এক মহাকাব্যের ইতি টেনে কোটি মানুষের অশ্রুশিক্ত ভালবাসায় চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া।
বুধবার বিকাল সাড়ে চারটার দিকে ঢাকার শের-এ-বাংলা নগরে অবস্থিত জিয়া উদ্যানে স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধির পাশেই তাকে রাষ্ট্রীয় মর্জাদায় দাফন করা হয়। এরপর সশস্ত্র বাহিনী কুচকাওয়াজে তাকে ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়া হয়।
দাফন শেষে খালেদা জিয়ার সমাধিতে মহামান্য রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিনের পক্ষে তার সামরিক সচিব ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ইউনূস, উপদেষ্টা পরিষদের পক্ষ থেকে ড. আসিফ নজরুল ফুলের শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। পরে খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ সন্তান ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং সেনা, বিমান ও নৌবাহিনীর প্রধানরা সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। সবশেষে খালেদা জিয়ার আত্মার মাগফেরাত কামনায় দোয়া মোনাজাত করা হয়।
দাফনের সময় কবরের পাশে তারেক রহমানের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন ছোট ভাই শামীম ইস্কান্দারসহ পরিবারের নিকটাত্মীয়, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের সিনিয়র নেতা এবং সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। কবর থেকে কিছুটা দূরে দাড়িয়ে তাকিয়ে ছিলেন তারেক রহমানের সহধর্মিনী ডা. জোবাইদা রহমান ও মেয়ে জাইমা রহমান, ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী সৈয়দা শামিলা রহমান। আপোশহীন এই নেত্রীকে শেষ বিদায় জানাতে জিয়া উদ্যানের চারপাশে হাজার হাজার নেতাকর্মী ভিড় করলেও দাফন প্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন করতে নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষ থেকে কড়াকড়ি আরোপ করাসহ জনসাধারণের চলাচল সীমিত রাখা হয়।
এর আগে, বেলা তিনটায় সংসদ ভবনের মাঠ ও তার সংলগ্ন মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ এলাকায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় খালেদা জিয়ার জানাজা নামাজ সম্পন্ন হয়। সেই নামাজে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস, দেশ-বিদেশের গন্যমান্য ব্যক্তি, বিএনপির নেতাকর্মীসহ লাখ লাখ মানুষ অংশ নেন। জানাজা শেষে সংসদ ভবন থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া নিরাপত্তায় জাতীয় পতাকায় মোড়া লাশবাহী গাড়িতে করে মরদেহ জিয়া উদ্যানে নেওয়া হয়। লাশবাহী গাড়ি সমাধির কাছাকাছি যাওয়ার পর খালেদা জিয়ার মরদেহবাহী কফিন কাঁধে নিয়ে কবর পর্যন্ত যান সেনা, বিমান ও নৌবাহিনীর সদস্যরা। এরপর সবার আগে কবরে নেমেছেন বড় সন্তান তারেক রহমান। পরে খালেদা জিয়াকে কবরে শায়িত করা হয়। দু’হাত ভরে মাটি নিয়ে মায়ের কবরে ছিটিয়ে দিয়ে শেষ বিদায় জানান ছেলে তারেক রহমান।
গত মঙ্গলবার দুপুরে খালেদা জিয়াকে তার স্বামী জিয়াউর রহমানের সমাধির পাশে কবর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তার পরিবার ও দল এবং রাষ্ট্রীয় মর্জাদায় জানাজা ও দাফনের সিদ্ধান্ত নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এর পরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেওয়া হয় জিয়া উদ্যান ও এর চারপাশের এলাকা। বিকেল থেকেই দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের ভিড় বাড়তে শুরু করেছে জিয়া উদ্যান এলাকায়, কিন্তু সমাধির আশেপাশে দলের শীর্ষ নেতা ছাড়া কাউকে ভিড়তে দেয়নি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। জিয়াউর রহমানের কবরের পূর্ব পাশে কবর খোঁড়ার সিদ্ধান্ত হয়। এরপর গণপূর্তের প্রকৌশলীরা গিয়ে ডিজাইন ও সাইজ ঠিক করে দিয়ে আসেন। সন্ধ্যা থেকে শুরু হয় কবর খননের কাজ। গতকাল সকালের মধ্যে শ্রমিকরা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নির্ধারিত স্থানে কবর খোড়া সম্পন্ন করেন। মঙ্গলবার থেকে কয়েক দফায় কবর পরিদর্শনে যান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদসহ বিএনপি শীর্ষ নেতা ও সরকারের প্রতিনিধিরা। সালাহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে একজন আর্কিটেক্টের নকশা অনুযায়ী কবর খোঁড়ার কাজ পরিচালিত হয়। ভবিষ্যতে পুরো এলাকাটি পুনর্গঠন করে কীভাবে সৌন্দর্য বর্ধন করা যায়, সে বিষয়টি পরবর্তীতে বিবেচনা করা হবে।
উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর বিদায়ে সরকার দেশে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ও গতকাল বুধবার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে।