দেশপ্রেম ও আপসহীনতার প্রতিশব্দ বেগম খালেদা জিয়া। কোটি কোটি মানুষের শ্রদ্ধা ভালোবাসায় সিক্ত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনের সমাপ্তি টেনে গতকাল মঙ্গলবার সকালে মহামহিম সৃষ্টিকর্তার ডাকে সারা দিয়ে চলে গেছেন ওপারের সুন্দর ভুবনে। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তাঁর জীবনাবসানে হঠাৎ যেন থমকে গেল সবকিছু। কুয়াশা ঢাকা ভোরের সূর্য যেন সবার জেগে ওঠার আগেই নীরবে জানিয়ে দিল তাঁর শেষযাত্রার খবর। দলের নেতাকর্মীসহ দেশের সর্বস্তরের মানুষ বেদনাহত, অশ্রুসিক্ত। বেগম জিয়ার স্মৃতিচারণ করে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন বহু নেতাকর্মী।
বহুমাত্রিক রাষ্ট্রনায়ক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সান্নিধ্যধন্য সহধর্মিনী বেগম খালেদা জিয়া। জিয়াউর রহমানের শাহাদাত বরণের পর দলের শীর্ষ নেতাদের অনুরোধে গৃহকোণ থেকে রাজনীতির কণ্টকাকীর্ণ পথে পা রাখেন তিনি। সেদিন দেশের সংঘাতময় রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়ার উজ্জ্বল উপস্থিতি পুরো জাতিকে দিয়েছিল আশা-ভরসা। তিনি তাঁর মার্জিত ব্যক্তিত্ব, প্রাঞ্জল উপস্থাপনা, ধৈর্য ও প্রজ্ঞা দিয়ে খুব অল্প দিনে জনগণের দৃষ্টি কেড়েছিলেন। জনগণ তাঁকে এক দুবার নয় তিনবার প্রধানমন্ত্রীর আসনে অভিষিক্ত করেছিল। তাঁর স্পষ্টভাষণ ও রাষ্ট্রনায়কোচিত বাচনভঙ্গি তাঁর অনন্য বৈশিষ্ট্য। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও বেনজির ভুট্টোর পর মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় মহিলা প্রধানমন্ত্রী। দেশের সীমানা পেরিয়ে তিনি জায়গা করে নিয়েছিলেন বিশ্ব নন্দিত নেতাদের পাশে। ফোর্বস সাময়িকীর বিশ্বের ১০০ ক্ষমতাবান নারী নেতৃত্বের তালিকায় ২০০৪ সালে খালেদা ১৪তম হন। স্বামী জিয়াউর রহমান কর্তৃক ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপিকে জনপ্রিয় দলে পরিণত করেন। ১৯৭৭ সালে তার স্বামী রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর খালেদা জিয়া বাংলাদেশের ফার্স্টলেডি হিসেবে জাতীয়ভাবে পরিচিত হন। ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমান হত্যার শিকার হলে খালেদা জিয়া রাজনীতিতে যোগ দেন এবং বিএনপির নেতৃত্বে আসেন। ১৯৮২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর, তিনি গণতন্ত্রের জন্য চলমান আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে সাহায্য করেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হলে তিনি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ১৯৯৬-এর স্বল্পস্থায়ী সরকারেও তিনি দায়িত্বপালন করেন, যেখানে অধিকাংশ বিরোধী রাজনৈতিক দল নির্বাচনটি বর্জন করেছিল। পরবর্তীকালে রাজনৈতিক দলগুলোর যুগপৎ আন্দোলনে তিনি ক্ষমতা ছেড়ে দেন এবং পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে। ২০০১ সালে তার দল পুনরায় ক্ষমতায় আসে এবং তিনি ২০০৬ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৬ সালে তার সরকারের শাসনকাল শেষ হওয়ার পর, ২০০৭ সালে নির্ধারিত নির্বাচন রাজনৈতিক সহিংসতা ও অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে বিলম্বিত হলে, সেনাবাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। সেই সরকারের সময়কালে খালেদা জিয়া তার দুই সন্তান-সহ দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হন। ২০১৮ সালে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা এবং ২০১৮ সালে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়াকে মোট ১৭ বছরের কারাদন্ড দেওয়া হয়। ২০১৯ সালের এপ্রিলের তাকে কারাগার থেকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। ২০২০ সালের মার্চে মানবিক কারণে তাকে ছয় মাসের জন্য গৃহবন্দি করে মুক্তি দেয় শেখ হাসিনা সরকার এবং রাজনীতিতে কোনো ধরণের সম্পৃক্ততা নিষিদ্ধ করা হয়। পরবর্তীকালে জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাহী আদেশে খালেদার দন্ড মওকুফ করে তাকে মুক্তি দেন। ২৭ নভেম্বর ২০২৪ খালেদা জিয়া দুর্নীতির মামলা থেকে খালাস পান।
বেগম খালেদা জিয়ার জন্ম নাম খালেদা খানম পুতুল। ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্টে ব্রিটিশ ভারতের বঙ্গ প্রদেশের জলপাইগুড়িতে তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। তিন বোন এবং দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি তৃতীয়। ভাইয়েরা সবার ছোট। তার পিতামহ হাজী সালামত আলী, মাতামহ জলপাইগুড়ির তোয়াবুর রহমান। তার বাবা ইস্কান্দর মজুমদার এবং মা বেগম তৈয়বা মজুমদার। পরবর্তীতে তারা চলে আসেন দিনাজপুরের মুদিপাড়ায়। আদি পৈতৃকনিবাস অধুনা বাংলাদেশের ফেনী জেলার ফুলগাজী উপজেলার শ্রীপুর গ্রামের মজুমদার বাড়ি। বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। ১৯১৯ সালে ফেনী থেকে জলপাইগুড়ি যান। বোনের বাসায় থেকে মেট্রিক পাস করেন ও পরে চা ব্যবসায়ে জড়িত হন। ১৯৩৭ সালে জলপাইগুড়িতে বিয়ে করেন। জলপাইগুড়ির নয়াবস্তি এলাকায় ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত বসবাস করেন এবং ১৯৮৪ সালের ১৫ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। মা বেগম তৈয়বা মজুমদার ছিলেন একান্তভাবে একজন গৃহিণী। তিনি বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গেই থাকতেন। খালেদা পাঁচ বছর বয়সে দিনাজপুরের মিশন স্কুলে ভর্তি হন এরপর তিনি দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন । একই বছর তিনি জিয়াউর রহমানকে বিয়ে করেন। এরপর থেকে তিনি খালেদা জিয়া বা বেগম খালেদা জিয়া নামে পরিচিতি লাভ করেন।