চিরবিদায়ে বিশ্ব রাজনীতির সেতুবন্ধনে খালেদা জিয়া

নাজিউর রহমান সোহেল

জাতীয়

রাজনীতির এক দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ পথ পাড়ি দিয়ে চিরনিন্দ্রায় শায়িত হলেন বাংলাদেশের সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তবে তাঁর

2025-12-31T20:15:19+00:00
2025-12-31T20:15:19+00:00
  বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬,
১১ আষাঢ় ১৪৩৩
 
বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬
জাতীয়
ঢাকায় ভারত-পাকিস্তান ‘ব্রেকথ্রু’
চিরবিদায়ে বিশ্ব রাজনীতির সেতুবন্ধনে খালেদা জিয়া
শেষ বিদায়ে বিশ্বনেতাদের শ্রদ্ধা-ভালোবাসা
নাজিউর রহমান সোহেল
বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫, ৮:১৫ পিএম 

রাজনীতির এক দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ পথ পাড়ি দিয়ে চিরনিন্দ্রায় শায়িত হলেন বাংলাদেশের সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তবে তাঁর এই মহাপ্রয়াণ কেবল একটি দলের শোকের ছায়ায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং আজ বুধবার রাজধানী ঢাকা পরিণত হয়েছিল বিশ্ব রাজনীতির এক বিরল মিলনমেলায়। পুব থেকে পশ্চিম- বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রভাবশালী রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধানেরা তার জানাযায় শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। আরও শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন প্রতিবেশি দেশ ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরাও। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের প্রতিনিধি ও উচ্চপদস্থ কূটনীতিকরা বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় শ্রদ্ধা জানিয়ে তৈরি করেছেন এক নতুন কূটনৈতিক ইতিহাস। অন্যদিকে এই শোকের আবহকে কেন্দ্র করে ঢাকাতেই অনুষ্ঠিত হয়েছে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং বিরল কূটনৈতিক সাক্ষাৎ।

আজ বুধবার বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় যখন বেগম জিয়ার জানাজা অনুষ্ঠিত হচ্ছিল, তখন মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের দৃশ্য ছিল অভূতপূর্ব। কড়া নিরাপত্তার বলয় পেরিয়ে জানাজায় শরিক হয়ে শ্রদ্ধা জানান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত, পাকিস্তান, রাশিয়া এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্তত ৩২ জন শীর্ষ কূটনৈতিক ও প্রতিনিধিরা। বিশ্লেষকরা বলছেন, একজন বিরোধী দলীয় নেত্রীর বিদায়ে পরাশক্তি রাষ্ট্রগুলোর এই সরব উপস্থিতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর সুগভীর প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতারই চূড়ান্ত স্বীকৃতি।

জানাজায় অংশ নেন যেসব কূটনীতিক ও প্রতিনিধিরা
জানাজায় অংশ নেওয়া কূটনীতিকদের মধ্যে ছিলেন- যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত মেগান বোল্ডিন, ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক, চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলারসহ অন্তত ৩২ জন কূটনীতিক ও প্রতিনিধিরা। শ্রদ্ধায় আরও অংশ নেন রাশিয়ার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত একাতেরিনা সেমেনোভা, জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা সিনচি, কানাডার হাইকমিশনার অজিত সিং, অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার সুসান রাইল এবং সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত রেতো সিগফ্রিড রেংলি। এ ছাড়া ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, পাকিস্তানের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিক, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দা শর্মা ও ভুটানের পররাষ্ট্র ও বৈদেশিক বাণিজ্য মন্ত্রী লিয়নপো ডি. এন. ধুংগেল, মালদ্বীপ প্রজাতন্ত্রের উচ্চশিক্ষা, শ্রম ও দক্ষতা উন্নয়ন বিষয়ক মন্ত্রী ড. আলী হায়দার আহমেদ। আরও ছিলেন নেদারল্যান্ডস, লিবিয়া, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, ফিলিস্তিন, দক্ষিণ কোরিয়া, মিয়ানমার, ইতালি, সুইডেন, স্পেন, ইন্দোনেশিয়া, নরওয়ে, ব্রাজিল, মরক্কো, ইরান, আলজেরিয়া, ব্রুনাই, থাইল্যান্ড, কাতার, ডেনমার্ক ও মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনাররা। কূটনীতিকদের পাশাপাশি বিমসটেকের মহাসচিব ইন্দ্র মনি পান্ডে এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) ভারপ্রাপ্ত কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ সিমোন লসন পার্চমেন্টও জানাজায় অংশ নেন।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে কোনো রাজনৈতিক নেতার জানাজায় এত বিপুল সংখ্যক আন্তর্জাতিক প্রতিনিধির অংশগ্রহণ এর আগে কখনো দেখা যায়নি।

তারেক রহমানের সঙ্গে এস জয়শঙ্করের বৈঠক
জানাজার আগে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে একান্তে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পাঠানো একটি ব্যক্তিগত শোকবার্তা তারেক রহমানের হাতে তুলে দেন। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বেগম জিয়াকে ‘গণতন্ত্রের জননী’ এবং ‘সাহস ও সংগ্রামের প্রতীক’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। সাক্ষাৎ শেষে ড. জয়শঙ্কর তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লিখেন, ‘ঢাকায় পৌঁছে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিগত চিঠি হস্তান্তরসহ ভারত সরকার ও জনগণের গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছি। আমাদের অংশীদারত্বের উন্নয়নে বেগম খালেদা জিয়ার আদর্শ ও মূল্যবোধ পথ দেখাবে বলে আশা করছি।’ ভারত সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া এই আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি বাংলাদেশের আগামী রাজনীতির প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত অর্থবহ বলে মনে করা হচ্ছে।

ঢাকায় ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের বরফ গলার ইঙ্গিত
এদিনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর এবং পাকিস্তানের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির স্পিকার সরদার আইয়াজ সাদিকের মধ্যকার সৌজন্য সাক্ষাৎ। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের নেতাদের মধ্যে সরাসরি সংলাপ কার্যত স্থবির থাকলেও ঢাকার মাটিতে তাঁরা একে অপরের সাথে করমর্দন ও কুশল বিনিময় করেন। কূটনৈতিক মহলে এই সাক্ষাৎকে ‘বড় ব্রেকথ্রু’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যমগুলো এই সাক্ষাৎকে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে ইতিবাচক বার্তা হিসেবে প্রচার করছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ
কেবল জানাজা নয়, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পাকিস্তানের স্পিকারের এই সফরকে ঘিরে রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও ছিল ব্যস্ততা। তাঁরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গেও বৈঠক করেন। এছাড়া নেপাল ও ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরাও শোক জানাতে ঢাকায় এসে সরকার ও বিএনপির নেতৃত্বের সাথে দেখা করেন।

প্রসঙ্গত, এদিন বিকেল ৩টা ৩ মিনিটে অর্ধকোটির বেশি মানুষের হাহাকারে স্তব্ধ হয়ে যায় রাজধানী। বায়তুল মোকাররমের খতিবের ইমামতিতে জানাজা শেষ হওয়ার পর এক শোকাতুর পরিবেশে বেগম জিয়াকে তাঁর স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে দাফন করা হয়। ভোরের আলোয় যে মহাপ্রাণ নিভে গিয়েছিল, সন্ধ্যার আঁধারে তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন এক রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক মর্যাদার আবহে। ঢাক বুধবার কেবল একটি জানাজার সাক্ষী থাকেনি, বরং সাক্ষী হয়েছে এমন এক কূটনৈতিক মেরুকরণে- যা হয়তো আগামীর দক্ষিণ এশীয় রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করে দেবে। 


Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: