জীবনসঙ্গী খুঁজে দিতে ব্যতিক্রমী প্রতিশ্রুতি নিয়ে আলোচনায় এসেছে চীনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) ডেটিং অ্যাপ ‘লিয়াংপেই এআই’। অ্যাপটির মাধ্যমে সঙ্গী খুঁজে নিয়ে তিন বছরের মধ্যে বিয়ে করতে না পারলে ব্যবহারকারীর কাছ থেকে নেওয়া বার্ষিক সাবস্ক্রিপশন ফি পুরোপুরি ফেরত দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এমন অভিনব শর্ত ঘিরে চীনের প্রযুক্তি ও ডেটিং অঙ্গনে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আলোচনা।
চলতি বছরের জুলাইয়ে যাত্রা শুরু করা অ্যাপটির বার্ষিক সাবস্ক্রিপশন ফি ২ হাজার ইউয়ান, যা প্রায় ৩০০ মার্কিন ডলারের সমান। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা জেং জিনসুনের দাবি, ব্যবহারকারীকে দীর্ঘদিন অ্যাপে আটকে রাখা নয়, বরং সফলভাবে জীবনসঙ্গী খুঁজে দেওয়াই তাদের মূল লক্ষ্য।
চীনের প্রচলিত ডেটিং অ্যাপগুলোর ব্যবসায়িক কৌশল থেকে সম্পূর্ণ আলাদা পথে হাঁটছে লিয়াংপেই এআই। সাধারণ অ্যাপে একসঙ্গে একাধিক ব্যক্তির প্রোফাইল দেখা, পছন্দের মানুষকে সোয়াইপ করা কিংবা একাধিকজনের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ থাকে। কিন্তু এই অ্যাপে এক সময়ে কেবল একজনের সঙ্গেই পরিচয় ও যোগাযোগের সুযোগ রয়েছে। চলমান সম্পর্কের ইতি না ঘটানো পর্যন্ত নতুন কারও প্রোফাইল দেখা বা যোগাযোগ করা যায় না।
যাচাই-বাছাইয়ে কঠোর নিয়ম
অ্যাপটিতে নিবন্ধনের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত করতে হয়। পাশাপাশি অবিবাহিত থাকার সনদ ও ছবি যাচাইও বাধ্যতামূলক। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, চালুর প্রথম মাসেই এই যাচাই প্রক্রিয়ায় ১৫০ জনের বেশি বিবাহিত ব্যক্তিকে শনাক্ত করে প্ল্যাটফর্ম থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
নিবন্ধনের পর ব্যবহারকারীদের প্রায় ২০ মিনিটের একটি এআইভিত্তিক কথোপকথনে অংশ নিতে হয়। এ সময় তাঁদের পারিবারিক অবস্থা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশা, ব্যক্তিগত পছন্দ, জীবনযাপনের ধরন এবং ভবিষ্যৎ জীবনসঙ্গী সম্পর্কে প্রত্যাশা জানতে চায় এআই। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে তৈরি করা হয় ব্যবহারকারীর বিস্তারিত প্রোফাইল। এরপর সেই অনুযায়ী উপযুক্ত সঙ্গী খুঁজে দেওয়ার চেষ্টা করে প্ল্যাটফর্মটি।
চাকরি ছেড়ে ডেটিং অ্যাপ তৈরির উদ্যোগ
লিয়াংপেই এআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা জেং জিনসুন আগে চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মুনশট এআইয়ের জনপ্রিয় চ্যাটবট ‘কিমি’র সার্চ প্রযুক্তি বিভাগে কাজ করতেন। চাকরির সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে এক প্রার্থীর কাছ থেকে ডেটিং অ্যাপ তৈরির ধারণা পান তিনি।
জেংয়ের উপলব্ধি ছিল, তথ্য অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণে এআই যে দক্ষতা দেখাচ্ছে, তা মানুষের জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রেও কাজে লাগানো সম্ভব। এ ভাবনা থেকেই গত বছর কিমি কে২ প্রকাশের সময় নিজের প্রতিষ্ঠান গড়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরে চাকরি ছেড়ে লিয়াংপেই এআই নিয়ে কাজ শুরু করেন।
জেংয়ের মতে, প্রচলিত ডেটিং অ্যাপগুলো মূলত মানুষের সামনে একগুচ্ছ প্রোফাইল তুলে ধরে। কিন্তু প্রকৃত পরিচয়, পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সম্পর্ক গড়ে তোলার দায়িত্ব ব্যবহারকারীদের ওপরই ছেড়ে দেয়। অথচ বর্তমান প্রজন্মের জীবনসঙ্গী নির্বাচনের মানদণ্ড অনেক বেশি জটিল। এআইয়ের মাধ্যমে সেই চাহিদা বুঝে উপযুক্ত মানুষের সন্ধান দেওয়া সম্ভব।
নিজের জীবনের অভিজ্ঞতাও এ উদ্যোগের পেছনে ভূমিকা রেখেছে বলে জানান জেং। তাঁর স্ত্রীকে তিনি নিজেও একটি ডেটিং অ্যাপের মাধ্যমে খুঁজে পেয়েছিলেন। দুজনের মধ্যে গভীর পরিচয় তৈরি হওয়ায় মাত্র এক দিনের কথোপকথনের পরই তাঁরা সরাসরি দেখা করার সিদ্ধান্ত নেন।
বিয়ে না হলে কেন টাকা ফেরত?
অ্যাপটির অর্থ ফেরতের নীতি সম্পর্কে জেংয়ের বক্তব্য, বিয়ে একটি নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া। সরকারি সনদের মাধ্যমে তা যাচাই করাও সম্ভব। ফলে অ্যাপ ব্যবহার করে কেউ যদি কাঙ্ক্ষিত জীবনসঙ্গী খুঁজে না পান, তাহলে সেই সেবার জন্য অর্থ নেওয়ার যৌক্তিকতা নেই বলে মনে করেন তিনি।
ব্যবহারকারীদের সম্পর্কের সমস্যা সমাধানে অ্যাপটিতে রয়েছে ‘এআই স্ট্র্যাটেজিস্ট’ নামের বিশেষ সুবিধা। সম্পর্কের টানাপোড়েন, যোগাযোগের ঘাটতি কিংবা সঙ্গীর আচরণ বুঝতে এই ফিচারের মাধ্যমে পরামর্শ নেওয়া যায়।
এক নারী ব্যবহারকারী তাঁর বার্তার উত্তর না পাওয়ায় এআইয়ের পরামর্শ চান। উত্তরে তাঁকে জানানো হয়, ব্যস্ততা থাকলেও তিন দিনের মধ্যে সাড়া না দেওয়া সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইতিবাচক সংকেত নয়। পরে ওই নারী সেই সম্পর্ক থেকে সরে এসে নতুন সঙ্গীর সন্ধান শুরু করেন।
ব্যবহারকারী ৩৫ হাজার ছাড়িয়েছে
প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে লিয়াংপেই এআইয়ের নিবন্ধিত ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩৫ হাজারের বেশি। অ্যাপটির কনভারশন রেট প্রায় ৯ শতাংশ। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটি ইতিমধ্যে ১৫ মিলিয়ন ইউয়ান বা প্রায় ২ দশমিক ২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ পেয়েছে।
প্রযুক্তি ও সামাজিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, জীবনসঙ্গী নির্বাচনে এআইয়ের ব্যবহার ডেটিংয়ের প্রচলিত ধারণায় পরিবর্তন আনতে পারে। তবে প্রযুক্তির সহায়তায় পরিচয় ঘটানো গেলেও দীর্ঘস্থায়ী ও সফল সম্পর্কের জন্য পারস্পরিক আস্থা, বোঝাপড়া এবং ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।