রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে সচিবালয় স্থানান্তরের উদ্যোগ বাতিল এবং মাঠটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে টানা তৃতীয় দিনের মতো আন্দোলন করছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) শিক্ষার্থীরা। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দুপুরে আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের সামনের বেগম রোকেয়া সরণি অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন কয়েক শ শিক্ষার্থী। এতে ওই এলাকার যান চলাচল সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়।
সকাল ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে জড়ো হতে শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। পরে মিছিল নিয়ে সড়কে অবস্থান নেন তাঁরা। এ সময় সচিবালয় স্থানান্তরের পরিকল্পনা বাতিল, গবেষণার মাঠ ফিরিয়ে দেওয়া এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের জমির অধিকার নিশ্চিত করার দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন আন্দোলনকারীরা।
শিক্ষার্থীদের দাবি, পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠটি তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও ব্যবহারিক শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে সচিবালয় স্থাপন করা হলে কৃষি গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় জায়গার সংকট আরও বাড়বে। পাশাপাশি ওই এলাকায় পরিবেশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তাঁদের।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই মাঠটির সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক রয়েছে। ১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠার সময় মাঠটি এর অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে দাবি করেন তাঁরা। পরবর্তী সময়ে আশির দশকে সরকার মাঠটি নিয়ে নেয় বলেও তাঁদের অভিযোগ।
দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আরাফাত হোসেন বলেন, পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠটি তাঁদের গবেষণা ও বিভিন্ন কার্যক্রমে ব্যবহৃত হয়েছে। এখন সেই মাঠ ফিরিয়ে পাওয়াই তাঁদের মূল দাবি।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শিক্ষা ও উচ্চতর গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত জমি প্রয়োজন। এ অবস্থায় বিদ্যমান গবেষণার মাঠে সচিবালয় স্থাপনের উদ্যোগ তাঁদের শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ সীমিত করতে পারে।
সচিবালয় স্থানান্তরের পরিকল্পনার প্রতিবাদে মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) থেকে আন্দোলন শুরু করেন শেকৃবির শিক্ষার্থীরা। ওই দিন পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে মাটি পরীক্ষার কাজ বন্ধ করে দেওয়ার পাশাপাশি পরীক্ষার সরঞ্জাম ও নমুনা সংগ্রহে ব্যবহৃত দুটি গাড়ি ক্যাম্পাসে নিয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া যায়। গণপূর্ত অধিদপ্তরের লাগানো একটি সাইনবোর্ডও সরিয়ে নেওয়া হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) আন্দোলনের দ্বিতীয় দিনে মাঠে মেলার জন্য নির্মাণাধীন প্রবেশগেট ও কয়েকটি স্থাপনা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় মেলাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগ করেন। পরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসে ফিরিয়ে নেয়।
বৃহস্পতিবার ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের জমায়েতের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের সয়েল সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম তাঁদের আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন। তিনি নিয়মতান্ত্রিকভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ওই এলাকায় সচিবালয় স্থাপনের সম্ভাব্য পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে সংশ্লিষ্টদের বোঝানোর চেষ্টা করা হবে।
এর আগে মাঠটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে হস্তান্তর এবং সেখানে সচিবালয় স্থাপনের উদ্যোগের প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা মানববন্ধনও করেন।
মাঠটির ভবিষ্যৎ ব্যবহার নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের একটি কমিটি রয়েছে। এর আগে ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক তাজুল ইসলাম জানিয়েছিলেন, মাঠ নিয়ে শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে প্রশাসনিক উদ্যোগ নেওয়া হবে। ভাঙচুরের মতো ঘটনা যেন আর না ঘটে, সে জন্যও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানান তিনি।
অন্যদিকে, মেলাসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গণপূর্ত অধিদপ্তরের অনুমতি নিয়েই সেখানে মেলার কার্যক্রম চলছে বলে তাঁদের বক্তব্য।
মাঠটির মালিকানা, ব্যবহার ও সেখানে সচিবালয় স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের অবস্থান সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা ও চূড়ান্ত সমাধান এখনো স্পষ্ট নয়।
শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, তাঁদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে তাঁরা অনড়। ফলে মাঠটির ভবিষ্যৎ ব্যবহার নিয়ে বিরোধের সমাধান এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আলোচনার অগ্রগতি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।