বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি হত্যা মামলার তদন্তে নতুন মোড় এসেছে। এবার ‘দিশা’ নামে এক তরুণীকে গ্রেপ্তার করেছে নৌপুলিশ। তিনি তাহসিফের কথিত বান্ধবী বলে জানা গেছে। অন্যদিকে, হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রাথমিক তথ্যপ্রমাণ পাওয়ার পর চার দিনের রিমান্ডে নেওয়া তাহসিফের বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ করছেন তদন্তকারীরা। দিশাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চাওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
রবিবার (১ নভেম্বর) বেলা ২টার দিকে দিশার গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন নৌপুলিশের ঢাকা অঞ্চলের পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল মামুন। এর আগে শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাতে অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
টঙ্গী নৌপুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ আহমেদ জানান, শনিবার রাতেই দিশাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই দিন দিবাগত মধ্যরাত থেকে চার দিনের রিমান্ডে থাকা দীপকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এর আগে শনিবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. হাসিব উল্লাহ পিয়াসের আদালত দীপের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর মুহাম্মদ শামসুদ দোহা সুমন জানান, সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে পুলিশ সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেছিল। শুনানি শেষে আদালত চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
নৌপুলিশের ঢাকা অঞ্চলের পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর বন্ধু দীপের সম্পৃক্ততার প্রাথমিক তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে। তাঁকে রিমান্ডে নিয়ে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এখনই সব তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঘটনার দিন মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে রাত দেড়টা পর্যন্ত তাহসিফের সঙ্গে ছিলেন দীপ। ফুটেজ ও গোপন তথ্যের ভিত্তিতে তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন, দীপ তাহসিফকে নিয়ে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখান থেকে তাহসিফ আর ফেরেননি; দীপ একাই ফিরে আসেন।
পুলিশের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দীপের দেওয়া বক্তব্যেও একাধিক অসংগতি পাওয়া গেছে। এসব কারণে তাঁর প্রতি সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়। এখন রিমান্ডে তাঁকে এসব বিষয়ে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
এর আগে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বাসা থেকে দীপকে আটক করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পরে শুক্রবার রাতে তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। এরপর দীপকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
তাহসিফের পরিবার অভিযোগ করার পর তাঁর সার্বক্ষণিক সঙ্গী হিসেবে পরিচিত দীপকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে পিবিআই। এ সময় তাহসিফের সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত এবং সেসব স্থানে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে তথ্য দেন দীপ। তবে তাঁর বক্তব্যে অসংগতি থাকায় তদন্তে নতুন করে সন্দেহ তৈরি হয়।
২৮ বছর বয়সী কে এম তাহসিফ সাউরি গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় উত্তরার বাসা থেকে নিখোঁজ হন। পরদিন বুধবার বিকেলে টঙ্গীর রাজাবাড়ি ঘাটের কাছে তুরাগ নদ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে নৌপুলিশ।
তাহসিফের বাবা এনায়েতুল করিম জানান, দীপ প্রায়ই তাঁদের বাসায় আসতেন। কিন্তু ঘটনার পর দীপের দেওয়া তথ্যে বড় ধরনের বৈপরীত্য ধরা পড়ে। তাঁর ভাষ্য, পিবিআইয়ের কাছে দীপ স্বীকার করেছেন, তাঁরা টঙ্গীতে গিয়েছিলেন। অথচ তাঁকে দীপ বলেছিলেন, তাহসিফকে তাঁদের বাসার চত্বরে নামিয়ে দিয়ে গেছেন।
এনায়েতুল করিম বলেন, আমি জানি না আসলে কী ঘটেছে বা এর পেছনে কারা জড়িত। তিনি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ছেলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের শনাক্ত করার দাবি জানিয়েছেন।