‘প্রতিদিনই কোনো না কোনো সবজির দাম বাড়ছে। সীমিত আয়ের মানুষ হিসেবে সংসারের খরচ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। আগে পরিবারের জন্য কয়েক ধরনের সবজি কিনতে পারতাম, এখন খরচের চাপে অনেক কিছুই কমিয়ে দিতে হয়েছে। বাজারে এসে এখন সবচেয়ে বেশি ভাবতে হয়—কোন জিনিসটা কম কিনলে চলবে।’
শুক্রবার (৮ মে) পুরান ঢাকার রায়সাহেব বাজারে বাজার করতে এসে সবজির দাম নিয়ে আক্ষেপ করে এসব কথা বলেন নাসিমা আক্তার।
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন আরও অনেক ক্রেতা। তাদের ভাষ্য, আয় না বাড়লেও প্রতিদিন কোনো না কোনো পণ্যের দাম বাড়ছে। ফলে সংসারের খরচ সামলানো দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।
রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে নিত্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। বিশেষ করে সবজির বাজারে অস্থিরতা বেড়েছে। শুক্রবার রায়সাহেব বাজার, কলতা বাজার ও নারিন্দা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ সবজির দাম এখন প্রতি কেজি ৮০ থেকে ১২০ টাকার মধ্যে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, টানা বৃষ্টিতে কৃষকের ক্ষতি হওয়ায় বাজারে সবজির সরবরাহ কমে গেছে। পাশাপাশি পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে পাইকারি বাজার থেকেই বেশি দামে সবজি কিনতে হচ্ছে। এ ছাড়া মৌসুমি অনেক সবজির সময় শেষ হওয়ায় সংকট আরও বেড়েছে।
তাদের দাবি, দাম বাড়ার কারণে ক্রেতাদের কেনার পরিমাণও কমে গেছে। আগে যেখানে একজন ক্রেতা এক কেজি সবজি কিনতেন, এখন অনেকেই আধা কেজি করে কিনছেন। ফলে ছোট ব্যবসায়ীরাও আগের তুলনায় কম পরিমাণে সবজি তুলছেন।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি দামের তালিকায় রয়েছে কাঁকরোল, শসা ও বেগুন। প্রতি কেজি কাঁকরোল ১২০ টাকা, গোল বেগুন ১২০ টাকা, লম্বা বেগুন ১০০ টাকা, দেশি শসা ১২০ টাকা এবং হাইব্রিড শসা ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এ ছাড়া পটোল ৮০ টাকা, করলা ৮০ টাকা, ঝিঙা ১০০ টাকা, চিচিঙ্গা ১০০ টাকা, ধুন্দল ১০০ টাকা, ঢ্যাঁড়স ৬০ টাকা, পেঁপে ৮০ থেকে ১০০ টাকা এবং টমেটো ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
একই সঙ্গে প্রতিটি লাউ ৭০ থেকে ৮০ টাকা, জালি ৬০ টাকা, কাঁচা মরিচ প্রতি কেজি ১৬০ টাকা এবং কাঁচা কলা প্রতি হালি ৪০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
মুরগির বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গত সপ্তাহের মতোই ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা, পাকিস্তানি সোনালি ৩৩০ থেকে ৩৫০ টাকা এবং দেশি মুরগি ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
মাছের বাজারে আকারভেদে রুই ৩০০ থেকে ৩৮০ টাকা, টেংরা ৪০০ থেকে ৫৬০ টাকা, পাবদা ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, মৃগেল ২২০ থেকে ২৫০ টাকা, পাঙাশ ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা, তেলাপিয়া ২০০ থেকে ২৫০ টাকা, কাতল ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা, বাটা ১৮০ থেকে ২৪০ টাকা, শিং ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা এবং সিলভার কার্প ১৮০ থেকে ২৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
তবে গরু ও খাসির মাংসের বাজারে বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। গরুর মাংস প্রতি কেজি ৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস ১ হাজার ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
রায়সাহেব বাজারের সবজি বিক্রেতা ফারুক হোসেন বলেন, ‘সবজির দাম বাড়ার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে পরিবহন খরচ বেড়েছে। তার ওপর গত কয়েকদিনের বৃষ্টিতে কৃষকের অনেক সবজি নষ্ট হয়েছে। আবার অনেক সবজির মৌসুম শেষ হওয়ায় সরবরাহও কমে গেছে। আগে আমরা ২০ কেজি সবজি আনতাম, এখন দাম বেশি হওয়ায় ১০ কেজি করে আনছি। কারণ ক্রেতারাও এখন এক কেজির জায়গায় আধা কেজি করে কিনছেন।’
আরেক বিক্রেতা আব্দুল করিম বলেন, ‘বৃষ্টি আর পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পাইকারি বাজার থেকেই বেশি দামে সবজি কিনতে হচ্ছে। বেশি দামে কিনে কম লাভে বিক্রি করতে হচ্ছে। দাম বাড়ার কারণে ক্রেতার সংখ্যাও কমে গেছে। অনেকেই এখন প্রয়োজনের তুলনায় কম সবজি কিনছেন।’
ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, বাজারে নতুন সবজির সরবরাহ বাড়লে দাম কিছুটা কমতে পারে। তবে আপাতত চড়া বাজারদরে সাধারণ ক্রেতাদের ভোগান্তি বাড়ছে।
নারিন্দা বাজারে সবজি কিনতে আসা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কয়েক সপ্তাহ ধরেই সবজির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। এখন ৫০০ টাকার নিচে ঠিকমতো বাজার করাই কঠিন। আগে যে সবজি এক কেজি করে কিনতাম, এখন বাধ্য হয়ে আধা কেজি বা তারও কম কিনতে হচ্ছে। নিত্যপণ্যের দাম এমনিতেই বেশি, তার ওপর সবজির দাম বাড়ায় সংসার চালানো আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।’