ডিসেম্বর মাসকে ঘিরেই নয়, শেখ হাসিনা জীবিত থাকা পর্যন্ত দেশে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা চলতে পারে বলে মনে করছে সরকার। এ ধরনের অপচেষ্টা প্রতিহত করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় তথ্য অধিদপ্তরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ উপস্থিত ছিলেন।
পোশাকশ্রমিকদের মজুরি প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, সাধারণত পাঁচ বছর পরপর শ্রমিকদের মজুরি পর্যালোচনা করা হয়। ২০০৬, ২০১০, ২০১৩, ২০১৮ ও ২০২৩ সালে মজুরি পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছিল। সে হিসাবে ২০২৩ সালের পর ২০২৬ সালে নতুন করে মজুরি বোর্ড গঠনের বাধ্যবাধকতা ছিল না। তবে জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সরকার আগেভাগেই মজুরি বোর্ড গঠন করেছে।
তিনি বলেন, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে এবং পোশাকশ্রমিকদের জীবন কঠিন হয়ে উঠেছে—সরকার তা স্বীকার করে। মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের দামও বেড়েছে। শ্রমিকদের পরিস্থিতি বিবেচনায় সহানুভূতিশীল অবস্থান থেকেই আগাম মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। ফলে আন্দোলনের মূল দাবিটি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির আন্দোলনে সহিংসতা ও নাশকতার অভিযোগ তুলে জাহেদ উর রহমান বলেন, কিছু মানুষের আচরণ প্রকৃত পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এসব ঘটনার সঙ্গে সীমান্তের ওপারের সংশ্লিষ্টতার কথা বলেছেন। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার সক্ষমতা না থাকলেও দলটির হাতে থাকা বিপুল অর্থ ব্যবহার করে বিভিন্ন স্থানে নাশকতা সৃষ্টির চেষ্টা হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পথ তৈরি করতে অস্থিরতা সৃষ্টি করা হচ্ছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা বলেন, বিষয়টি শুধু ডিসেম্বরকেন্দ্রিক নয়। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা জীবিত থাকা পর্যন্ত এ ধরনের চেষ্টা চলতে পারে বলে সরকার মনে করছে।
তিনি বলেন, ‘এটা ডিসেম্বর না। এটা পুরো সময়, যতদিন উনি বেঁচে আছেন, উনার এই চেষ্টা চলবে বলে আমরা মনে করি এবং আমরা এটাকে প্রতিহত করব।’
এ প্রসঙ্গে ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম দিনে শেখ হাসিনার দেওয়া একটি বক্তব্যের কথা উল্লেখ করেন জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, ওই নির্বাচনে পরাজয়ের পর শেখ হাসিনা বলেছিলেন, এই সরকারকে এক দিনও শান্তিতে থাকতে দেবেন না। সেই মানসিকতার প্রতিফলন এখনো থাকতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে নিজের আগের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে উপদেষ্টা বলেন, ডিসেম্বর শেষ হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে আবার কথা বলবেন। শেখ হাসিনা দেশে ফিরে এলে এবং তাঁর আগের ব্যাখ্যা ভুল প্রমাণিত হলে তিনি প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করবেন।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে এবং তিনি দায়িত্বে থাকলে নির্দিষ্ট এক মঙ্গলবার প্রকাশ্যে এসে নিজের ব্যাখ্যার ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাইবেন।
পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনে বহিরাগত, কিশোর ও তরুণদের অংশগ্রহণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানোর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে উপদেষ্টা বলেন, অস্থিরতা মোকাবিলায় সরকার আগের মতো দমন-পীড়নের পথ অনুসরণ করতে চায় না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আইন মেনে এবং পরিস্থিতি বিবেচনায় আনুপাতিক হারে বল প্রয়োগ করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের পুলিশ কখনোই হাসিনার পুলিশের মতো আর হবে না।’ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বল প্রয়োগের আইনি অধিকার থাকলেও তা অবশ্যই আইন ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া মেনে হতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোথাও কোথাও অসামঞ্জস্যপূর্ণ বল প্রয়োগের দৃশ্য দেখা গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণের সময় সাধারণ মানুষের ভয়ভীতি ও ক্ষয়ক্ষতি যতটা সম্ভব কমিয়ে রাখতে চায় সরকার।
আন্দোলনে কারা যুক্ত হচ্ছেন এবং কীভাবে পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে, সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে বলেও জানান উপদেষ্টা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ বিষয়ে বক্তব্য দিয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার এমনভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে চায়, যাতে সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব কম পড়ে।
পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন দ্রুত শেষ হবে বলে আশা প্রকাশ করে জাহেদ উর রহমান বলেন, শুরুতে শ্রমিকদের কিছু ন্যায্য দাবি ছিল। সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করায় শ্রমিকদের বিষয়টি বোঝানো সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। শ্রমিকেরা আন্দোলন থেকে সরে এলে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে অন্য পক্ষের অস্থিরতা তৈরির সুযোগও কমে আসবে।
তিনি বলেন, পোশাকশ্রমিকেরা মাঠে থাকায় তাঁদের আন্দোলনের ভেতরে অন্য কেউ অস্থিরতা সৃষ্টির সুযোগ নিচ্ছে। শ্রমিকেরা মাঠে না থাকলে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করা কঠিন হতো।