দেশের ব্যাংকিং খাতের ওয়েবসাইটগুলোকে ঘিরে সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ওয়েবসাইট পরিচালনায় বহুল ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপি এর দুটি গুরুতর নিরাপত্তাত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে তিন দিন বন্ধ রাখা হয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট। গতকাল রোববার সকালে সেটি পুনরায় চালু হলেও একই সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের ওয়েবসাইটে সাইবার হামলার সম্ভাব্য আলামত পাওয়ার খবর নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একই দিনে রক্ষণাবেক্ষণের নোটিশ দেখা গেছে বেসরকারি বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংকের ওয়েবসাইটেও। এর আগে অগ্রণী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ইসলামী ব্যাংক ও এসবিএসি ব্যাংকের ওয়েবসাইটও বন্ধ রাখা হয়েছিল। তবে সেগুলো বর্তমানে চালু রয়েছে। এছাড়া ক্ষতিকর স্পাম সরিয়ে ফেলে মেরামত শেষে গতকাল দুপুর পৌনে ৩টায় জনতা ব্যাংকের ওয়েবসাইট হ্যাকারের কবলে পড়ার পর আবার তা চালু হয়।
একাধিক ব্যাংকের ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা এবং নিরাপত্তাঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে, দেশের ব্যাংকিং খাতসহ গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামো সাইবার হামলা মোকাবিলায় কতটা প্রস্তুত। বিশেষ করে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট ও অনলাইন সেবায় কোনো ধরনের দুর্বলতা থাকলে তা গ্রাহকসেবা, তথ্যের গোপনীয়তা এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থার ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট গত ২২ অক্টোবর বৈশ্বিক সাইবার নিরাপত্তা সতর্কতার পর বন্ধ করে দেওয়া হয়। টানা তিন দিন বন্ধ থাকার পর গতকাল রোববার সকাল আটটায় এটি আবার চালু হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান।
গণমাধ্যমকে তিনি জানান, ওয়েবসাইটের সম্ভাব্য নিরাপত্তাত্রুটি পরীক্ষা করা হয়েছিল। বিশ্বব্যাপী সাইবার হামলার আশঙ্কায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ওয়েবসাইটটি বন্ধ রাখা হয়। ঝুঁকি কমে আসায় এটি পুনরায় চালু করা হয়েছে। তবে ওয়েবসাইট বন্ধ রাখা ও পুনরায় চালুর মধ্য দিয়ে নিরাপত্তাঝুঁকির বিষয়টি পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হতে প্রয়োজনীয় কারিগরি মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের পরিস্থিতিতে নিরাপত্তাত্রুটি শনাক্ত, সংশোধন এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের ঝুঁকি প্রতিরোধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশও জরুরি। সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে গতকাল দুপুরে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক ও বেসরকারি বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংকের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে গিয়ে রক্ষণাবেক্ষণের নোটিশ দেখা যায়। তবে ব্যাংক দুটি তাদের ওয়েবসাইট বন্ধ থাকার কারণ হিসেবে সাইবার হামলার কথা উল্লেখ করেনি। ফলে ওয়েবসাইটে রক্ষণাবেক্ষণের নোটিশ দেখা যাওয়াকে সরাসরি সাইবার হামলার প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
অন্যদিকে, বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংকের ওয়েবসাইটে ‘ইমপর্ট্যান্ট নোটিশ: সার্ভিস মেইনটেন্যান্স’ শিরোনামে একটি বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, রক্ষণাবেক্ষণের কারণে ওয়েবসাইটের সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব সেবা পুনরায় চালু করতে কাজ চলছে। এ জন্য গ্রাহকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে অপেক্ষা ও সহযোগিতা কামনা করেছে ব্যাংকটি।
এদিকে ডিজিটাল সেবার ওপর নির্ভরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা বাংলাদেশের জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষার অন্যতম শর্ত হয়ে উঠেছে। ব্যাংকিং লেনদেন, সরকারি সেবা, ই-কমার্স, সংবাদমাধ্যম এবং বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের কার্যক্রম এখন ওয়েবসাইট ও ডিজিটাল ব্যবস্থার ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। ফলে এসব ব্যবস্থায় নিরাপত্তাত্রুটি দেখা দিলে তার প্রভাব শুধু একটি ওয়েবসাইটে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে।
কোনো ওয়েবসাইটে অননুমোদিত প্রবেশ ঘটলে পরিস্থিতি অনুযায়ী সাইটের নিয়ন্ত্রণ হারানো, তথ্য পরিবর্তন, সেবা ব্যাহত হওয়া কিংবা গ্রাহকের তথ্য ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনা গ্রাহকসেবা ও প্রতিষ্ঠানের সুনামকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইট আক্রান্ত হলে প্রকাশনা ব্যাহত হওয়া, কনটেন্ট বিকৃত করা কিংবা অননুমোদিত তথ্য প্রকাশের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
সাইবার হামলার ঝুঁকি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সরকারি সাইবার নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। সম্ভাব্য নিরাপত্তাত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর দ্রুত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সতর্ক করা, দুর্বলতা সংশোধনে সহায়তা দেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ জোরদার করা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর ওয়েবসাইট ও অনলাইন সেবার নিয়মিত নিরাপত্তা নিরীক্ষা, সার্ভার ও অ্যাপ্লিকেশনের দুর্বলতা পরীক্ষা, তথ্যের ব্যাকআপ সংরক্ষণ, সন্দেহজনক কার্যক্রম শনাক্ত করার ব্যবস্থা এবং সাইবার ঘটনার পর দ্রুত সেবা পুনরুদ্ধারের সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষ জনবল গড়ে তোলার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়েও সাইবার নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।