সর্বোচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকার পরেও থেমে নেই অবৈধভাবে গড়ে উঠা আমিনবাজারের বিলামালিয়া ও বালিয়ারপুরের মধুমতী মডেল টাউনের পিকনিক ও শ্যুটিং স্পট, সুইমিং পুল, রেস্টুরেন্ট, ডুপ্লেক্সে বাড়ি, অট্রালিকা, স্কুলসহ সব ধরনের কার্যক্রম। এসব স্থাপনা উচ্ছেদ করতে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ রাজউক গত বছর ঘোষণা দিলেও প্রভাবশালীদের চাপে পিছু হটেছে। তখন এর নেপথ্যে ছিল তৎকালীন স্থানীয় ভাকুর্তা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাজি আব্দুল বাতেন। কিন্তু তিনি এখন পতালক থাকায় অন্য প্রভাবশালী মহল এর নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) তখনকার রাজউক চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. ছিদ্দিকুর রহমান সরকার বরাবর একটি উকিল নোটিশ পাঠায়। ওই নোটিশের পরিপ্রেক্ষিতে মেট্রো মেকার্স অ্যান্ড ডেভেলপার্স লিমিটেডের মধুমতি টাউন আবাসিক প্রকল্প এলাকায় অবৈধ স্থাপনার উচ্ছেদ কার্যক্রম গ্রহণ বিষয়ে একটি সভা আহ্বান করা হয়। উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন স্টেকহোল্ডার, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং বেলার প্রতিনিধিরা। তখন বলাহয় দুই সপ্তাহের মধ্যেই মধুমতি মডেল টাউন প্রকল্পটির উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক, জেলা পুলিশ, পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে সার্বিক সহায়তা করবে। রাজউকের সঙ্গে সমন্বয় করে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড ওই এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে উচ্ছেদ কার্যক্রম ত্বরান্বিত করবে এবং ভবিষ্যতে রাজউকের অনুমোদন ছাড়া কোনো স্থাপনায় বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হবে না। জেলা প্রশাসনের পক্ষে থেকে জানানো হয়, বর্তমানে এ মৌজায় সব ধরনের নামজারি ও খাজনা আদায় বন্ধ আছে। কিন্তু এরপর আর উচ্ছেদ কার্যক্রম চালানো হয়নি।
এদিকে, গত ছয় বছর আগে এর নাম পাল্টিয়ে দেয়া হয় নান্দনিক হাউজিং। এ নাম দিয়ে সংশ্লিষ্টরা মনে করছিলেন প্রকল্পটি হয়ত রক্ষা করা যাবে। কিন্তু আদালত নির্দেশনা দিয়েছেন এটিকে উচ্ছেদ করতেই হবে। তবে আদালতের নির্দেশনা সংশ্লিষ্টরা আমলে নেয়নি। আর এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত দোষীদের বিরুদ্ধেও নেয়া হয়নি ব্যবস্থা।
জানা যায়, মধুমতি মডেল টাউন সাভারের বন্যাপ্রবাহ অঞ্চলে অবৈধভাবে তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু ২০০৪ সালের আগস্টে এই প্রকল্পের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি (বেলা)। পরে ২০০৫ সালে এ প্রকল্পটি অবৈধ ঘোষণা করেন উচ্চ আদালত। সর্বশেষ ২০২১ সালের ২৫ এপ্রিল পাঁচটি রিভিউ পিটিশন খারিজ করে পূর্বের রায় বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। তখন রায়ের ছয় মাসের মধ্যে আগের অবস্থায় রূপান্তর করতেও নির্দেশনা দেওয়া হয়।
তবে এর কোনটিই বাস্তবায়ন হয়নি। বরং নাম পরিবর্তন করে নির্মাণ করা হচ্ছে নতুন নতুন স্থাপনা। মধুমতি মডেল টাউন নামে প্রায় ৫৫০ একর জমি ক্রয় করে মেট্রো মেকারস অ্যান্ড ডেভেলপারস লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান। যদিও বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনে কোনো কোম্পানি কিংবা ব্যক্তির মালিকানাধীন ১০০ একরের বেশি জমি থাকার বিধান নেই। এখন অবৈধ এ হাউজিংয়ে এখনও অনেক ভবনের কাজ চলছে। অনেকে কৌশলে প্লট হাতবদলও করেছেন। প্লট বিক্রির জন্য রীতিমতো মোবাইল ফোন নম্বর দিয়ে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে রাখা হয়েছে। ছয় বছর আগে এর নাম বদল করে নান্দনিক হাউজিং করায় প্লট ও বাড়ির নামফলকে মধুমতি মডেল টাউন মুছে দেয়া হয়েছে। অনেকে লাগিয়েছেন নতুন নতুন নামফলক। এলাকা বড় করতে আশপাশের ডোবা নালা ভরাট করা হয়েছে। প্রকল্পের ভেতরে গড়ে উঠেছে জিঅন, লেকভিউ, অনভ্যালী, কল্লোল, ছায়াবীথি, রাজমহল নামে ছয়টি রিসোর্ট।
আধুনিক ডিজাউনের অনেক বাড়িতে এখনও রাতভর চলে পার্টি ও জুয়ার আসর। সেখানে গড়ে উঠা মিনি বারে গত আওয়ামীলীগ সরকারের সময় একাধিকবার অভিযানও চালিয়েছে আইনশৃঙ্খা বাহিনী। তবুও থেমে ছিলনা অসামাজিক কর্মকান্ড। কিন্তু এরপর আর অভিযান চালানো হয়নি। এছাড়া, বালু দিয়ে জমি ভরাট, ইট, বালু, রড সিমেন্ট সরবরাহ নিয়ে গড়ে উঠেছে সিন্ডিকেট। আছে প্লাস্টিকসামগ্রী তৈরির কারখানাও। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বন, পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের প্রতিষ্ঠান বেলা এ বিষয়ে উচ্চ আদালতে রিট মামলাটি করেছিলেন। এ বিষয়ে রিজওয়ানা বলেছেন এটি নান্দনিক হোক বা দৃষ্টি নন্দন হোক, এটিকে বৈধতা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। দ্রুত বিদ্যুৎ লাইন কেটে দিতে হবে। স্থাপনাগুলো বুলডোজার দিয়ে ভাঙতে হবে। আমাদের তো মধুমতির ব্যাপারে ব্যক্তিগত কোনো আক্রোশ ছিলনা উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, মধুমতির রায়কে ভিন্নপথে চালিত করতে মাস্টারপ্ল্যানে জলাশয়কে আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি করে হাউজিংয়ের যোগ্য দেখানো হয়েছিল। আর আগের যে সরকার ছিল তার কাছে তো আদালতের রায় বাস্তবায়নের আশা করা যায় না। কিন্তু এখন তো বাস্তবতা ভিন্ন। এখন আইনের শাসনের দিকে যেতে হলে জলজ্যান্ত দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। আশাকরি দ্রুত এ মডেল টাউন উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু হবে।