রাজধানীর অভিজাত পুলিশ হাউজিং এলাকায় তিনতলা বাড়ি। রাত নামলেই সেখানে দামি গাড়ির আনাগোনা, উচ্চ শব্দে ডিজে মিউজিক আর তরুণ-তরুণীদের ভিড়। অনলাইনে নিবন্ধন করে জনপ্রতি প্রায় ৬০০ টাকা দিলেই মিলত পার্টিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ। রাত ৯টা থেকে পরদিন সকাল ৯টা পর্যন্ত চলত আয়োজন। বাইরে থেকে সাধারণ ভাড়াবাড়ি মনে হলেও সেই বাড়িতে মাদক সেবন ও অবৈধ কর্মকাণ্ডের অভিযোগে অভিযান চালিয়ে ৮৪ জনকে আটক করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, বাড়িটির মালিক পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত ডিআইজি) আব্দুল্লাহ আল জহির। ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। তবে বাড়িতে সংঘটিত অভিযোগগুলোর সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পৃক্ততা তদন্তে এখনো চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি।
অনলাইন বুকিং, জনপ্রতি ৬০০ টাকা
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর ভাটারা থানাধীন পুলিশ হাউজিং-১ এলাকায় অবস্থিত বাড়িটিতে ২০২৫ সাল থেকে নিয়মিত ডিজে পার্টির আয়োজন করা হচ্ছিল। এসব অনুষ্ঠানে অংশ নিতে এয়ারবিএনবি ও ট্রাভেলা নামের অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধনের তথ্য পেয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ।
ডিএমপির গোয়েন্দা উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইলিয়াস কবির জানান, মাসে প্রায় ২০ থেকে ২২টি পার্টির আয়োজন করা হতো। অন্য একটি প্রতিবেদনে মাসে ২০ থেকে ২৫ দিন আয়োজন চলার কথা বলা হয়েছে।
প্রতিটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে জনপ্রতি প্রায় ৬০০ টাকা নেওয়া হতো বলে জানিয়েছে পুলিশ। সেই হিসাবে ১০০ জন অংশ নিলে একটি আয়োজন থেকে নিবন্ধন ফি বাবদ ৬০ হাজার টাকা সংগ্রহ সম্ভব। মাসে ২২টি আয়োজন হলে শুধু এই খাতেই সম্ভাব্য সংগ্রহ দাঁড়ায় ১৩ লাখ ২০ হাজার টাকা। তবে এটি অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ধরে করা গাণিতিক হিসাব, প্রকৃত আয় নয়।
রাতভর গান, নাচ; সামনে দামি গাড়ির সারি
অভিযানসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়িটির সামনে ও ভেতরে প্রায় ২২টি গাড়ি দেখা যায়। ভবনের ভেতরে উচ্চ শব্দে গান বাজছিল। সীসা সেবনের কারণে পরিবেশ ধোঁয়াচ্ছন্ন ছিল বলেও জানিয়েছেন ডিবির এক কর্মকর্তা।
একটি আমন্ত্রণবার্তায় রাত ৯টা থেকে পরদিন সকাল ৯টা পর্যন্ত পার্টি চলার কথা উল্লেখ ছিল। অনুষ্ঠানটিকে ব্যক্তিগত ও আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য বলা হয়। বার্তায় বাড়িটির মালিক একজন পুলিশ কর্মকর্তা হওয়ায় অভিযান নিয়ে উদ্বেগের কারণ নেই বলেও দাবি করা হয়েছিল।
বার্তাটির বক্তব্য ঘিরে প্রশ্ন উঠলেও এটি কে তৈরি করেছিলেন, কারা প্রচার করেছিলেন এবং এর প্রতিটি দাবি সত্য কি না, তা নিশ্চিত করার জন্য তদন্তের তথ্য প্রয়োজন।
মদ, ইয়াবা ও কুশ উদ্ধার
ডিবির অভিযানে বাড়িটি থেকে মদ, ইয়াবা ও কুশসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। এ ছাড়া যৌনস্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট কিছু সামগ্রীও উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেছে।
২০ অক্টোবর প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়, অভিযানে ২৬ জন নারী ও ৫৮ জন পুরুষসহ মোট ৮৪ জনকে আটক করা হয়। তাঁদের মধ্যে একজন আফগানিস্তানের নাগরিক থাকার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ী রয়েছেন। আটক নারীদের অধিকাংশের বয়স ২০ থেকে ২২ বছরের মধ্যে বলে জানিয়েছেন ডিএমপির উত্তরা বিভাগের ডিসি ইলিয়াস কবির।
বাড়িভাড়ার আয়ের ৭০ শতাংশ পেতেন মালিক?
বাড়িটির ভাড়া ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহির নিজেই একটি সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ব্যবস্থাপনার খরচ বাদ দিয়ে ভাড়া থেকে পাওয়া অর্থের ৭০ শতাংশ তিনি পেতেন এবং বাকি ৩০ শতাংশ পেতেন ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা।
বাড়িটির দেখাশোনার জন্য মাহবুবুল আলম নামে একজন কো-হোস্ট নিয়োগ করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে ভাড়ার অর্থের হিসাব, নিবন্ধন ফি থেকে প্রাপ্ত অর্থ এবং এসব লেনদেনের সঙ্গে কোনো বেআইনি কর্মকাণ্ডের আর্থিক যোগসূত্র ছিল কি না, তা নিশ্চিত হতে আর্থিক নথি ও লেনদেনের তথ্য যাচাই জরুরি।
মালিকের দাবি, অবৈধ কর্মকাণ্ডের জন্য বাড়ি ভাড়া দেননি
অভিযোগের বিষয়ে অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরের বক্তব্য, তিনি অনলাইনে বাড়ি ভাড়া দিয়েছিলেন, অবৈধ কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য নয়। তাঁর দাবি, বাড়িটি সরাসরি সার্বক্ষণিক তদারক করা সম্ভব ছিল না বলে ম্যানেজার ও কো-হোস্ট নিয়োগ করা হয়েছিল।
তিনি আরও বলেছেন, কোনো ভাড়াটে সেখানে অবৈধ কর্মকাণ্ড করলে তার দায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়ির মালিকের ওপর বর্তায় না। তবে কোনো অনিয়মের বিষয়ে মালিক আগে থেকে জানতেন কি না, তদারকিতে গাফিলতি ছিল কি না এবং ভাড়া ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা কী ছিল—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে।
পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত, তদন্তে কী বেরিয়ে আসবে?
ঘটনার পর পুলিশ সদর দপ্তরের আদেশে আব্দুল্লাহ আল জহিরকে সদর দপ্তরের হেডকোয়ার্টার্স শাখায় সংযুক্ত করা হয়েছে বলে একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। ডিবি ঘটনাটি তদন্ত করছে। তাঁর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে বলে পুলিশ সদর দপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এদিকে, তাঁর বিরুদ্ধে পদায়ন, পদোন্নতি ও বিভিন্ন প্রকল্প ঘিরে অনিয়মের অভিযোগও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি; সংশ্লিষ্ট তদন্তের ফলও এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
সব মিলিয়ে ঘটনাটি এখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মুখে: অনলাইনে পার্টির নিবন্ধন ও অর্থ সংগ্রহের পুরো ব্যবস্থাটি কারা পরিচালনা করতেন? মাদক কোথা থেকে আসত? বাড়িটির ব্যবস্থাপকেরা কী জানতেন? আর বাড়ির মালিকের কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না?
এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে তদন্ত, আর্থিক নথি, উদ্ধার করা আলামত এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের ওপর। অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত না করে, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দায়ীদের শনাক্ত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।