আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ততই বাড়ছে উত্তেজনার পারদ। পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি, শক্তি প্রদর্শন, সহিংসতার আশঙ্কা আর অনাস্থার আবহ, সব মিলিয়ে নির্বাচনী মাঠ ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠছে। এই উত্তেজনার পটভূমিতে সবচেয়ে উদ্বেগজনক যে বিষয়টি সামনে আসছে, তা হলো সীমান্ত পেরিয়ে অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদের প্রবাহ এবং সক্রিয় হয়ে ওঠা অস্ত্র কারবারি চক্র। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়, বরং একটি শান্তিপূর্ণ, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের পথে বড় চ্যালেঞ্জ।
#নির্বাচনী মাঠে বাড়ছে নিরাপত্তা ঝুঁকির আশঙ্কা
#প্রশাসনের প্রস্তুতি : কড়া বার্তা
অস্ত্র আসছে ৩৪ সীমান্ত জেলা দিয়ে : আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, দেশের অন্তত ৩৪টি সীমান্ত জেলা দিয়ে ভারত ও মিয়ানমার থেকে অবৈধ অস্ত্র ও বিস্ফোরক প্রবেশের প্রবণতা বেড়েছে। দুর্গম সীমান্ত পথ, নদীঘেরা এলাকা, চর ও বনাঞ্চল ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরেই এই পাচার চললেও নির্বাচন সামনে আসায় এর তৎপরতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। সর্বশেষ গত ২২ জানুয়ারি রাজধানীর শ্যামপুর এলাকায় ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কে অভিযান চালিয়ে একটি যাত্রীবাহী বাস থেকে দুটি বিদেশি পিস্তল ও ২১ রাউন্ড গুলিসহ আজগর আলী ওরফে ভোলা (৫৫) নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পুলিশ জানায়, বেনাপোল থেকে ছেড়ে আসা ওই দূরপাল্লার বাসে করে অস্ত্রগুলো ঢাকায় আনা হচ্ছিল। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যে নির্বাচনী সময় পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার আশঙ্কার ইঙ্গিত মিলেছে। এর আগে গত ১৯ জানুয়ারি সিলেট সীমান্ত এলাকায় একটি চেকপোস্টে তল্লাশি চালিয়ে ১০টি নতুন এয়ারগান উদ্ধার করা হয়। একই সময় যশোরের বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে আনা বিদেশি পিস্তল ও গুলিসহ এক অস্ত্র ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ওই দিনই দিবাগত রাতে কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার মাধাইয়া বাস স্টেশন এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে অভিযান চালিয়ে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন ও গুলিসহ দুই সন্ত্রাসীকে আটক করে হাইওয়ে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁ উপজেলার হাবিবুর রহমান শাকিল (৩৩) এবং বন্দর উপজেলার মোহাম্মদ চিশতী (৪২)। এই ধারাবাহিক উদ্ধার অভিযানের ঘটনা স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে, সীমান্ত হয়ে আসা অস্ত্র দেশের ভেতরে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
নির্বাচনী মাঠে বাড়ছে নিরাপত্তা ঝুঁকির আশঙ্কা : এই অস্ত্রগুলো শেষ পর্যন্ত কার হাতে যাচ্ছে, এই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনী সময়ে এসব অস্ত্র রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা টার্গেটেড হামলার জন্য ব্যবহার হতে পারে। সাতক্ষীরার শ্যামনগর এলাকায় বিজিবির সাম্প্রতিক অভিযানে পিস্তল, গোলাবারুদ ও মাদক উদ্ধারের ঘটনা এই আশঙ্কাকে আরও জোরালো করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচনী উত্তেজনা বাড়লে অপরাধী গোষ্ঠীগুলো পরিস্থিতির সুযোগ নিতে পারে। তখন সীমান্ত দিয়ে আসা অস্ত্র খুব দ্রুতই সহিংসতার উপকরণে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
সক্রিয় অস্ত্র কারবারি ও অপরাধী গোষ্ঠী : অবৈধ অস্ত্রের তৎপরতা শুধু সীমান্তেই সীমাবদ্ধ নয়। জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও অস্ত্র কারবারি ও অপরাধী চক্রের সক্রিয়তা চোখে পড়ছে। যশোর, খুলনা, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাং ও স্থানীয় অপরাধী চক্রের হাতে অস্ত্র থাকার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র বলছে, এর একটি অংশ নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতায় যুক্ত হতে পারে। বিভিন্ন জায়গায় অস্ত্র প্রদর্শন, ফাঁকা গুলি ছোড়া কিংবা অবৈধ অস্ত্রের মজুতের খবর নিয়মিতই পুলিশের কাছে আসছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে, প্রশ্ন উঠছে, নির্বাচনী মাঠ কতটা নিরাপদ থাকবে।
প্রশাসনের প্রস্তুতি, কড়া বার্তা : নির্বাচনী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। ঢাকা বিভাগসহ বিভিন্ন এলাকায় লাইসেন্সপ্রাপ্ত অস্ত্রধারীদের সব অস্ত্র নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে থানায় জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনকালীন সময় এসব অস্ত্র পুলিশের হেফাজতে থাকবে, বহন বা প্রদর্শনে থাকবে কঠোর নিষেধাজ্ঞা।
প্রথমবারের মতো আনসার ও ভিলেজ ডিফেন্স পার্টি (ভিডিপি) সদস্যদের প্রিজাইডিং অফিসারদের নিরাপত্তায় যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’-এর মতো বিশেষ অভিযানে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, সব অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি, আর এই অসম্পূর্ণতাই উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
আতঙ্কের রাজনীতি না শান্তির ভোট : নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, গত এক বছরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় টার্গেটেড অ্যাটাক ও সহিংস ঘটনার প্রবণতা একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। চট্টগ্রামসহ কয়েকটি এলাকায় নির্বাচনী জনসংযোগ কর্মসূচিকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ঘটনাও সামনে এসেছে। তাদের আশঙ্কা, সীমান্ত দিয়ে আসা অস্ত্রের একটি অংশ যদি নির্বাচনী সহিংসতায় ব্যবহৃত হয়, তাহলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এতে শুধু প্রাণহানি নয়, প্রশ্নবিদ্ধ হবে পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়া।
জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম জানান, আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই নয়, অন্যান্য সময়ও যাতে সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অস্ত্র, বিস্ফোরক প্রবেশ করতে না পারে এজন্য সীমান্তে দায়িত্ব পালনকারী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পুলিশও বিজিবির সঙ্গে সমন্বয় করে এ বিষয়ে দায়িত্ব পালন করছে। বিশেষ করে সীমান্ত থেকে জেলা শহর এবং ঢাকাসহ অন্যান্য বিভাগীয় শহরের প্রবেশপথের সড়ক-মহাসড়কে পুলিশ পর্যাপ্ত তল্লাশি চৌকি বসিয়েছে, যাতে কোনো ধরনের অবৈধ অস্ত্র সীমান্ত পার হয়ে দেশে ঢুকতে না পারে।
তিনি আরও বলেন, যেসব সীমান্তপথ দিয়ে অবৈধ অস্ত্র ও বিস্ফোরক প্রবেশের আশঙ্কা আছে সেখানে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। অস্ত্র কারবারিদের তালিকা করে তাদের গ্রেপ্তারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোনো ধরনের অবৈধ অস্ত্রের মহড়া করতে দেওয়া হবে না কাউকে। অবৈধ অস্ত্র প্রবেশ করার ক্ষেত্রে পুলিশের কোনো সদস্য সহযোগিতা করেছেন, এমন তথ্য পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক, অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অস্ত্র প্রবেশ নতুন কিছু নয়। পুলিশ ও বিজিবির অভিযানে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের পরিসংখ্যান থেকে আমরা যেসব সংখ্যা পাই বাস্তবে অস্ত্র ও বিস্ফোরক আরও বেশি প্রবেশ করছে। আমাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও পুলিশের শক্তিশালী নজরদারির অভাবে এসব অস্ত্র নানা মাধ্যমে দেশে ঢুকছে। তাই আমি মনে করি শুধু নির্বাচনেই নয়, অন্যান্য সময়ও অবৈধ অস্ত্রের চোরাচালান বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এজন্য অবৈধ অস্ত্র, বিস্ফোরক এবং কারবারিদের গ্রেপ্তারে বিশেষ অভিযান জোরদার করতে হবে।