দেশের বাজারে কয়েক সপ্তাহ ধরেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। বিশেষ করে ডিম, সবজি, ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির মাংসের দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়িয়েছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন অঞ্চলের বাজারে প্রতি ডজন ডিমের দাম ১৫০ টাকার ঘর ছাড়িয়েছে। মৌসুমি সবজির দামও অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ ক্রেতার নাগালের বাইরে চলে গেছে। একইভাবে মুরগির মাংসের দামও স্থিতিশীল নেই। এমন পরিস্থিতিতে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে নিত্যপণ্যে কর ও শুল্ক কমিয়ে বাজারে স্বস্তি ফেরানোর উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, এবারের বাজেটে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোকে অন্যতম অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ক্রমবর্ধমান বাজারদরের চাপে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো যখন হিমশিম খাচ্ছে, তখন সরকার নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে করের চাপ কমিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক বার্তা দিতে চায়।
বাজেট সংশ্লিষ্ট আলোচনায় উঠে এসেছে, চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, চিনি, এলপি গ্যাস, শিশুখাদ্য, ওষুধের কাঁচামাল এবং কৃষি উৎপাদনে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপকরণে কর ছাড় বা শুল্ক কমানোর চিন্তা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে কৃষি ও পোলট্রি খাতের উৎপাদন ব্যয় কমাতে খাদ্য উপকরণ, ভুট্টা, সয়াবিন মিল ও পশুখাদ্য আমদানিতে সুবিধা বাড়ানোর বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ডিম ও মুরগির বাজারেও কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বর্তমানে বাজারে সবচেয়ে বেশি অস্থিরতার মধ্যে রয়েছে ডিম ও সবজির দাম। ব্যবসায়ীরা বলছেন, পরিবহন ব্যয়, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং সরবরাহ সংকটের কারণে দাম বাড়ছে। তবে ভোক্তাদের অভিযোগ, বাজারে কার্যকর তদারকির অভাব ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের কারণেও পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। ফলে বাজেটে কর কমানো হলেও বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী না হলে সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত সুফল নাও পেতে পারেন।
এদিকে সরকার একদিকে নিত্যপণ্যে স্বস্তি দেওয়ার পরিকল্পনা করলেও অন্যদিকে বিলাসী ও আমদানিনির্ভর পণ্যে কর বাড়ানোর নীতি অনুসরণ করছে। অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের লক্ষ্যে উচ্চমূল্যের গাড়ি, এয়ার কন্ডিশনার, প্রসাধনী, বিদেশি ফল, প্রিমিয়াম মোবাইল ফোন ও অন্যান্য বিলাসপণ্যে শুল্ক ও ভ্যাট বাড়তে পারে। এতে একদিকে অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিরুৎসাহিত হবে, অন্যদিকে সরকার অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের সুযোগ পাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদ ভোরের ডাককে বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে তা সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর চাপ কমিয়ে ধনীদের বিলাসী ভোগে কর বাড়ানোর নীতি তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক পদক্ষেপ হতে পারে। তবে শুধু কর কমানো বা বাড়ানোর মাধ্যমে বাজার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এর সঙ্গে উৎপাদন, সরবরাহ ও বাজার তদারকির বিষয়গুলোও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
সরকার রাজস্ব আহরণ বাড়াতে করের আওতা সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল কর ব্যবস্থাপনার ওপরও জোর দিচ্ছে। সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর করের চাপ না বাড়িয়ে বিলাসী খাত ও উচ্চ আয়ের শ্রেণি থেকে বেশি রাজস্ব আদায়ের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে স্থানীয় শিল্প সুরক্ষায় কিছু খাতে কর সুবিধা অব্যাহত রাখার চিন্তাও রয়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, তথ্যপ্রযুক্তি, ওষুধশিল্প ও কৃষিভিত্তিক শিল্পে প্রণোদনা বা কর ছাড় বহাল থাকতে পারে।
ব্যবসায়ী ও ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে স্বস্তি ফেরাতে হলে শুধু বাজেটনির্ভর উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত বাজার মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে। অতীতে দেখা গেছে, অনেক সময় আমদানি শুল্ক কমানোর পরও খুচরা বাজারে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। ফলে সাধারণ ভোক্তারা প্রত্যাশিত সুবিধা পাননি।
সব মিলিয়ে আসন্ন বাজেটকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও জনস্বস্তির বাজেট হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছে সরকার। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে কর ছাড় এবং বিলাসী পণ্যে বাড়তি করের মাধ্যমে একদিকে সাধারণ মানুষের চাপ কমানো, অন্যদিকে রাজস্ব আদায়ের ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, বাজেট ঘোষণার পর এসব পরিকল্পনার বাস্তব প্রভাব কতটা দ্রুত বাজারে প্রতিফলিত হয়।