৪০০ যুদ্ধজাহাজের বিশাল বহর চীনের, সমুদ্রে বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের দুশ্চিন্তা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোতে প্রতিদিন প্রায় ১০০টি চীনা নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ সক্রিয় থাকছে। দ্রুত সম্প্রসারিত এই নৌ-উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক

2026-11-08T10:53:29+00:00
2026-11-08T10:53:29+00:00
  রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬,
২৪ কার্তিক ১৪৩৩
 
রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
৪০০ যুদ্ধজাহাজের বিশাল বহর চীনের, সমুদ্রে বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের দুশ্চিন্তা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
রোববার, ৮ নভেম্বর, ২০২৬, ১০:৫৩ এএম 
সংগৃহীত ছবি
এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোতে প্রতিদিন প্রায় ১০০টি চীনা নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ সক্রিয় থাকছে। দ্রুত সম্প্রসারিত এই নৌ-উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনাবিদদের মধ্যে। জাহাজের সংখ্যার বিচারে চীনের নৌবহর ইতোমধ্যে মার্কিন নৌবাহিনীকে ছাড়িয়ে গেছে। শুধু আঞ্চলিক জলসীমা নয়, ভারত মহাসাগর থেকে শুরু করে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত নিজেদের সামরিক তৎপরতা বাড়াচ্ছে বেইজিং।

দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের নৌবহরে বর্তমানে ৪০০টির বেশি যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন রয়েছে। সংখ্যার হিসাবে এটি মার্কিন নৌবহরের তুলনায় প্রায় ৩৫ শতাংশ বড়। শান্তিকালীন সময়ে কোনো দেশের নৌবাহিনীর এমন দ্রুত সম্প্রসারণ আধুনিক ইতিহাসে বিরল। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক জাহাজ নির্মাতা হওয়ায় সামরিক জাহাজ তৈরিতেও বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে চীন।

দেশটির যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি এখন এশিয়ার বিস্তৃত সমুদ্রাঞ্চলে দৃশ্যমান। দক্ষিণ চীন সাগর, তাইওয়ান প্রণালি, ফিলিপাইনের পূর্বাঞ্চল এবং জাপানের দক্ষিণ উপকূলের কাছাকাছি জলসীমায় নিয়মিত টহল দিচ্ছে চীনা নৌবাহিনী। একই সঙ্গে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে সামরিক অভিযান পরিচালনা এবং এডেন উপসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তায়ও অংশ নিচ্ছে তারা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাংহাইয়ের আশপাশের দ্বীপগুলোতে অবস্থিত চীনের জাহাজ নির্মাণ কারখানাগুলোতে বিশ্বের অর্ধেকের বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ তৈরি হয়। এই শিল্প অবকাঠামো কাজে লাগিয়ে ডেস্ট্রয়ার, ফ্রিগেট ও বড় আকারের উভচর যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের সক্ষমতাও বাড়িয়েছে দেশটি।

একটানা ৩৭৮ দিন সমুদ্রে চীনা যুদ্ধজাহাজ

চীনের নৌবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির চিত্র শুধু যুদ্ধজাহাজের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘ সময় সমুদ্রে অবস্থান করে অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে দেশটির।

চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস জানিয়েছে, ৩৭৮ দিন সমুদ্রে অভিযান চালানোর পর দেশটির ৪৮তম এসকর্ট টাস্কফোর্স কিংদাও বন্দরে ফিরে এসেছে। এই সময়ে বহরটি ১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি নটিক্যাল মাইল অতিক্রম করে। এডেন উপসাগর ও আশপাশের জলসীমায় ৪২৩টি বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপত্তা দেয় তারা। বহরটিতে ছিল একটি ডেস্ট্রয়ার, একটি ফ্রিগেট ও একটি সরবরাহকারী জাহাজ।

চীনা সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তি, প্রশিক্ষিত নাবিক এবং উন্নত রসদ সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে দেশটির নৌবাহিনীর টাস্কফোর্সগুলো এখন টানা ৩০০ দিনেরও বেশি সময় সমুদ্রে থাকতে পারছে।

এ ক্ষেত্রে আফ্রিকার দেশ জিবুতিতে চীনের সামরিক সহায়তা ঘাঁটি এবং কম্বোডিয়ায় নতুন যৌথ স্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এসব স্থাপনার মাধ্যমে নিজ ভূখণ্ড থেকে অনেক দূরে অবস্থান করেও যুদ্ধজাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহের ব্যবস্থা করতে পারছে বেইজিং।

ভারত মহাসাগরেও বাড়ছে চীনের সামরিক তৎপরতা

এশিয়ার উপকূলীয় জলসীমার বাইরে দূরবর্তী সমুদ্রাঞ্চলেও অভিযান বাড়াচ্ছে চীন। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বড় আকারের চীনা যুদ্ধজাহাজ এখন নিজ দেশের উপকূল থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে বিমানবাহী রণতরিগুলোকে নিয়ে যৌথ সামরিক মহড়া চালাচ্ছে দেশটি। পাশাপাশি বিদেশি সামরিক বিমানের কাছাকাছি অবস্থান থেকে যুদ্ধবিমান পরিচালনার ঘটনাও ঘটছে। একই সঙ্গে সাবমেরিন নির্মাণের সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ চলছে।

মার্কিন মূল্যায়নের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী ১৫ বছরের মধ্যে চীনা সাবমেরিনগুলো নিয়মিতভাবে ভারত মহাসাগর এবং সম্ভবত আটলান্টিক মহাসাগরেও অভিযান পরিচালনা করতে পারে। বাস্তবে এমনটি ঘটলে এশিয়ার বাইরেও চীনের সামরিক উপস্থিতি আরও বিস্তৃত হবে।

প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের আমলে চীনের নৌবাহিনীর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। জাতীয় শক্তি প্রতিষ্ঠায় সামুদ্রিক সক্ষমতাকে অপরিহার্য বলে মনে করেন তিনি। বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণে সমুদ্রের নিয়ন্ত্রণ যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, সে বিষয়টিও বারবার তুলে ধরেছেন চীনা প্রেসিডেন্ট।

তাইওয়ান ও দক্ষিণ চীন সাগর ঘিরে বাড়ছে উত্তেজনা

চীনের নৌবাহিনীর বিস্তার যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিশেষ উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে। বিশেষ করে তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে বিরোধ এবং দক্ষিণ চীন সাগরের জলসীমা নিয়ে আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়ছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে জাপান ও ফিলিপাইনের সঙ্গে চীনের সম্পর্কের টানাপোড়েন বেড়েছে। তাইওয়ানকে সমর্থন দেওয়ায় জাপানের প্রতি অসন্তোষ জানিয়েছে বেইজিং। অন্যদিকে দক্ষিণ চীন সাগরের বিভিন্ন জলসীমার মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফিলিপাইনের সঙ্গে বিরোধ অব্যাহত রয়েছে।

তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবি করে চীন। দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাও নাকচ করেনি বেইজিং। যদিও চীনের আনুষ্ঠানিক অবস্থান হলো, শান্তিপূর্ণ পুনর্মিলনই তাদের অগ্রাধিকার।

রয়টার্সের তথ্যমতে, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করা মার্কিন সামরিক কমান্ডাররা এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন, যেখানে চীন আগামী বছরের মধ্যেই তাইওয়ানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

জাহাজ নির্মাণে চীনের সঙ্গে পিছিয়ে যুক্তরাষ্ট্র

চীনের নৌবহর সম্প্রসারণের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজ নির্মাণশিল্পের সীমাবদ্ধতাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দুই দশকে যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজ নির্মাণ খাতে বাজেট দ্বিগুণ হলেও ২০০৩ সালের তুলনায় দেশটির নৌবহরের আকার বাড়েনি।

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক জাহাজ নির্মাণশিল্পও চীনের তুলনায় অনেক ছোট। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে দেশটির পতাকাবাহী জাহাজের অংশগ্রহণও সীমিত।

এ ছাড়া নতুন ফ্রিগেট নির্মাণ, পুরোনো ক্রুজারের সক্ষমতা বাড়ানো এবং লিটোরাল কমব্যাট শিপ পরিচালনার জন্য নেওয়া মার্কিন প্রকল্পগুলো নানা সমস্যায় পড়েছে। ফলে পরিকল্পনা অনুযায়ী এসব কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে চীনের দ্রুত নৌবহর সম্প্রসারণ, দূরবর্তী সমুদ্রে দীর্ঘ সময় অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা এবং জাহাজ নির্মাণশিল্পের অগ্রগতি যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক কৌশলের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। বিশেষ করে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে দুই শক্তিধর দেশের সামরিক প্রতিযোগিতা আগামী দিনগুলোতে বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।


Loading...
Loading...

আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: