তখন ঘড়ির কাটায় সকাল ৯টা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় শহরের চর্তুর দিক থেকে পিপিলিকার মতো ছুটছে মানুষ। উদ্দেশ্য বিদায় বেলায় প্রিয় মানুষটাকে শেষ বারের মতো স্মরণ করে অশ্রুজলে দু’হাত ভরে দোয়া করা। দুপুর ১টায় লাখ লাখ মানুষে পরিপূর্ণ পুরো মানিক মিয়া এভিনিউ এবং এর আশপাশের সড়ক।
দুপুর দেড়টায় যেন তিল ঠাঁইয়ের কোনো স্থান নেই। শ্রমিক, দিনমজুর থেকে শুরু করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি’র সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা মিলেমিশে একাকার। নিস্তব্ধ, নিরব মানুষগুলোর কেউ কেউ আকাশ পানে চাইছে। আবর কেউ বেগম খালেদা জিয়ার বিভিন্ন স্মৃতিচারণ করছেন। উপস্থিত সব মানুষের চেহারায় কেমন যেন এক নিরব বেদনার ছাঁপ। মনে হয় তাদের আপন কেউ ছেড়ে গেছে পরপারে।
ধানমন্ডি ২৭ নম্বর থেকে একটু এগিয়ে মানিক মিয়া এভিনিউয়ের ঠিক মোড় পেরিয়ে হাতের বা’দিকে রাখা হয়েছে বেগম জিয়ার মরদেহ। আর চারদিকে দাঁড়িয়ে অঝরে কাঁদছেন হাজার হাজার নেতাকর্মী। সেখানেই কথা হয় জাসাস কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক নির্বাহি সদস্য রাশেদ উল হক সরকারের সাথে। তিনি বলেন, বলার মতো কিছুই নেই। আমি নির্বাক। বাংলার আকাশ থেকে একটি উজ্জল নক্ষত্র হারিয়ে গেলো। দেশের এই অমূল্য সম্পদ বড় অসময় সৃষ্টিকর্তা নিয়ে গেলেন। তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়া ১৯৮৭ সালে রংপুর সফর কালে ৪ দিন আমাদের রংপুরের বাড়িতে ছিলেন। আমাদের বাসা থেকেই তিনি সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। তখন আমি ছোট ছিলাম। ঠিক তখন থেকেই এখন পর্যন্ত দীর্ঘ সংগ্রামের জীবন খুব কাছ থেকে দেখেছি। তিনি কখনই অন্যায়ের সাথে আপস করেননি। কবিতার ভাষায় রাশেদ বলেন,
‘ মনে রেখো, এই কর্ম, এই ভালোবাসা, এই ত্যাগ,
অমলিন হবে, চিরকাল ইতিহাসের পাতায়।
মহাকাল মনে রেখো, এই মানুষের জীবন,
এক অশ্রুজল, এক হাসি, এক গান, এক কবিতা।
মনে রেখো, এই সংগ্রাম, এই জয়, এই পরাজয়,
সবই লেখা, তোমারই নীল খাতায়।
মহাকাল, মনে রেখোএই মানুষের আত্মা,
অমর, অজর, অনন্ত, চিরকাল অমলিন......
দুপুর পৌঁনে দু’টায় জানাজায় মানুষের উপস্থিতি জনস্রোতে রূপ নেয়। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই মানিক মিয়া এভিনিউ মোড় থেকে জানাজা নামাজের কাতার ধানমন্ডি ২৭ নম্বর মোড়, সোবহানবাগ এবং ধানমন্ডি ৩২ নম্বর ছাড়িয়ে যায়। জায়গা সংকুলান না হওয়ায় ২৭ নম্বর মোড় থেকে পশ্চিম দিকে ধানমন্ডি এলাকার ভেতর পর্যন্ত মানুষ দাঁড়িয়ে পরে।
অন্যদিকে মানিক মিয়া এভিনিউ থেকে আসাদ গেট, কল্যানপুর ছাড়িয়ে যায় জানাজার কাতার। আসাদ গেট এলাকায় কথা হয় মনির হোসেনের সাথে। তিনি বলেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি মেজর জিয়ার জানাজা নামাজে উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য হয়ে ছিল আমার। তখন এত মানুষের সমাগম হয়নি। আমার জীবনে আমি কখনও দেখিনি। এটা নিঃসন্দেহে স্মরণ কালের সব থেকে বড় জানাজা।
বেলা ২টায় জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হবার কথা থাকলেও তা প্রায় এক ঘন্টা বিলম্ব হয়। কিন্তু ওই সময়ে লোক সমাগম আরো বাড়তে থাকে। মানিক মিয়া এভিনিউ এর দক্ষিণ প্লাজার একেবারে সামন থেকে পূর্ব দিকে (যে পাশে খামার বাড়ি) তাকিয়ে দেখা গেছে শুধু মানুষ আর মানুষ। জানাজা বিলম্বিত হবার কারণে অসংখ্য মানুষ সড়কেই পেপার বিছিয়ে যোহরের নামাজ আদায় করেন।