক, মাধ্যমিকসহ বিভিন্ন স্তরে দেওয়া হয়। ৬ষ্ঠ থেকে ৯ম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যবইগুলো নতুন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংশোধন করা হয় যেখানে বিষয়বস্তু হালনাগাদ ও কিছু অংশ পুনর্গঠন করা হয়।
এ বিষয়ে গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘কারিকুলাম সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া এটি পৃথিবীর পরিবর্তন ও শিক্ষার্থীদের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়েই করতে হয়। বর্তমান যুগে তথ্যনির্ভর যে চাহিদা তৈরি হয়েছে, তাই পরিবর্তন করা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের দেশে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আগের নীতিগুলো পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায় যা ঠিক নয়। কারিকুলাম নিয়মিত পর্যালোচনা করে যুগোপযোগী করতে হবে।’