সাইবার হামলার ঝুঁঁকিতে দেশের ৩৬ ভাগ ব্যাংক

এসএম শামসুজ্জোহা

তথ্যপ্রযুক্তি

প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে সাইবার নিরাপত্তার সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তুতে রয়েছে বাংলাদেশও।

2026-10-28T11:26:06+00:00
2026-10-28T11:26:06+00:00
  বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬,
১২ কার্তিক ১৪৩৩
 
বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
তথ্যপ্রযুক্তি
সাইবার হামলার ঝুঁঁকিতে দেশের ৩৬ ভাগ ব্যাংক
১৪ নির্দেশনা জারি
এসএম শামসুজ্জোহা
বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:২৬ এএম 
সংগৃহীত ছবি
প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে সাইবার নিরাপত্তার সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তুতে রয়েছে বাংলাদেশও। দেশে সাইবার হামলার যেসব ঘটনা ঘটেছে, তার বড় কারণ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বল পরিকাঠামো। নিরাপত্তাত্রুটি দূর করা না গেলে হামলার আশঙ্কা থেকেই যাবে। সাইবার অপরাধীরা বৈশ্বিক তথ্যপ্রযুক্তি নেটওয়ার্ক ও পরিকাঠামোগুলোর কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটাতে ধ্বংসাত্মক ম্যালওয়্যার ব্যবহার করছে। বাংলাদেশও এসব সাইবার যুদ্ধের প্রভাবের সম্মুখীন হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সাইবার হামলা ঠেকাতে প্রতিনিয়ত সফটওয়্যার হালনাগাদ করতে হবে। গ্রহণ করতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
 

ধ্বংসাত্মক ম্যালওয়্যার ব্যবহার করছে সাইবার অপরাধীরা

জানা যায়, বিশ্বজুড়ে বহুল ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপিতে গুরুতর নিরাপত্তাত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর সাইবার হামলার আশঙ্কায় বাংলাদেশের কয়েকটি ব্যাংকের ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। এতে ব্যাংকিং, সরকারি সেবা, ই-কমার্স ও সংবাদমাধ্যমসহ বিভিন্ন খাতের অনলাইন প্ল্যাটফর্মের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যাংকের ওয়েবসাইট হ্যাক হয়নি এবং ডিজিটাল লেনদেনে এ মুহূর্তে কোনো ঝুঁঁকি নেই বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে সাইবার নিরাপত্তাঝুঁঁকির আশঙ্কায় সম্প্রতি একাধিক ব্যাংকের ওয়েবসাইট বন্ধ রাখার ঘটনায় দেশের আর্থিক খাতের অনলাইন অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে প্রযুক্তিগত দুর্বলতা শনাক্ত হওয়ার পর ব্যাংকগুলো কী ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে এবং ওয়েবসাইট পুনরায় চালুর আগে কীভাবে ঝুঁঁকি যাচাই করা হয়েছে তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের অর্ধেক ব্যাংক এখনও সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকায় একে বড় ধরণের বিপর্যয় হিসেবে দেখছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা।

ব্যাংকাররা বলছেন, বাংলাদেশের প্রত্যেকটা ব্যাংক এখন ডিজিটালাইড হয়ে গিয়েছে। এখন প্রতিটি ব্যাংক ইলেকট্রনিক্যালি কানেক্টেড এবং আর্থিক লেনদেনের অধিকাংশ কার্যক্রম অনলাইনে পরিচালিত হয়। অর্থাৎ টাকাটা ভার্চুয়াল হয়ে গেছে, যার সবই থাকে ব্যাংকে। সাম্প্রতি ইন্টারনেটের প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপিতে গুরুতর ত্রুটি শনাক্ত হবার পর বাংলাদেশ ব্যাংক ছাড়াও অগ্রণী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ইসলামী ব্যাংক ও এসবিএসি ব্যাংকের ওয়েবসাইট বন্ধ রাখা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত রোববারের মধ্যে এসব ওয়েবসাইট আবার চালু হয়। ওয়েবসাইট বন্ধ থাকলেও গত চার দিনে ব্যাংকগুলোর ইন্টারনেট ব্যাংকিং ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেন স্বাভাবিক ছিল বলে জানা গেছে। ফলে গ্রাহকদের লেনদেনে কোনো সমস্যা হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। তাই দেশের আর্থিকখাতগুলো যদি নিরাপদ না হয় তাহলে ব্যাংকের ওপরে নির্ভর করে আর্থিক লেনদেনের যতো চ্যানেল আছে, যেমন: মোবাইল ব্যাংকিং, এটিএম কার্ড পেমেন্ট সবই ঝুঁঁকির মুখে পড়তে পারে। এতে আর্থিকখাতসহ তাদের সব গ্রাহক উভয়ই সর্বস্ব খুইয়ে যাবে এবং যার প্রভাব সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়বে। এ প্রসঙ্গে জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সির মহাপরিচালক ড. তৈয়বুর রহমান জানান, ওয়েবসাইট তৈরি ও পরিচালনায় বহুল ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ পিএইচপি’র নিরাপত্তা ত্রুটি ইস্যুতে আগাম সতর্কতা নেওয়ায় বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে। শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই ব্যাংকসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট পর্যায়ক্রমে সচল করা হচ্ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, দেশের আর্থিকসহ প্রতিটি খাতে বাড়ছে সাইবার হামলা ও হ্যাকিংয়ের ঝুঁঁকি। ব্যাংকগুলো ডিজিটাল নিরাপত্তা ত্রুটি ইস্যুতে এ পর্যন্ত বিনিয়োগ করেছে ৫৩ হাজার ৪১৩ কোটি টাকা। এ হিসাবে প্রতি বছর তারা বিনিয়োগ করছে গড়ে ২ হাজার কোটি টাকা। তার পরও সাইবার হামলার ঝুঁঁকিতে রয়েছে ৩৬ শতাংশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলায় জড়িতদের ৪০ শতাংশ ব্যাংকার, তথ্য ও প্রযুক্তি অভিজ্ঞ ৪০ শতাংশ, হ্যাকার ১৫ শতাংশ এবং অন্যান্য ৫ শতাংশ।

তথ্যানুসারে, দেশের ব্যাংকগুলোয় দিনে ১৪৫ থেকে ৬৩০ বার সাইবার হামলা হয়। সবচেয়ে বেশি হামলা হয়েছে চীন থেকে, ২৪ শতাংশ। এরপর উত্তর কোরিয়া থেকে ১৩ শতাংশ, রাশিয়া থেকে ১২ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৭ শতাংশ, পাকিস্তান থেকে ৭ শতাংশ এবং ভারত থেকে ৩ শতাংশ। বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে ১২ শতাংশ সাইবার হামলা হয়। এছাড়া দেশের ভিতর থেকেই ব্যাংকগুলোতে ২ শতাংশ সাইবার হামলা হয়ে থাকে। বর্তমানে দেশের ব্যাংক খাতে হ্যাকিং বা সাইবার হামলার মধ্যে রয়েছে ৬৮ শতাংশ ম্যালওয়্যার, ডেনিয়াল অব সার্ভিস ৪৮ শতাংশ, ফিসিং ৪৮ শতাংশ, স্প্যাম ৪৬ শতাংশ, এসকিউএল ইনজেকশন ২৮ শতাংশ, র‌্যানসমওয়্যার ২৬ শতাংশ, নেটওয়ার্ক হ্যাকিং ২৪ শতাংশ, থিফট অব হার্ডওয়্যার ১২ শতাংশ, ব্র্যার্ন্ড ৯ শতাংশ, করপোরেট ইসপিওনেজ ৮ শতাংশ। এ বিষয়ে বিআইবিএম-এর অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান আলম বলেন, সাইবার হামলা ঠেকাতে প্রতিনিয়ত সফটওয়্যার হালনাগাদ করতে হবে। গ্রহণ করতে হবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। আক্রমণের ধরনে পরিবর্তন আসে, তার পর আমাদের ডিভাইসগুলো পরিবর্তন হয়। এখন যেসব ব্যাংকের মুনাফা ভালো হয়, তারা এ হামলা মোকাবিলায় অনেক বিনিয়োগ করে।

সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে দেশের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো (সিআইআই), ব্যাংক, আর্থিক খাত, স্বাস্থ্যসেবা, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সম্ভাব্য সাইবার হামলার ঝুঁকিতে থাকার কথা জানিয়ে সতর্কতা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকের ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশনস টেকনোলজি (আইসিটি) বিভাগ সাইবার হামলার সতর্কতা জারির পাশাপাশি প্রকিরোধমূলক নানা ধরণের নির্দেশনা দিয়েছে। এতে বলা হয়, দেশের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো (সিআইআই), ব্যাংক, আর্থিক খাত, স্বাস্থ্যসেবা, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সম্ভাব্য সাইবার হামলার ঝুঁঁকিতে রয়েছে। বিভিন্ন উৎস থেকে এ ধরনের আশঙ্কার তথ্য পাওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তরফে তাৎক্ষণিক সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। সাইবার হামলা বা হ্যাকিং মোকাবিলায় দেশের সব তফসিলি ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডারদের ১৪টি নির্দেশনা দেওয়া হয়। যা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘সাইবার হামলা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে ব্যাংকগুলোকে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’ তিনি আরও জানান, ব্যাংকখাতে বড় ধরনের সাইবার হামলা হয় ইনসাইড থেকে, সেটা ব্যাংকের তথ্য ও প্রযুক্তি বিভাগের লোকও হতে পারে আবার অন্য কেউ হতে পারেন। সামনে এই জায়গাটায় ভালো চর্চা নিয়ে আসা জরুরি।



Loading...
Loading...

তথ্যপ্রযুক্তি- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: