ইলিশ চলাচলে বাধা কোটি কোটি টন পলি

সুমন হাওলাদার

জাতীয়

রুপালী ইলিশের যৌলুশ দিনকেদিন কমছে। এখন আর দেশের অভ্যন্তরে দেখা যায় না রুপালী যৌলুশ। ডিম ছাড়ার সময় সাগর থেকে নদীপথে

2026-04-07T12:28:03+00:00
2026-04-07T12:28:03+00:00
  শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬,
১২ আষাঢ় ১৪৩৩
 
শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬
জাতীয়
ইলিশের বিচরণ নিশ্চিতে ১ লাখ কোটি টাকার ড্রেজিং প্রয়োজন
ইলিশ চলাচলে বাধা কোটি কোটি টন পলি
ড্রেজিংয়ের জন্য সমন্বিত প্রকল্প নেওয়া প্রয়োজন
সুমন হাওলাদার
মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল, ২০২৬, ১২:২৮ পিএম 

রুপালী ইলিশের যৌলুশ দিনকেদিন কমছে। এখন আর দেশের অভ্যন্তরে দেখা যায় না রুপালী যৌলুশ। ডিম ছাড়ার সময় সাগর থেকে নদীপথে উজানে উঠে আসে মা ইলিশ। ডিম ছেড়ে আবার ফিরে যায় সাগরে। সাগর থেকে নদী, আর নদী থেকে সাগরে ইলিশের চলাচলের এই পথ (মাইগ্রেটরি রুট) ভরাট হচ্ছে পলি জমে;  সৃষ্টি হচ্ছে ডুবোচর। এতে ইলিশ আর উজানে এগোতে পারছে না, বাধাগ্রস্ত হচ্ছে প্রজনন। জোয়ার ভাটার মাঝখানে কিছু ইলিশ আসতে পারলেও অধিকাংশই ফিরেযেতে বাধ্য হয়। এই সংকট কাটাতে মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর মোহনায় জেগে ওঠা ডুবোচর অপসারণ প্রয়োজন।

এ বিষয়ে মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশসম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের পরিচালক মোল্লা এমদাদুল্যাহ বলেন, ইলিশের চলাচলের জন্য কমপক্ষে ৫ থেকে ১০ মিটার গভীর পানি দরকার। কিন্তু মোহনার পথে পলি পড়ে ভরাট হয়ে পানির গভীরতা কোথাও কোথাও দুই থেকে তিন মিটার হয়ে গেছে। বিভিন্ন সময়ে এসব রুট খননের জন্য অনুরোধ জানিয়ে দুটি মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তারা আমাদের জানিয়েছে, শুধু মেঘনার ৫০ কিলোমিটার এলাকার মোহনায় কোটি কোটি ঘনমিটার পলি জমে আছে। এগুলো ড্রেজিং করার জন্য প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার প্রয়োজন। তবে আমরা আমাদের প্রস্তাবনায় এখন দুই কিলোমিটার প্রশস্ত করে ২০ কিলোমিটার নদী খননের বিষয়টি উল্লেখ করেছি।

তিনি আরো বলেন, ড্রেজিংয়ের কথা বলা হলেও এ বিষয়ে কোনো সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি। এ জন্য সমন্বিত প্রকল্প নেওয়া প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।

প্রকল্প পরিচালক আরো বলেন, ইলিশের মাইগ্রেটরি রুট খননের পরে আগের অবস্থায় আসতে দুই থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে আগের অবস্থায় ফিরে আসবে। এ কারণে খনন করে রেখে দিলে হবে না, প্রতিবছর এসব নদী সংরক্ষণমূলক ড্রেজিং করতে হবে। তা না হলে নদী খনন কোনো কাজেই আসবে না।

সূত্র জানায়,  গত বছর প্রায় ২০ কিলোমিটার নদী খননের জন্য নৌপরিবহন ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। এই বিশাল ড্রেজিং কার্যক্রমে প্রাথমিক ব্যয় হবে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। 

সূত্র জানায়, ইলিশের জীবনচক্রে এখন বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে নদীর বুকে জেগে ওঠা অন্তত ২৫টি চর। বিশেষ করে চাঁদপুরের মেঘনা-তেঁতুলিয়া নদীর মোহনায় তৈরি হওয়া এসব চরে প্রায় ৮৮ কোটি টন পলি জমেছে। নদীর স্বাভাবিক গভীরতা ৫ থেকে ১০ মিটার (১৫ থেকে ৩০ ফুট) থাকার কথা থাকলেও পলি জমার কারণে এখন তা কমে কোথাও কোথাও ২ থেকে ৩ মিটার হয়েছে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষি মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ গতকাল ইলিশ সংরক্ষণ বিষয়ক এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন,  ইলিশের টেকসই উৎপাদন বৃদ্ধিসহ ইলিশ মাছের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসার জন্য বর্তমান সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ এবং এ লক্ষ্যে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। জাটকা ও প্রজননক্ষম ইলিশ সংরক্ষণ, নির্দিষ্ট সময়ে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা, অভয়াশ্রম স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা এবং মৎস্য সংরক্ষণ আইনের সফল বাস্তবায়ন অন্যতম। এসব কার্যক্রমের সফল বাস্তবায়নের ফলে ইলিশ উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বৃদ্ধি পেয়ে ৫ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত হয়েছে। 

মন্ত্রী আরো বলেন, নদী ভরাট, জলবায়ু পরিবর্তন, নদী দূষণ ও মৎস্যসম্পদের ওপর ক্রমাগত চাপ বৃদ্ধির ফলে ইলিশ মাছ উৎপাদনের এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখা এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সকলকে সাথে নিয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এগিয়ে যাবে। 

মৎস্য বিজ্ঞানী ও ইলিশ গবেষক ড. মো. আনিসুর রহমান বলেন, শুধু ড্রেজিং করলেই হবে না। ড্রেজিংয়ের সুফল-কুফল বিবেচনা করতে হবে। তা না হলে অবস্থা খারাপও হতে পারে। ইলিশ মাছ গভীর সাগর থেকে ভোলার মেঘনা নদী দিয়ে প্রবেশ করে তেঁতুলিয়া ও পদ্মাসহ বিভিন্ন নদীতে যায়। আর দেশের প্রায় ৩৫ শতাংশ ইলিশ উৎপাদন হয়ে থাকে ভোলায়। ইলিশ যখন সাগর থেকে ভোলা উপকূলের মেঘনা নদীতে প্রবেশ করতে গিয়ে ডুবোচরে বাধাগ্রস্ত হয় তখন দিক পরিবর্তন করে ফের সাগরের দিকে চলে যায়।

মৎস্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বিআইডব্লিউটিকে ড্রেজিংয়ের জন্য যে চিঠি দিয়েছে তাতে ইলিশের মাইগ্রেটরি চারটি রুট চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে মেঘনা নদীর মোহনা (ভোলা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও পটুয়াখালী) জেলার চর ফ্যাশন, রাঙাবালী, হাতিয়া ও সন্দ্বীপ উপজেলার সোনার চর দুই কিলোমিটার প্রশস্ত করে ২০ কিলোমিটার ড্রেজিং করতে হবে। এসব এলাকা দিয়ে প্রায় ৫০ শতাংশ ইলিশ দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে ডিম ছাড়ার জন্য। বিশেষজ্ঞরা জানান, এক্ষেত্রে ২০ কিলোমিটার ৭ মিটার গভীর করে পলি অপসারণে ব্যয় হবে প্রায় ৪ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা। অপসারণ করতে হবে প্রায় ৪৭ কোটি ৬০ লাখ টন পলি। (১ ঘনমিটার = ১.৭ টন এবং প্রতি ঘন মিটার ১৭০ টাকা হিসেবে)।

একইভাবে তেঁতুলিয়া নদীর মোহনায় পটুয়াখালী রাঙাবালী উপজেলার চর হেয়ার (কলাগাছিয়া নামে পরিচিত) এর মোহনা দুই কিলোমিটার প্রশস্ত করে ১০ কিলোমিটার ড্রেজিংয়ের কথা বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ড্রেজিংয়ে খরচ হবে ২ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা এবং অপসারণ করতে হবে ২৩ কোটি ৮০ লাখ টন পলি। পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার আন্ধারমানিক নদীর মোহনা থেকে ৭০০ মিটার প্রশস্ত করে ১০ কিলোমিটার খনন করার কথা বলা হয়েছে। এখানে ১০ কিলোমিটার নদী খননে ব্যয় হবে ৮৩৩ কোটি টাকা এবং অপসারণ করতে হবে ৮ কোটি ৩৩ লাখ টন পলি।

সর্বশেষ মেঘনা নদী (বরিশাল, চাঁদপুর ও লক্ষ্মীপুর জেলা) হিজলা, মেহেন্দিগঞ্জ, হাইমচর ও রায়পুর উপজেলার নদীর অংশ ৭০০ মিটার প্রশস্ত করে ১০ কিলোমিটার খনন করতে হবে। এতে ব্যয় হবে ৮৩৩ কোটি টাকা। অপসারণ করতে হবে ৮ কোটি ৩৩ লাখ টন পলি। 

নদী ড্রেজিং প্রসঙ্গে বিআইডব্লিউটিএর প্রধান প্রকৌশলী (ড্রেজিং) মো. রকিবুল ইসলাম তালুকদার বলেন,  নৌযান চলাচল উপযোগী রুটগুলো সচল রাখা আমাদের কাজ। সাধারণত এ রুটে ৭৫ মিটার প্রস্থ ও চার মিটার গভীরতার নৌপথ খনন করি । তারপরও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা উল্লিখিত নদী ড্রেজিং করার বিষয়ে একটি আলোচনা সভা করেছি। ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি ও মাইগ্রেটরি রুট ড্রেজিং করা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়নি। 

তিনি আরো বলেন, ইলিশের মাইগ্রেটরি রুট হিসেবে যেসব নদীর মান এসেছে।এসব নদী অন্য নদীর তুলনায় আলাদা। বেশি সিল্টেশন হয়ে থাকে। দ্রুত ভরাট হয়ে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে। শুধু ড্রেজিং করলেই হবে না, একে সারা বছর সংরক্ষণমূলক ড্রেজিং করতে হবে। তা না হলে শুফল পাওয়া যাবে না।


Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: