চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) টানা ৩৬ দিন বন্ধ থাকার পর আবারও ক্লাস শুরু হয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২টি বিভাগের মধ্যে বুধবার (২৮ অক্টোবর) ক্লাস হয়েছে মাত্র একটি বিভাগে। সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন চলমান থাকায় অধিকাংশ বিভাগেই এখনো স্বাভাবিক হয়নি একাডেমিক কার্যক্রম।
বুধবার সকাল ৯টা থেকে নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগে ক্লাস শুরু হয়। তবে প্রথম দিনের ক্লাসে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল তুলনামূলক কম। রুটিন অনুযায়ী ল্যাব ক্লাস থাকার কথা থাকলেও তা অনুষ্ঠিত হয়নি বলে জানিয়েছেন বিভাগের চতুর্থ বর্ষের এক শিক্ষার্থী।
শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, অধিকাংশ বিভাগে বৃহস্পতিবার থেকে এবং বাকি বিভাগগুলোতে রোববার থেকে ক্লাস শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে একাডেমিক কার্যক্রমে ফিরলেও সাবেক উপাচার্যকে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। নতুন নিয়োগ পাওয়া উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম ক্যাম্পাসে এসে দায়িত্ব পালনের উদ্যোগ নিলে আবারও শাটডাউন কর্মসূচি এবং ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অচলাবস্থা নিরসনে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) গঠিত ছয় সদস্যের প্রতিনিধি দল বুধবার শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছে।
সকাল ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত শিক্ষকদের সঙ্গে বৈঠক করে প্রতিনিধি দলটি। এরপর বেলা সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা হয়। পরে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গেও মতবিনিময়ের কর্মসূচি নির্ধারিত ছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান সংকট সমাধানে এই উদ্যোগের মধ্যেই শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সংগঠনগুলো একাডেমিক কার্যক্রম চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে নতুন উপাচার্যের প্রতি পূর্ণাঙ্গ অসহযোগিতা বজায় রাখার অবস্থান থেকে সরে আসেনি তারা।
শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষক সমিতি একাডেমিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। পরে শিক্ষক সমিতি, কর্মকর্তা সমিতি ও স্টাফ অ্যাসোসিয়েশন যৌথ বিবৃতিতে ক্লাসে ফেরার কথা জানায়।
তবে নতুন উপাচার্যের ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক যেকোনো কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে পূর্বঘোষিত কর্মবিরতি ও সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচি কঠোরভাবে পালনের ঘোষণা দিয়েছে শিক্ষক সমিতি।
আন্দোলনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের পূর্বনির্ধারিত ২৪টি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। এর আগে ২২ সেপ্টেম্বর থেকে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে শাটডাউন কর্মসূচি শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। একই দাবিতে ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে সর্বাত্মক কর্মবিরতি ঘোষণা করেন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রতিনিধিরা।
নিয়োগের ৫৬ দিনের মাথায় গত ২১ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে উপাচার্যের পদ থেকে সরিয়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ২২ সেপ্টেম্বর থেকে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা।
আন্দোলন চলাকালে ২৪ সেপ্টেম্বর অনলাইনে উপাচার্য হিসেবে যোগদান করেন অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম। পরে ১২ অক্টোবর প্রথমবারের মতো নিজ কার্যালয়ে গেলে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা উপাচার্য ভবনে তালা দেন। এতে তিনি অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। পরদিন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ও জেলা পুলিশ সুপারের সহায়তায় অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে ক্যাম্পাস ছাড়েন তিনি।
এরপর ১৬ অক্টোবর চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে অবস্থানকালে অনলাইনে সিন্ডিকেট সভা করেন উপাচার্য। সভায় ১৫ জন সিন্ডিকেট সদস্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ছয়জন। অচলাবস্থা নিরসন ও দ্রুত শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্যে একটি নিরপেক্ষ ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠনের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
চুয়েটের সংকট নিরসনে গত ১৮ অক্টোবর ছয় সদস্যের একটি পরামর্শক কমিটি গঠন করে ইউজিসি। তবে ওই কমিটিতে চুয়েটের কোনো শিক্ষক বা প্রতিনিধি রাখা হয়নি।
এদিকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্গাপূজার ছুটি ছিল। ছুটি শেষে কর্মদিবস শুরু হলেও আন্দোলনের কারণে মঙ্গলবার পর্যন্ত অচল ছিল বিশ্ববিদ্যালয়টি। বুধবার একটি বিভাগে ক্লাস শুরু হলেও সার্বিকভাবে শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগতে পারে বলে পরিস্থিতি থেকে ধারণা করা হচ্ছে।
সাবেক উপাচার্যকে পুনর্বহালের দাবি, নতুন উপাচার্যের প্রতি অসহযোগিতা এবং ক্লাস-পরীক্ষা চালুর উদ্যোগ—এই তিন অবস্থানের মধ্যে চুয়েটের সংকট নিরসনে এখন ইউজিসির প্রতিনিধি দলের মতবিনিময় ও পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে নজর রয়েছে।