বাজার মূল্যস্ফীতির বহুমুখী চাপে পড়বে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট। এর মধ্যে রয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি ও বিনিয়োগে স্থবিরতা।
ইতোমধ্যে মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষ দিশাহারা। জনজীবনে সংকট প্রতিনিয়ত বাড়ছে। জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বেড়েছে। এতে শিল্প, কৃষি ও পরিবহন খাতে ব্যয় বাড়ছে। ফলে ব্যবসায় মুনাফা কমছে এবং বাজারে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা কমছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বহুমুখী কৌশল নেওয়া হচ্ছে।
এর মধ্যে রয়েছে- খাদ্যপণ্যের সরবরাহ বাড়াতে আমদানি শুল্ক হ্রাস, সরকারি মজুত বৃদ্ধি, ওএমএস কার্যক্রম জোরদার, বাজার তদারকি বাড়ানো এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা। এছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে সুদের হার বৃদ্ধি করে বাজারে অর্থের জোগান কমানো।
জানা যায়, মূল্যস্ফীতির বর্তমান চাপ মূলত তিনটি কারণে বেড়েছে। এগুলো হলো-সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, টাকার অবমূল্যায়ন এবং বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি ও পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি। এর সঙ্গে সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা এবং সম্ভাব্য সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে; যার সরাসরি প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় ও পরিবহণ খরচে।
বাজেট সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আগামী বাজেটে একাধিক কৌশল নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে- খাদ্যপণ্যের সরবরাহ বৃদ্ধি, আমদানি সহজীকরণ, টিসিবির কার্যক্রম বৃদ্ধির পাশাপাশি নতুন উদ্যোগ ফ্যামিলি কার্ডের আওতা বাড়ানো এবং মনিটরিং জোরদার। একই সঙ্গে মুদ্রানীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাজস্ব নীতিও কঠোর করার পরিকল্পনা রয়েছে। এদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানি ও ডলার সংকট উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। শিল্প খাতে গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে, যা সরবরাহ সংকট তৈরি করে মূল্যস্ফীতিকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। তারা মনে করেন, উৎপাদন ব্যয় কমাতে না পারলে বাজারে দামের চাপ কমানো যাবে না। তাই বাজেটে কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের মার্চে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশে। এর মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ০৯ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রবণতা আগামী বাজেট বাস্তবায়নের জন্য একটি বড় ঝুঁঁকি হয়ে দাঁড়াবে। মূল্যস্ফীতির প্রধান চাপ আসছে খাদ্য খাত থেকে। বিশেষ করে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, চিনি, শাকসবজি, মাছ-মাংস ও ওষুধের দাম বৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছেন।
অন্যদিকে খাদ্যবহির্ভূত খাতেও মূল্যস্ফীতি কম নয়। বাসা ভাড়া, পরিবহন, চিকিৎসা, শিক্ষা ও জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে এই খাতের মূল্যস্ফীতি উচ্চ অবস্থানে রয়েছে। ফলে সামগ্রিকভাবে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেছে। এ প্রসঙ্গে পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, জ্বালানি খরচ বাড়লে শিল্প উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। এতে উৎপাদকরা বাধ্য হয়ে পণ্যের দাম বাড়ান। একই সঙ্গে পরিবহন খরচ বাড়ার কারণে সরবরাহ চেইনেও চাপ পড়ে। আসন্ন বাজেটে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে মূল্যস্ফীতি কমানোর উদ্যোগ থাকা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে সরকার বহুমুখী চাপের সম্মুখীন। একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং সম্ভাব্য নতুন পে-স্কেল বা বেতন বৃদ্ধির ফলে মুদ্রাস্ফীতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করার ঝুঁঁকি তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে ব্যাংকিং খাতে সুদের হার এখনো দুই অঙ্কের ঘরে থাকায় এবং ঋণের প্রাপ্যতা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় বিনিয়োগ পরিস্থিতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো বিশাল রাজস্ব ঘাটতি। এখন পর্যন্ত ঘাটতি প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এই বিশাল ঘাটতি মেটানো এবং একই সঙ্গে বিনিয়োগ ও সুদের হারের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা। সামগ্রিকভাবে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, রাজস্ব সংকট এবং বিনিয়োগ মন্দার এক কঠিন সমীকরণ সামনে রেখেই এবারের বাজেট পরিকল্পনা সাজাতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে অর্থনীতি বিশ্লেষক মো. মাজেদুল হক বলেন, আগামী বাজেটে সব থেকে বড় চ্যালেঞ্জ হবে মূল্যস্ফীতি। সরকার যখন ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ নেয় তখন ইনফ্লেশন বেড়ে যায়। অর্থনীতির ভাষায় বলে লিকুইডিটি ট্র্যাপ। সরকার এখন যে সিদ্ধান্তগুলো নিচ্ছে সবগুলো ব্যয়ভিত্তিক। জ্বালানি সংকটের কারণে পণ্যমূল্য বেড়ে গেছে। হাওড়ে ধানগুলো নষ্ট হওয়ায় চালের জোগানের অসামঞ্জস্যতা তৈরি হবে। সামগ্রিকভাবে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং নিম্ন প্রবৃদ্ধির এই সমন্বয় অর্থনীতিকে একটি স্থবির অর্থনীতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে; যা কর্মসংস্থান সংকুচিত করছে।