ক্যামেরার সামনে কোনো বাস্তব অভিনেতা নেই, নেই প্রচলিত অভিনয়শিল্পীদের কণ্ঠস্বর কিংবা চিরাচরিত চলচ্চিত্র নির্মাণের পদ্ধতি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের সাহায্যে তৈরি হয়েছে পুরো সিনেমা। প্রযুক্তির এই বিস্ময় নিয়েই বড় পর্দায় হাজির হয়েছে চীন। কিন্তু মুক্তির শুরুতেই ধাক্কা! কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি সিনেমাটির আগাম টিকিট বিক্রি আশানুরূপ নয়। বিপুলসংখ্যক প্রদর্শনীর আয়োজন করেও দর্শকদের কাছ থেকে তেমন সাড়া পাচ্ছে না ‘সানশিংদুই: ফিউচার পাস্ট’।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) চীনের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে দেশটির প্রথম সম্পূর্ণ এআই-নির্মিত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হিসেবে পরিচিত এই সায়েন্স ফিকশন থ্রিলার। টিকিট বিক্রির প্ল্যাটফর্ম মাওইয়ানের তথ্য অনুযায়ী, মুক্তির দিন শুক্রবার সকাল পর্যন্ত সিনেমাটির আগাম টিকিট বিক্রি থেকে আয় হয়েছে মাত্র ৮০ হাজার ইউয়ান, যা প্রায় ১১ হাজার ৯৮০ মার্কিন ডলার। অথচ ছবিটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ইউয়ানের বেশি, অর্থাৎ প্রায় ১৫ লাখ ডলার।
প্রাথমিক পূর্বাভাস আরও হতাশাজনক। মাওইয়ানের হিসাব অনুযায়ী, সিনেমাটির মোট বক্স অফিস আয় দেড় লাখ ইউয়ানের নিচে থাকতে পারে। এই পূর্বাভাস সত্যি হলে নির্মাণ ব্যয়ের তুলনায় আয় হবে অত্যন্ত সামান্য। তবে এটি প্রাথমিক অনুমান—চূড়ান্ত বক্স অফিসের হিসাব নয়।
১০ হাজারের বেশি প্রদর্শনী, তবু দর্শক টানতে হিমশিম
বড় পরিসরে মুক্তির পরিকল্পনা নিয়েই সিনেমাটি প্রেক্ষাগৃহে এসেছে। মাওইয়ানের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম দিনেই ছবিটির ১০ হাজারের বেশি প্রদর্শনীর সূচি নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু এত বড় আয়োজনও এখন পর্যন্ত আগাম টিকিট বিক্রিতে প্রত্যাশিত সাড়া নিশ্চিত করতে পারেনি।
টিকিটের দাম ২০ থেকে ৯০ ইউয়ানের মধ্যে। ফলে আগাম বিক্রির আয় থেকে বোঝা যায়, মুক্তির আগে ছবিটি নিয়ে দর্শকদের আগ্রহ সীমিত ছিল। প্রযুক্তিগত অভিনবত্ব, বড় বাজেট ও দেশজুড়ে প্রদর্শনীর পরিকল্পনা—কোনোটিই আপাতত বক্স অফিসে বড় সাফল্যের নিশ্চয়তা দিতে পারেনি।
এখানেই সামনে এসেছে চলচ্চিত্রশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন: এআই দিয়ে সিনেমা বানানো যত সহজ ও দ্রুতই হোক, দর্শক কি সেই সিনেমা দেখার জন্য টাকা খরচ করতে আগ্রহী?
দুই বছরের পরিশ্রম, শতাধিক নয়—প্রায় ১০০ জনের দল
চীনা চলচ্চিত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোনা ফিল্ম গ্রুপের তৈরি ছবিটি নির্মাণে প্রায় ১০০ জনের একটি দল দুই বছরের বেশি সময় কাজ করেছে। ছবিটির অভিনয়শিল্পী, কণ্ঠস্বর ও পটভূমি তৈরিতে এআই ব্যবহার করা হয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে পুরো নির্মাণপ্রক্রিয়ায় মানুষের প্রয়োজন ছিল না; পরিকল্পনা, গল্প, পরিচালনা, সৃজনশীল সিদ্ধান্ত ও প্রযুক্তির ব্যবহার সমন্বয় করতে বড় একটি দল কাজ করেছে।
ছবিটির মূল আকর্ষণ প্রাচীন চীনা সভ্যতা ও ভবিষ্যতের প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীকে এক সুতোয় গাঁথা। প্রাচীন সানশিংদুই সভ্যতার রহস্য, ভবিষ্যতের সুপার এআই এবং প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে সাজানো হয়েছে এর কাহিনি। অর্থাৎ, যে প্রযুক্তি ব্যবহার করে সিনেমাটি তৈরি, সেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই গল্পের অন্যতম প্রধান বিষয়।
বোনা ফিল্ম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী জিয়াং দেফু স্বীকার করেছেন, ছবিটি নিয়ে দর্শকদের প্রাথমিক সাড়া খুব উচ্ছ্বসিত নয়। তবে তাঁর মতে, এই নির্মাণপ্রচেষ্টা চলচ্চিত্রশিল্পের জন্য নতুন দিগন্ত খুলে দিচ্ছে। নতুন প্রযুক্তির ব্যবহারকে বড় পর্দায় নিয়ে আসার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি অগ্রণী ভূমিকা রাখতে চায়।
এআই ভিডিওতে কোটি কোটি ভিউ, সিনেমার টিকিটে অনীহা কেন?
এআই-নির্মিত কনটেন্টের জনপ্রিয়তার সঙ্গে পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমার টিকিট বিক্রির এই ব্যবধান বিশেষভাবে চোখে পড়ছে। চীনের জনপ্রিয় স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিও প্ল্যাটফর্ম দৌইনে (Douyin), যা টিকটকের চীনা সংস্করণ হিসেবে পরিচিত, এআই দিয়ে তৈরি স্বল্পদৈর্ঘ্য নাটক ও ভিডিও ব্যাপক দর্শক পাচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই দৌইনে এআই-নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য নাটকগুলো ২০০ বিলিয়নের বেশি বার দেখা হয়েছে।
কিন্তু অনলাইনে বিনা মূল্যে বা সহজে দেখা যায় এমন ছোট ভিডিওর জনপ্রিয়তা যে প্রেক্ষাগৃহে টিকিট কেটে সিনেমা দেখার আগ্রহে রূপ নেবে, তার নিশ্চয়তা নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু দর্শক এআই সিনেমার জন্য অর্থ ব্যয় করা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তাঁদের আপত্তির একটি দিক হলো, এআই দিয়ে তৈরি বিনোদনমূলক কনটেন্ট যখন অনলাইনেই পাওয়া যায়, তখন একই ধরনের অভিজ্ঞতার জন্য আলাদা করে সিনেমার টিকিট কেনার প্রয়োজন কতটা?
এখানে শুধু প্রযুক্তি নয়, গল্পের মান, চরিত্রের সঙ্গে দর্শকের আবেগের সংযোগ, দৃশ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং বিনোদনের সামগ্রিক অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। এআই যত উন্নতই হোক, দর্শককে হলে টানতে হলে সিনেমাটিকে শেষ পর্যন্ত ভালো গল্প ও উপভোগ্য অভিজ্ঞতা দিতে হবে।
হলিউডেও বাড়ছে উদ্বেগ, বদলে যেতে পারে চলচ্চিত্রশিল্প
এআই দিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের এই পরীক্ষা বিশ্ব চলচ্চিত্রশিল্পে চলমান বৃহত্তর বিতর্কের মধ্যেই সামনে এসেছে। হলিউডসহ বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনে এআই ব্যবহারের ফলে অভিনয়শিল্পী, চিত্রনাট্যকার, অ্যানিমেটর ও অন্যান্য কলাকুশলীর কাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
একদিকে এআইয়ের সাহায্যে দৃশ্য নির্মাণ, বিশেষ প্রভাব তৈরি ও উৎপাদন ব্যয় কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লে মানুষের সৃজনশীল কাজের সুযোগ, পারিশ্রমিক এবং মেধাস্বত্বের অধিকার কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে, সেই প্রশ্নও জোরালো হচ্ছে।
‘সানশিংদুই: ফিউচার পাস্ট’ তাই কেবল একটি সিনেমা নয়; এটি চলচ্চিত্র নির্মাণের ভবিষ্যৎ নিয়ে চলমান পরীক্ষারও অংশ। ছবিটি বাণিজ্যিকভাবে সফল হলে এআই-নির্ভর পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমায় বিনিয়োগ বাড়তে পারে। আর দর্শকের সাড়া দুর্বল থাকলে নির্মাতাদের নতুন করে ভাবতে হবে, প্রযুক্তির অভিনবত্বকে কীভাবে প্রকৃত বিনোদনমূল্যে রূপ দেওয়া যায়।
প্রযুক্তির জয়, নাকি দর্শকের রায়?
চীনের এআই সিনেমার সামনে এখন দুটি বড় পরীক্ষা—প্রযুক্তিগত সক্ষমতা প্রমাণ করা এবং দর্শককে টিকিট কিনে প্রেক্ষাগৃহে আনতে পারা। প্রথম পরীক্ষায় ছবিটি ইতিমধ্যেই নতুন নজির তৈরি করেছে। কিন্তু দ্বিতীয় পরীক্ষার ফল এখনো অনিশ্চিত।
আগাম টিকিট বিক্রির দুর্বল সূচনা ছবিটির বাণিজ্যিক ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবে প্রথম দিনের হিসাব দিয়েই চূড়ান্ত ব্যর্থতা ঘোষণা করা ঠিক হবে না। মুক্তির পরবর্তী দিনগুলোতে দর্শকের উপস্থিতি, মুখে মুখে প্রচার এবং সমালোচকদের প্রতিক্রিয়া ছবিটির প্রকৃত সাফল্য নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে।
সব মিলিয়ে, এআই দিয়ে সিনেমা বানানোর প্রযুক্তি যে দ্রুত এগোচ্ছে, তা স্পষ্ট। কিন্তু প্রযুক্তি দিয়ে ছবি তৈরি করা আর দর্শকের মন জয় করা এক বিষয় নয়। চীনের এই পরীক্ষামূলক মুক্তি হয়তো চলচ্চিত্রশিল্পকে সেই পুরোনো সত্যটিই আবার মনে করিয়ে দিচ্ছে—সিনেমা তৈরির পদ্ধতি বদলাতে পারে, কিন্তু দর্শককে হলে টানার লড়াই শেষ পর্যন্ত গল্প ও অভিজ্ঞতারই।