কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্ত আবারও অস্থির হয়ে উঠেছে। সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে গত বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) থেকে থেমে থেমে চলছে গোলাগুলি ও শক্তিশালী বিস্ফোরণ। গতকাল শনিবার সকালেও একাধিকবার গুলির শব্দ ও বিস্ফোরণের আওয়াজ শোনা গেছে। টানা তিন দিন ধরে চলমান এই সংঘাত সীমান্তের এপারে ছড়িয়ে দিয়েছে চরম আতঙ্ক।
#তিন দিন ধরে বিস্ফোরণের শব্দে কাপছে বাড়িঘর
#থমকে গেছে স্থানীয়দের স্বাভাবিক জীবন
#নিরাপত্তা ঝুঁকি ও নতুন শরণার্থীর আশঙ্কা
#রাখাইনে ত্রিমুখী সংঘাত, নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে জান্তা বাহিনী
স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিরা জানান, বিশেষ করে রাতের বেলা গোলাগুলির শব্দ এতটাই তীব্র হচ্ছে যে সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোর বাড়িঘর কেঁপে উঠছে। শিশু, নারী ও বয়স্করা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। অনেক পরিবার প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছে না, কেউ কেউ নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার কথাও ভাবছেন।
রাখাইনে ত্রিমুখী সংঘাত, নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে জান্তা বাহিনী : মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীরা জানান, রাখাইন রাজ্যের একাধিক শহর, গ্রাম ও সীমান্ত চৌকি জান্তা সরকারের নিয়ন্ত্রণ থেকে হাতছাড়া হয়ে গেছে। এসব এলাকার বড় একটি অংশ বর্তমানে আরাকান আর্মির দখলে রয়েছে। ফলে ওইসব অঞ্চলে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর উপস্থিতি ও প্রভাব দুর্বল হয়ে পড়েছে।
রোহিঙ্গারা আরও দাবি করেন, রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের কয়েকটি সশস্ত্র গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। এসব গ্রুপ, আরাকান আর্মি এবং মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর মধ্যে ত্রিমুখী সংঘর্ষ চলছে। এই সংঘাতের জেরেই সীমান্তজুড়ে গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের ঘটনা বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাখাইন রাজ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য দ্রুত বদলে যাওয়ায় সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে শুধু মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিই নয়, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
থমকে গেছে স্থানীয়দের স্বাভাবিক জীবন : সংঘাতের প্রভাব সরাসরি পড়ছে টেকনাফের সীমান্তবর্তী জনপদগুলোতে। গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের শব্দ ভেসে আসায় সীমান্ত এলাকার মানুষ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। নাফ নদী ও উপকূলীয় এলাকায় মাছ ধরতে যাওয়া জেলে পরিবারগুলোর মধ্যে আতঙ্ক আরও বেশি।
অনেক জেলে জানান, জীবিকার তাগিদ থাকলেও প্রাণের ভয়ে তারা নদীতে নামতে পারছেন না। একই অবস্থা চিংড়ি ঘের সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদেরও। ফলে সীমান্ত অঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
তিন দিন ধরে বিস্ফোরণের শব্দে কাপছে বাড়িঘর : হোয়াইক্যং এলাকার বাসিন্দা মো. ইলিয়াস মিয়া বলেন, বৃহস্পতিবার রাতের পর শুক্রবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত থেমে থেমে ভারী বোমা বিস্ফোরণ ও গুলির শব্দে আমাদের বাড়িঘর কেঁপে উঠছিল। শুক্রবার রাত থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত আবারও ব্যাপক শব্দ শোনা গেছে। এখনো মাঝে মধ্যে দু-একটি ফায়ারের আওয়াজ ভেসে আসছে।
হোয়াইক্যং ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সিরাজুল মোস্তফা লালু বলেন, গত তিন দিন ধরে সীমান্তের ওপারে ভয়াবহ গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছে। বিশেষ করে রাতে শব্দগুলো এত তীব্র হয় যে মানুষ ঘুমাতে পারছে না। শিশু, নারী ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি আতঙ্কে আছে। তিনি আরও বলেন, এর আগে মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলি এপারের বাসিন্দাদের শরীরে লাগার ঘটনাও ঘটেছে। তাই মানুষ সব সময় আশঙ্কায় আছে, কখন যে গুলি এসে পড়বে, কেউ জানে না।
নিরাপত্তা ঝুঁকি ও নতুন শরণার্থীর আশঙ্কা : স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বাসিন্দাদের মতে, সীমান্তের খুব কাছাকাছি এলাকায় সংঘর্ষ চলায় যেকোনো সময় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। গোলাগুলির শব্দে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে, স্কুলগামী শিশুদের মধ্যেও ভয় কাজ করছে। অনেকে আশঙ্কা করছেন, সংঘাত দীর্ঘ হলে সীমান্ত দিয়ে নতুন করে শরণার্থী অনুপ্রবেশের চাপ তৈরি হতে পারে, যা স্থানীয় প্রশাসন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইনামুল হাফিজ নাদিম বলেন, সীমান্তের ওপারে গোলাগুলির ঘটনার বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন নিয়মিতভাবে বিজিবির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে সতর্কতার সঙ্গে অবস্থান করতে বলা হয়েছে। আতঙ্কিত না হয়ে প্রয়োজনীয় সতর্কতা মেনে চলার আহ্বান জানানো হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সীমান্ত এলাকায় জনসচেতনতা বাড়াতে প্রচারণাও চালানো হচ্ছে বলে জানান তিনি।
জানতে চাইলে উখিয়া-টেকনাফ সীমান্তে দায়িত্বে থাকা ৬৪ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, শনিবার সকাল ৬টা থেকে ১০টা পর্যন্ত মিয়ানমার সীমান্তের ওপারে থেমে থেমে গোলাগুলির শব্দ শোনা গেছে। পরে ১১টার পর আবারও শব্দ পাওয়া যায়। এর আগে শুক্রবার এক জেলে গুলিবিদ্ধ হন। তিনি জানান, ওই জেলে মাছ ধরতে গিয়ে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়েছিলেন বলে জানা গেছে। সীমান্তবাসীদের নিরাপদে থাকতে বলা হয়েছে এবং বিজিবি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। যে কোন অনাকাঙ্খিত ঘটনা এড়াতে প্রস্তুত বাংলাদেশ বিজিবি।
উল্লেখ্য, টানা গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের শব্দে টেকনাফ সীমান্তে আতঙ্ক যেন নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে। একদিকে জীবনের ঝুঁকি, অন্যদিকে জীবিকার অনিশ্চয়তা, দুটোর মাঝেই দিন কাটাচ্ছেন সীমান্তবাসী। দ্রুত সংঘাতের অবসান না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। সীমান্তজুড়ে বিরাজমান এই অস্থিরতা শুধু টেকনাফবাসীর নয়, গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্যই বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।