অগণিত মানুষের চাপে রয়েছে রাজধানী ঢাকা। এতে বাসযোগ্যতা হারিয়ে গেছে অনেক আগেই। দিনে দিনে রাজধানীর আয়তন যেভাবে বাড়ছে তেমনি বাড়ছে জনসংখ্যাও। নানা সংকটে অস্থিরতা, অতৃপ্তি, অশান্তি ও অতুষ্টি নিয়ে জীবন-যাপন করছেন নগরবাসী। যানজট, পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ সংকট, মাদকের আগ্রাসন, চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মশার উপদ্রব প্রভৃতি সমস্যা তো আছেই। ফলে ঢাকাকে পরিচ্ছন্ন, পরিবেশবান্ধব ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে কঠোর হচ্ছে সরকার। একই সঙ্গে নগর ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয় ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা মহানগরীকে একটি পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে ২০টি পরিবীক্ষণ টিমকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। শিগগিরই তারা মাঠে নামছে। সরকারের পক্ষ থেকে তাদের সব ধরনের কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
নগর ব্যবস্থাপনায় সংস্থাগুলোর সমন্বয় ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হচ্ছে
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ, যানবাহনের ধোঁয়া, নির্মাণকাজের ধুলাবালি, খাল-জলাশয় দখল এবং অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে রাজধানীর পরিবেশ ও নাগরিক জীবন নানা সংকটে পড়েছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ও অনুশাসন বাস্তবায়নে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের আওতায় প্রতিটি আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের এলাকাভিত্তিক ২০টি জোনে ২০টি বিশেষ পরিবীক্ষণ কমিটি গঠন করা হয়েছে। ঢাকা উত্তরে ১০টি এবং ঢাকা দক্ষিণে ১০টি কমিটি কার্যক্রম পরিচালনা করবে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক পর্যায়ের কর্মকর্তারা এসব জোনাল কমিটির প্রধান হিসেবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
বাসযোগ্যতা হারানোর পাশাপাশি ভারসাম্যহীনতায় ঢাকা : সবার প্রিয় ঢাকা বাসযোগ্যতা হারানোর পাশাপাশি ভারসাম্যহীনতায় ভুগছে। বিশেষ করে ঢাকার ৮৫ শতাংশ এলাকা কংক্রিটে আচ্ছাদিত হলেও প্রয়োজনমত নেই সবুজায়ন, পার্ক, জলাধার ও খোলা জায়গা। এতে পরিবেশ দূষণ যেমন বেড়েছে, তেমনি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে শিশুর বিকাশ। এই পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনৈতিক পুনঃনির্ধারণ টাস্ক ফোর্স রাজধানীকে ইতোমধ্যে স্থানান্তরের প্রস্তাব দিয়েছেন। তাদের মতে, ঢাকায় জনসংখ্যা বেশি থাকায় দেশের উন্নতির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে ঢাকা স্থানান্তরের প্রস্তাব দিয়েছিল গত অর্šÍবর্তীকালীন সরকার। কিন্তু এ প্রস্তাব আর আলোর মুখ দেখেনি। তবে এ প্রস্তাব গ্রহণ করে তা বাস্তবায়ন দেখতে চায় অধিকাংশ নগরবাসী। কিন্তু ঢাকাকে হস্তান্তর বড় কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন নগর বিশেষজ্ঞরা।
মানুষের ভার নিতে পারছে না রাজধানী ঢাকা : অগণিত মানুষের চাপে বেসামাল হয়ে পড়ছে এই শহর। এতে বাসযোগ্যতা হারিয়ে গেছে অনেক আগেই। দিনে দিনে রাজধানীর আয়তন যেভাবে বাড়ছে তেমনি বাড়ছে জনসংখ্যাও। এরসাথে প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে প্রায় ৩-৪ লাখ লোক ঢাকায় আসছেন। এসব কারণে জনসংখ্যার দিক দিয়ে ঢাকা নবম থেকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ শহরে পরিণত হয়েছে। ২০৫০ সালের মধ্যে ঢাকা বৃহৎ শহরের তালিকার প্রথমস্থানে চলে আশার আশঙ্কা রয়েছে। জাতিসংঘের নতুন প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। ফলে ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে কঠোর হওয়ার বিকল্প দেখছে না সরকার।
যানজট নিরসনে নতুন উদ্যোগ : রাজধানীর অন্যতম বড় সমস্যা যানজট। প্রতিদিন কর্মঘণ্টার বড় অংশ সড়কে ব্যয় করতে হচ্ছে নগরবাসীকে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুরোনো বাস অপসারণ, বাস টার্মিনাল ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, বিভিন্ন সড়কের সংস্কার এবং অটোরিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণে নতুন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সড়ক নির্মাণ কিংবা যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করে দীর্ঘমেয়াদে যানজট নিরসন সম্ভব নয়। প্রয়োজন গণপরিবহনের কার্যকর ব্যবস্থাপনা, নির্ধারিত বাসস্টপ নিশ্চিত করা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়।
দূষণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব : ঢাকার বায়ুদূষণ ও অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। নির্মাণসামগ্রীর ধুলা, যানবাহনের কালো ধোঁয়া এবং খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানোর মতো কর্মকান্ড দূষণ বাড়াচ্ছে। এ অবস্থায় দূষণ নিয়ন্ত্রণে নজরদারি, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম এবং পরিবেশবিধি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সম্প্রতি রাজধানীর গুলশান, বনানী, বারিধারা, নিকেতন ও ধানমন্ডি এলাকার পাঁচটি হ্রদের দূষণ রোধে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পয়োবর্জ্য নিষ্কাশন বন্ধ, নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ এবং পয়োশোধনাগার স্থাপনের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
জলাবদ্ধতা ও নাগরিক সেবায় জবাবদিহি : বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা, খাল ভরাট, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং নিয়মিত পরিচ্ছন্নতার অভাব নগরবাসীর দুর্ভোগ বাড়ায়। পাশাপাশি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে কঠোর হচ্ছে সরকার। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এক পর্যালোচনা সভায় যানজট, ডেঙ্গু ও জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়।
বাসযোগ্য নগরী গড়তে প্রয়োজন বাস্তবায়ন : ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা, খাল ও জলাশয় সংরক্ষণ, পর্যাপ্ত সবুজ এলাকা তৈরি, নিরাপদ গণপরিবহন নিশ্চিত করা এবং নাগরিক সেবায় অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তবে সরকারের উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে পরিকল্পনার ধারাবাহিক বাস্তবায়ন, নিয়মিত তদারকি এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর জবাবদিহির ওপর। পাশাপাশি নাগরিকদের সচেতনতা ও সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ। সব মিলিয়ে, ঢাকাকে বাসযোগ্য করার উদ্যোগ এখন শুধু উন্নয়ন প্রকল্পের বিষয় নয়। এটি জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ সুরক্ষা এবং নাগরিক জীবনের মান উন্নয়নের প্রশ্ন। কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে রাজধানীর দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো কমিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানান, ঢাকা শহরকে বাসযোগ্য করতে প্রধানমন্ত্রী প্রথম দিন থেকেই অত্যন্ত সচেষ্ট। ফলে ঢাকা মহানগরীকে একটি পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে ২০টি পরিবীক্ষণ টিম শিগগিরই মাঠে নামছে। তিনি পরিবীক্ষণ কমিটির সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলেন, আপনারা ঢাকা মহানগরীকে একটি পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য নগরী গড়তে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি হিসেবে মাঠে কাজ করবেন। টিমগুলোর সমন্বিত ও কঠোর ভূমিকা থাকলে আগামী এক-দুই মাসের মধ্যেই ঢাকার দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে।