দেশের সরকারি সেবা খাতগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘুষ ও দুর্নীতির শিকার হচ্ছেন পাসপোর্ট সেবা গ্রহণকারীরা। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) পরিচালিত ‘সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’-এ এমন চিত্র উঠে এসেছে। জরিপ অনুযায়ী, পাসপোর্ট সেবায় ঘুষ দেওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে ৭৬ দশমিক ৬ শতাংশ সেবাগ্রহীতার, আর দুর্নীতির শিকার হওয়ার হার ৮৪ দশমিক ৪ শতাংশ।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) রাজধানীর ধানমণ্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাসপোর্ট সেবায় ঘুষের হার গ্রামাঞ্চলে ৭৯ দশমিক ১ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলে ৭১ দশমিক ৮ শতাংশ। একইভাবে দুর্নীতির শিকার হওয়ার হার গ্রামে ৮৭ শতাংশ এবং শহরে ৭৯ দশমিক ৪ শতাংশ। ফলে সরকারি সেবা খাতগুলোর মধ্যে পাসপোর্ট অফিস সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
জরিপে দেখা যায়, ঘুষ গ্রহণের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। এ খাতে ৬৩ দশমিক ৫ শতাংশ সেবাগ্রহীতা ঘুষ দেওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। বিআরটিএ সেবায় দুর্নীতির শিকার হওয়ার হার ৭৯ দশমিক ৩ শতাংশ। শহরাঞ্চলে এই হার ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশ এবং গ্রামাঞ্চলে ৬১ দশমিক ৫ শতাংশ।
পাসপোর্ট ও বিআরটিএর পর ঘুষের হার সবচেয়ে বেশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা এবং কৃষি খাতে, যেখানে উভয় ক্ষেত্রেই হার ৪৯ দশমিক ৩ শতাংশ। ভূমি সেবায় ঘুষের শিকার হওয়ার হার ৪৭ দশমিক ৬ শতাংশ। এছাড়া বিচারসংশ্লিষ্ট সেবায় ৩৯ দশমিক ৬ শতাংশ, শিক্ষা খাতে ৩৪ দশমিক ৮ শতাংশ এবং সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় ২৯ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ ঘুষ দেওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।
দুর্নীতির শিকার হওয়ার হার বিবেচনায় বিচারসংশ্লিষ্ট সেবা রয়েছে তৃতীয় অবস্থানে, যেখানে ৭১ দশমিক ৩ শতাংশ সেবাগ্রহীতা অনিয়মের মুখোমুখি হয়েছেন। এরপর রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ৬৯ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ভূমি সেবা ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশ।
টিআইবির জরিপে আরও উঠে এসেছে, দেশের ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবার অন্তত একটি সেবা খাতে ঘুষের শিকার হয়েছে। অন্যদিকে ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো সরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন।
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবি জানায়, সরকারি সেবা খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত না হলে নাগরিক ভোগান্তি কমানো সম্ভব হবে না। বিশেষ করে পাসপোর্ট ও বিআরটিএর মতো গুরুত্বপূর্ণ জনসেবামূলক খাতে দুর্নীতির উচ্চ হার উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সেবার ডিজিটালাইজেশন, কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। সেবা খাতে দুর্নীতির এই চিত্র সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি নাগরিক আস্থা ও সেবার মান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।