জ্বালানি, কাঁচামাল ও পরিচালন ব্যয় বাড়ছে। কিন্তু সেই অনুপাতে পণ্যের দাম বাড়ানোর সাহস পাচ্ছে না জাপানের অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। কারণ, কয়েক দশকের মূল্যহ্রাসের অভ্যাসে গড়ে ওঠা ক্রেতাদের মধ্যে দাম বাড়ানোর বিষয়ে এখনো প্রবল অনীহা রয়েছে। ক্রেতাদের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় বড় ব্র্যান্ড থেকে শুরু করে ছোট দোকান—সবাই মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিতে হিমশিম খাচ্ছে।
এর সাম্প্রতিক উদাহরণ জাপানের জনপ্রিয় পোশাক ব্র্যান্ড ইউনিক্লো। গত মাসে প্রতিষ্ঠানটি সাধারণ মোজার দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলেও ক্রেতাদের তীব্র অসন্তোষের মুখে তা প্রত্যাহার করে নেয়। সাশ্রয়ী দামের জন্য পরিচিত ব্র্যান্ডটির ভাবমূর্তি ধরে রাখতেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় গণমাধ্যম।
একই ধরনের পরিস্থিতিতে পড়েছে ইতালীয় ধাঁচের রেস্তোরাঁ চেইন সাইজেরিয়া। প্রতিষ্ঠানটি তাদের জনপ্রিয় খাবার ‘মিলানিজ ডোরিয়া’র দাম ২০ ইয়েন বাড়ানোর ঘোষণা দিয়ে প্রায় ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে বিবৃতি দেয়। মূল্যবৃদ্ধির পেছনে নিজেদের যথেষ্ট চেষ্টা না করার বিষয়টিও স্বীকার করে তারা। এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিষ্ঠানটির প্রেসিডেন্ট ভবিষ্যতে দাম কমানোর সম্ভাব্য উপায় খুঁজে দেখার আশ্বাস দেন। তাঁর এ বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিস্ময়ের জন্ম দেয়।
বিশ্বের অনেক দেশে বাড়তি উৎপাদন ব্যয় সামাল দিতে পণ্যের দাম বাড়ানো স্বাভাবিক হলেও জাপানে বিষয়টি এত সহজ নয়। দীর্ঘদিনের মূল্যহ্রাসের অভিজ্ঞতায় দেশটির ক্রেতারা কম দামের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। ফলে মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সামাজিক ও বাণিজ্যিক চাপ তৈরি করছে।
গত মাসে জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, দেশটির মূল্যস্ফীতি ২ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছেছে। অথচ দীর্ঘ সময় ধরে মূল্যহ্রাসের প্রবণতা কাটাতে ২০১৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে বিশেষ অর্থনৈতিক কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন। পরবর্তী সরকারগুলোও সেই প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে।
২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ও সরবরাহ পরিস্থিতিতে অস্থিরতা তৈরি হলে জাপানে মূল্যস্ফীতি বাড়তে শুরু করে। প্রাকৃতিক সম্পদে সীমিত দেশটি জ্বালানির জন্য আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্নের আশঙ্কা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এতে উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয় বাড়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের।
ক্রেতাদের কাছে দাম বাড়ানোর ব্যাখ্যা
মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে ক্রেতাদের নেতিবাচক মনোভাব বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদেরও চাপে ফেলেছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার দোকান ও রেস্তোরাঁগুলো নিয়মিত ক্রেতাদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে আরও বেশি দ্বিধায় রয়েছে।
পশ্চিম জাপানের ওকায়ামা এলাকার ৬৮ বছর বয়সী রামেন দোকানমালিক সাচি এখনো উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয় বাড়লেও খাবারের দাম বাড়াননি। সম্প্রতি টোকিও সফরের সময় এএফপিকে তিনি বলেন, হঠাৎ করে খাবারের দাম ২০০ ইয়েন বাড়ালে দীর্ঘদিন ধরে তাঁর দোকানকে সমর্থন দিয়ে আসা ক্রেতাদের কাছে নিজেকে অপরাধী মনে হবে। তাঁদের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে বলেও মনে করেন তিনি।
সাচি বলেন, আপাতত নিজেই বাড়তি ব্যয়ের চাপ সামলে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তাঁর ধারণা, গ্রামীণ এলাকার অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী একইভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছেন।
সাইজেরিয়া অবশ্য মেন্যুর প্রায় সব খাবারের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলেও কিছু পণ্যের দাম অপরিবর্তিত রেখেছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রতি গ্লাস ১০০ ইয়েনের ওয়াইন। প্রতিষ্ঠানটির জনসংযোগ বিভাগ এএফপিকে জানিয়েছে, সাধারণ মানুষ যাতে সহজেই পানীয়টি উপভোগ করতে পারেন, সে লক্ষ্যেই দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
ব্যয় কমাতে ভোগ কমাচ্ছেন ক্রেতারা
খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় জাপানের পরিবারগুলোর হাতে অন্যান্য পণ্য কেনা কিংবা রেস্তোরাঁয় খাওয়ার জন্য আগের তুলনায় কম অর্থ থাকছে। অন্যদিকে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে শ্রমিকের মজুরি ও কাঁচামালের বাড়তি ব্যয় সামলাতে হচ্ছে।
দেশটির শ্রম মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রকৃত মজুরি টানা আট মাস ধরে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে। তবে এই বৃদ্ধি সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য নয়।
টোকিওর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী কাজুহিকো সাতো বলেন, খাদ্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় তাঁকে এখন আমদানি করা পণ্যের ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে। কারণ, দেশে উৎপাদিত অনেক পণ্যের দাম আরও বেশি। এ পরিস্থিতিতে বাইরে খাওয়াদাওয়াও কমিয়ে দিয়েছেন তিনি।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার বাড়ানোর সিদ্ধান্তও অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করেছে। দেশটিতে ঋণের সুদের হার ৩০ বছরের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ভবিষ্যতে তা আরও বাড়তে পারে।
টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সুতোমু ওয়াতানাবে মনে করেন, জাপানে মজুরি বৃদ্ধি এখনো প্রয়োজনের তুলনায় কম এবং এই সুবিধা সব কর্মজীবী মানুষের কাছে পৌঁছায়নি। তাঁর মতে, জি-৭-এর অন্যান্য দেশে মূল্যস্ফীতি জাপানের সমান বা বেশি হলেও সেখানে মজুরি তুলনামূলকভাবে বেশি বেড়েছে। ফলে সেসব দেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও ব্যয় করার প্রবণতা জাপানের মতো দুর্বল হয়নি।
এএফপিকে ওয়াতানাবে বলেন, কয়েক দশকের মূল্যহ্রাসের অভিজ্ঞতা থেকে বেরিয়ে আসতে জাপানের অর্থনীতিকে সময় দিতে হবে। পণ্যের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে এখনো ক্রেতাদের মনোভাবই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
তাঁর ধারণা, মজুরি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতিকে স্বাভাবিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে মেনে নিতে জাপানের ক্রেতাদের মানসিক পরিবর্তনে আরও তিন থেকে চার বছর লাগতে পারে। টানা ৩০ বছর মূল্যহ্রাসের অভিজ্ঞতার পর নতুন অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে সময় লাগাটাই স্বাভাবিক।
তথ্যসূত্র: এএফপি