ফের উত্তপ্ত-অশান্ত ক্যাম্পাস

শাকিল আহমেদ

শিক্ষা

দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আবারও অস্থির হয়ে উঠেছে ক্যাম্পাস পরিস্থিতি। কোথাও উপাচার্য নিয়োগ ঘিরে সংঘর্ষ, কোথাও প্রশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন, আবার

2026-05-18T11:23:41+00:00
2026-05-18T11:23:41+00:00
  রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬,
২১ আষাঢ় ১৪৩৩
 
রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬
শিক্ষা
ভিসি নিয়োগ-নিরাপত্তা সংকট
ফের উত্তপ্ত-অশান্ত ক্যাম্পাস
শাকিল আহমেদ
সোমবার, ১৮ মে, ২০২৬, ১১:২৩ এএম 
সংগৃহীত ছবি
দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আবারও অস্থির হয়ে উঠেছে ক্যাম্পাস পরিস্থিতি। কোথাও উপাচার্য নিয়োগ ঘিরে সংঘর্ষ, কোথাও প্রশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন, আবার কোথাও নিরাপত্তাহীনতা ও বিচারহীনতার অভিযোগে উত্তাল শিক্ষার্থীরা। কয়েক মাসের তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতির পর মে মাসের মাঝামাঝি এসে দেশের একাধিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান নতুন করে উত্তেজনা, বিক্ষোভ ও সহিংসতায় কেঁপে উঠেছে। বিশেষ করে ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট) এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো নিয়ে শিক্ষাঙ্গনে তৈরি হয়েছে ব্যাপক উদ্বেগ। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে গাজীপুরের ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (ডুয়েট)। নতুন উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে টানা কয়েকদিন ধরে চলা আন্দোলন রোববার রণক্ষেত্রে রূপ নেয়। শিক্ষার্থীদের দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ এবং পুলিশের হস্তক্ষেপে পুরো ক্যাম্পাস অচল হয়ে পড়ে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সংঘর্ষে অন্তত ১৫ থেকে ২০ জন আহত হয়েছেন; আহতদের মধ্যে শিক্ষার্থী ছাড়াও কয়েকজন পুলিশ সদস্য রয়েছেন। 

জানা গেছে, সম্প্রতি সরকার শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকবালকে ডুয়েটের নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয়। কিন্তু নিয়োগ ঘোষণার পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের একাংশের শিক্ষার্থীরা এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলনে নামে। তাদের দাবি, ডুয়েট একটি বিশেষায়িত প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় এখানকার বাস্তবতা সম্পর্কে অভিজ্ঞ অভ্যন্তরীণ শিক্ষক থেকেই উপাচার্য নিয়োগ দিতে হবে। বহিরাগত কাউকে চাপিয়ে দেওয়া হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বকীয়তা ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ব্যাহত হবে। 

আন্দোলনের অংশ হিসেবে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেয় এবং ‘লাল কার্ড’ কর্মসূচি পালন শুরু করে। পরে নবনিযুক্ত ভিসির সমর্থক হিসেবে পরিচিত আরেকটি পক্ষ এবং আন্দোলনকারীদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা সংঘর্ষে রূপ নেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ডুয়েট মেডিকেল সেন্টারের চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক ছিল এবং কয়েকজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। অধিকাংশ আহতের মাথা ও চোখে গুরুতর আঘাত রয়েছে। 

ঘটনাটি রাজনৈতিক মাত্রাও পেয়েছে। সংঘর্ষের পর ছাত্রদল ও অন্যান্য সংগঠন বিবৃতি দিয়ে একে পরিকল্পিত অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা বলে অভিযোগ করেছে। অন্যদিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা দাবি করছেন, বহিরাগতদের এনে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। ফলে পুরো পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে।

এদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও উত্তেজনা কমেনি। এক নারী শিক্ষার্থীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে অভিযুক্তকে দ্রুত গ্রেপ্তার না করায় প্রশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফুঁসছেন শিক্ষার্থীরা। এর আগে প্রক্টর অফিসে তালা দেওয়ার পর আন্দোলনকারীরা প্রশাসনিক ভবনেও তালা ঝুলিয়ে দেয়। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রশাসন ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে ক্যাম্পাসে ছাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রায়ই নানা ঘটনায় ‘সময়ক্ষেপণ’ কৌশল নেয়। এতে অপরাধীরা পার পেয়ে যায় এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় দ্রুত বিচার এবং প্রক্টরিয়াল বডির পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলনকারীরা একের পর এক কর্মসূচি ঘোষণা করছেন। ফলে জাবিতেও স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দীর্ঘদিন ধরেই জমে থাকা প্রশাসনিক অস্বচ্ছতা, দলীয় প্রভাব, শিক্ষার্থী রাজনীতি এবং নিরাপত্তা সংকট এখন একসঙ্গে বিস্ফোরিত হচ্ছে। বিশেষ করে উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েই এখন বিরোধ ও বিভক্তি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবির সঙ্গে রাজনৈতিক শক্তির হিসাব-নিকাশও মিশে যাচ্ছে।

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষক ( নাম প্রাকাশে অনিচ্ছুক) ভোরের ডাককে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে এমন সংকট আরও বাড়বে। তার মতে, বিশ্ববিদ্যালয় কেবল প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও গণতান্ত্রিক পরিসর। সেখানে মতবিরোধ থাকতেই পারে, কিন্তু তা সহিংসতায় রূপ নেওয়া ভয়াবহ সংকেত।

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের প্রবেশ ও প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ডুয়েটের ঘটনায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছেন, বহিরাগতরা ক্যাম্পাসে ঢুকে হামলা চালিয়েছে। একই ধরনের অভিযোগ অতীতেও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা গেছে। এতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে পড়ছে।

এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এখন ক্যাম্পাস রাজনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে। বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে ফেসবুকসহ অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে। এতে দ্রুত জনমত তৈরি হলেও একইসঙ্গে উত্তেজনা ও বিভ্রান্তিও বাড়ছে। সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোতেও দেখা গেছে, বাংলাদেশের আন্দোলন-রাজনীতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক শক্তি হিসেবে কাজ করছে। 

শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বড় উদ্বেগ এখন একটাই, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আদৌ স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ ফিরবে কি না। একের পর এক সংঘর্ষ, আন্দোলন ও প্রশাসনিক অচলাবস্থায় সেশনজট, পরীক্ষা স্থগিত এবং মানসিক চাপে পড়ছেন শিক্ষার্থীরা। বিশেষ করে আবাসিক ক্যাম্পাসগুলোতে নিরাপত্তাহীনতা নতুন আতঙ্ক তৈরি করছে।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের সমাধানমূলক উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়নি। অনেকের মতে, কেবল পুলিশি নিয়ন্ত্রণ বা প্রশাসনিক নির্দেশনা দিয়ে এই সংকট সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কার্যকর সংলাপ।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যদি দ্রুত আস্থা ও নিরাপত্তার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা না যায়, তাহলে উচ্চশিক্ষা খাত আরও বড় সংকটে পড়বে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় অশান্ত হলে শুধু শিক্ষা কার্যক্রমই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হয়।

সব মিলিয়ে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ফের অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ায় উদ্বেগ বাড়ছে সর্বত্র। ডুয়েটের সংঘর্ষ, জাহাঙ্গীরনগরের আন্দোলনসহ সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো স্পষ্ট করে দিয়েছে, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও গভীর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক টানাপোড়েনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কত দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে পারে


Loading...
Loading...

শিক্ষা- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: