ফলমূলও রপ্তানির ক্ষেত্রে আগামী দিনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে
সামষ্টিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ওতপ্রোতভাবে কৃষি উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বর্তমান কৃষিব্যবস্থার উন্নয়নে আধুনিক প্রযুক্তির প্রসার, যান্ত্রিকীকরণ, উন্নত কৃষি উপকরণের সহজলভ্যতা (বীজ, সার ও সেচ), উন্নত গবেষণার মাধ্যমে নতুন নতুন কৃষিপ্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং কৃষকের দ্বারপ্রান্তে কৃষিপ্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষির উৎপাদনশীলতা ও মোট উৎপাদন প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এর ফলে খোরপোশ কৃষি বাণিজ্যিক কৃষিতে রূপান্তরিত হয়েছে। কৃষকরা প্রচলিত চাষাবাদ পদ্ধতির পাশাপাশি বিপুল পরিমাণে শাকসবজি ও ফলমূল আবাদ করছেন। ফলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে এখন শাকসবজি ও ফলমূল বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। এছাড়াও বিভিন্ন কোম্পানি কৃষিজাত পণ্য প্রক্রিয়াজাত করে বিদেশে রপ্তানি করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের নামীদামি ব্র্যান্ডের বিক্রয়কেন্দ্রে বাংলাদেশে তৈরি ট্যাগ লাগানো পোশাকের আধিক্য নতুন কিছু নয়। তবে মধ্যপ্রাচ্য, ইইউ, এমনকি আফ্রিকা অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের সুপারশপে এখন ‘বাংলাদেশে তৈরি’ প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের দেখাও মেলে। এই প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যই নতুন রপ্তানি খাত হিসেবে আশা দেখাচ্ছে।
জানা যায়, কৃষিপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে নতুন নতুন পণ্য যুক্ত হচ্ছে এবং প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যও রপ্তানির তালিকায় অধিকহারে যুক্ত হচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে নানাবিধ কৃষিপণ্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। এরমধ্যে পাট ও পাটজাত দ্রব্য, চা পাতা, আম, কাঁঠাল, লেবু, লিচু, লটকন, ফুড স্টাফ প্রভৃতি রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের কৃষিপণ্য রপ্তানি হয়েছে এবং রপ্তানির পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। কৃষিপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে শাকসবজি এগিয়ে রয়েছে। তবে ফলমূলও রপ্তানির ক্ষেত্রে আগামী দিনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশ থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, কাতার, যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব, কুয়েত, সিঙ্গাপুর, শ্রীলংকা ও নেপালে সবজি রপ্তানি হয়। কাতার, ভারত, ভিয়েতনাম, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কুয়েত, সৌদি আরব ও অস্ট্রেলিয়ায় ফল রপ্তানি হয়। অন্যান্য দেশের রপ্তানির সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ এখনও কৃষিপণ্য রপ্তানির বাজারে উল্লেখযোগ্য হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেনি। কৃষিপণ্য রপ্তানির সম্ভাবনার পাশাপাশি অনেক প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। পণ্য রপ্তানির জন্য অনেক সময় বিমানে পর্যাপ্ত জায়গা মেলে না। এছাড়াও বিভিন্ন পণ্যের জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষাগারের অভাব, বিমানবন্দরে হিমাগারের পর্যাপ্ত সুবিধা না থাকা; বিভিন্ন কৃষিপণ্যের কাঙ্ক্ষিত জাতের অভাব এসব বিষয় রয়েছে। পাশাপাশি আমদানিকারক দেশগুলোয় কী কী পণ্যের চাহিদা রয়েছে; সে বিষয়ে তথ্য সরবরাহ নিশ্চিতকরণসহ নতুন নতুন বাজার অন্বেষণ করা দরকার।
কয়েকজন উদ্যোক্তা জানান, কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রপ্তানিতে বড় সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে এ খাতে। তার মধ্যে অন্যতম প্রক্রিয়াজাত খাদ্য উৎপাদনের জন্য বিভিন্ন ধরনের উপকরণ উচ্চ শুল্ক দিয়ে আমদানি করতে হয়। এ ক্ষেত্রে রপ্তানিমুখী কারখানা বন্ডেডওয়্যার হাউস সুবিধায় এসব উপকরণ শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করে। অন্য কারখানাগুলো এই সুবিধা না পেলেও নগদ সহায়তা পায়। যদিও উন্নয়নশীল দেশ হলে নগদ সহায়তা থাকবে না। ফলে ছোট-বড় সব রপ্তানিকারকের জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধায় উপকরণ আমদানির সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে প্রাণ গ্রুপের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আহসান খান চৌধুরী বলেন, ‘কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের রপ্তানিতে বাংলাদেশের সম্ভাবনা অসীম। তবে আমরা এখনো সম্ভাবনার ১ শতাংশও কাজে লাগাতে পারিনি। আমাদের কোম্পানির রপ্তানি ৩০ কোটি ডলার। তবে খুব সহজেই সেটিকে ৩০ বিলিয়নে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। তবে সীমাবদ্ধতাও আছে।’ আহসান খান চৌধুরী আরও বলেন, প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য উৎপাদনে বাংলাদেশে অনেক শিল্পকারখানা গড়ে উঠবে। তার জন্য কয়েকটি ফসলকে টার্গেট করে উৎপাদন বাড়াতে হবে। তা ছাড়া শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আনার জন্য ছোট; মাঝারি ও বড় কারখানাকে সুযোগ দিতে হবে। এটি করা গেলে উদ্যোক্তাদের নগদ সহায়তার কোনো প্রয়োজন হবে না।
কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য খাতের সম্ভাবনা নিয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডার) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক বাজারের আকার ছিল ১৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন বা ১৩ লাখ ৩০ হাজার মার্কিন ডলার। আর গত বছর বাংলাদেশের প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের বাজার (দেশীয় চাহিদা ও রপ্তানি) ছিল ৪৮০ কোটি ডলারের। আর কৃষিপণ্যের বাজার ছিল ৪ হাজার ৭৫৪ কোটি ডলারের। দেশে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের প্রায় এক হাজার কারখানা রয়েছে। তার মধ্যে ৯০ শতাংশই অতি ক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র। বাকি ১০ শতাংশ মাঝারি ও বড়। এর মধ্যে রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ২৫০ কারখানা। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, গত অর্থবছর মোট ৫ হাজার ৫৫৬ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানির মধ্যে কৃষিজাত খাদ্যপণ্যের হিস্যা ছিল দেড় শতাংশ। বাংলাদেশ এক বিলিয়ন ডলারের কৃষিজাত পণ্য রপ্তানি করলেও পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত এ ক্ষেত্রে বেশ এগিয়ে আছে।
বর্তমানে বিশ্বের ২০টি দেশে বিভিন্ন ধরনের প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, পানীয় ও মসলা রপ্তানি করে চট্টগ্রামভিত্তিক কোম্পানি হিফস অ্যাগ্রো ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ। গত বছর প্রতিষ্ঠানটির রপ্তানি ছিল ৩২ লাখ মার্কিন ডলার। হিফস অ্যাগ্রোর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ছৈয়দ মুহাম্মদ সোয়াইব হাছান বলেন, ‘আমরা প্রক্রিয়াজাত খাদ্য উৎপাদনে প্রতিনিয়ত শিখছি। সরকারের বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা মাঝেমধ্যে কারখানা পরিদর্শনে এসে কোনো ত্রুটিবিচ্যুতি পেলে উদ্যোক্তাদের জরিমানা করেন। এ ক্ষেত্রে তারা ত্রুটি চিহ্নিত করার পর তা সংশোধনের জন্য উদ্যোক্তাদের যদি সময় বেঁধে দেন এবং সেই সময় পর আবার পরিদর্শন করে যাচাই করেন, তাহলে আমরা এগিয়ে যাব। এছাড়া প্যাকেজিং বা মোড়ক পণ্য এবং বিভিন্ন ধরনের উপকরণ আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়া হয়; তাহলে কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত পণ্যের রপ্তানি দ্বিগুণ করা সম্ভব।’