একসময় রেডিওতে কাজের সুযোগ পাননি। অভিনয়জীবনের শুরুতেও সাফল্য ছিল অধরা। একের পর এক সিনেমা ব্যর্থতা আর নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে আজ তিনি বলিউডের কিংবদন্তি অভিনেতা অমিতাভ বচ্চন। কয়েক দশকের অভিনয়জীবনে নিজের অনন্য কণ্ঠস্বর, ব্যক্তিত্ব ও অভিনয়দক্ষতা দিয়ে কোটি ভক্তের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন তিনি।
বয়স বাড়লেও কাজের প্রতি আগ্রহে ভাটা পড়েনি এই অভিনেতার। বড় পর্দার পাশাপাশি ছোট পর্দাতেও নিজের জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছেন তিনি। বর্তমানে ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি’র ১৮তম মৌসুমের কাজ নিয়ে ব্যস্ত অমিতাভ। তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারের পেছনে রয়েছে সংগ্রাম, সাফল্য, দুর্ঘটনা ও ঘুরে দাঁড়ানোর নানা গল্প।
রেডিওতে প্রত্যাখ্যান, সিনেমায় কণ্ঠের জাদু
সিনেমায় অভিনয়ের আগে রেডিওতে কাজ করার চেষ্টা করেছিলেন অমিতাভ। কিন্তু দিল্লির অল ইন্ডিয়া রেডিওতে তার সেই চেষ্টা সফল হয়নি। তবে একটি প্রত্যাখ্যান তার ভবিষ্যৎ থামিয়ে দিতে পারেনি।
১৯৬৯ সালে মৃণাল সেন পরিচালিত জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সিনেমা ‘ভুবন সোম’-এ ভাষ্যকার হিসেবে কাজ করেন তিনি। সেখান থেকেই চলচ্চিত্রে তার কণ্ঠের যাত্রা শুরু। পরবর্তী সময়ে গভীর ও স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর অমিতাভের পরিচয়ের অন্যতম অংশ হয়ে ওঠে। অভিনয়ের পাশাপাশি ভাষ্যকার হিসেবেও গড়ে তোলেন আলাদা অবস্থান।
টানা ব্যর্থতার পর ‘জঞ্জির’-এ ঘুরে দাঁড়ানো
আজকের অমিতাভ বচ্চনের সাফল্যের পথ মোটেও সহজ ছিল না। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে তার অভিনীত একাধিক সিনেমা বক্স অফিসে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ওই সময়ে টানা ১২টি সিনেমা ব্যর্থ হওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ব্যর্থতা তাকে থামাতে পারেনি। ১৯৭৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘জঞ্জির’ সিনেমা তার ক্যারিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ মোড় এনে দেয়। এই ছবিতে নতুনভাবে দর্শকের সামনে হাজির হন তিনি। পর্দায় তার দৃঢ় উপস্থিতি ও অভিনয় তাকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। ধীরে ধীরে বলিউডে নিজের অবস্থান শক্ত করেন অমিতাভ।
দুঃসময়ে পাশে ছিলেন মেহমুদ
অভিনয়জীবনের প্রথম দিকে আর্থিক ও পেশাগত নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল অমিতাভকে। প্রচলিত বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী, সেই সময়ে অভিনেতা মেহমুদ তাকে নিজের বাড়িতে থাকার সুযোগ দিয়েছিলেন।
সুনীল দত্ত পরিচালিত ‘রেশমা অউর শেরা’ সিনেমায় মূক চরিত্রেও অভিনয় করেন অমিতাভ। তার ভারী কণ্ঠস্বর চরিত্রটির সঙ্গে মানানসই হবে না—এমন ধারণা থেকে তাকে সংলাপহীন চরিত্রে নেওয়া হয়েছিল বলে প্রচলিত রয়েছে।
আরেকটি প্রচলিত বর্ণনায় বলা হয়, অমিতাভের অভিনয়জীবনে সহায়তার জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী অভিনেত্রী নার্গিসের কাছে সুপারিশপত্র পাঠিয়েছিলেন। তবে এসব ঘটনার বিবরণ নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্নতা থাকায় সেগুলোকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন।
অভিনয় থেকে বিরতি, পরে নতুন অধ্যায়
অমিতাভের ক্যারিয়ারেও এসেছে বিরতির সময়। ‘ইনসানিয়ত’ সিনেমাটি নানা কারণে পিছিয়ে যায়। ১৯৯১ সালে মুক্তির কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত ১৯৯৪ সালে প্রেক্ষাগৃহে আসে ছবিটি। এরপর কিছু সময় অভিনয় থেকে দূরে ছিলেন তিনি।
তবে বিরতি তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারের সমাপ্তি ঘটায়নি। পরবর্তী সময়ে আবারও অভিনয়ে ফিরে আসেন এবং বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে নিজের দক্ষতার পরিচয় দেন।
অভিনয়ের পাশাপাশি গানেও পরিচিতি
অমিতাভের কণ্ঠ শুধু সংলাপেই সীমাবদ্ধ নয়, গানেও রয়েছে তার স্বতন্ত্র উপস্থিতি। ‘লাওয়ারিস’ সিনেমার ‘মেরে অঙ্গনে মে’ এবং ‘সিলসিলা’র ‘নীলা আসমান সো গয়া’ তার গাওয়া উল্লেখযোগ্য গানগুলোর মধ্যে রয়েছে।
এ ছাড়া ‘বাগবান’ সিনেমার ‘ম্যায় ইয়াহাঁ তু ওয়াহাঁ’, ‘কহানি’র ‘একলা চলো রে’ এবং ‘বোল বচ্চন’-এর শিরোনামসংগীতেও শোনা গেছে তার কণ্ঠ। অভিনয়ের পাশাপাশি এসব কাজও তাকে দর্শক-শ্রোতাদের কাছে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।
‘কুলি’র দুর্ঘটনা বদলে দিয়েছিল সিনেমার পরিণতি
অমিতাভের জীবনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ‘কুলি’ সিনেমার শুটিংয়ে গুরুতর আহত হওয়া। শুটিংয়ের সময় দুর্ঘটনায় তার অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। তাকে নিয়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে ভক্তদের মধ্যে।
এই ঘটনার পর সিনেমাটির গল্পেও পরিবর্তন আনা হয়। পরিচালক মনমোহন দেসাই চিত্রনাট্যে সংশোধন করেন এবং শেষ পর্যন্ত পর্দায় অমিতাভের চরিত্র ইকবালকে বাঁচিয়ে রাখা হয়। বাস্তবের সেই দুর্ঘটনা সিনেমাটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মরণীয় ঘটনাগুলোর একটি হয়ে আছে।
বহু সিনেমায় চরিত্রের নাম ‘বিজয়’
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে নানা ধরনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন অমিতাভ। ‘গুড্ডি’, ‘গোলমাল’ ও ‘হিরো হিরালাল’-এর মতো সিনেমায় বিশেষ উপস্থিতি কিংবা নিজের নামেই পর্দায় হাজির হয়েছেন তিনি।
তার অভিনীত অনেক সিনেমায় চরিত্রের নাম ছিল ‘বিজয়’। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, ২০টিরও বেশি সিনেমায় এই নামে অভিনয় করেছেন তিনি। এ ছাড়া ক্যারিয়ারে একাধিকবার দ্বৈত চরিত্রেও দেখা গেছে তাকে।
ছোট পর্দাতেও জনপ্রিয়তার শীর্ষে
বড় পর্দার তারকা হয়েও টেলিভিশনে কাজ করে নতুন সাফল্যের নজির গড়েছেন অমিতাভ। ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি’র সঞ্চালক হিসেবে তার আন্তরিক উপস্থাপনা, প্রতিযোগীদের সঙ্গে কথোপকথন এবং ব্যক্তিত্ব অনুষ্ঠানটিকে জনপ্রিয় করে তুলেছে।
বড় পর্দার বাইরেও দর্শকের সঙ্গে এই সংযোগ তার জনপ্রিয়তাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। বর্তমানে অনুষ্ঠানটির ১৮তম মৌসুম নিয়ে ব্যস্ত রয়েছেন তিনি।
জয়া বচ্চনের সঙ্গে দীর্ঘ পথচলা
১৯৭৩ সালে অভিনেত্রী জয়া ভাদুড়িকে বিয়ে করেন অমিতাভ। তাদের অভিনীত ‘অভিমান’ সিনেমাটি বিয়ের প্রায় এক মাস পর মুক্তি পায়। দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনে দুজনই ভারতীয় চলচ্চিত্রের পরিচিত মুখ হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছেন।
দশকের পর দশক ধরে অভিনয় করে অমিতাভ বচ্চন একাধিক প্রজন্মের দর্শকের কাছে প্রিয় হয়ে উঠেছেন। ব্যর্থতা থেকে সাফল্য, ব্যক্তিগত সংকট থেকে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানো—তার ক্যারিয়ারের প্রতিটি অধ্যায়ই ভক্তদের কাছে আগ্রহের বিষয়। এখনো নতুন কাজ নিয়ে দর্শকের প্রত্যাশা রয়েছে। বিশেষ করে ‘কল্কি ২৮৯৮ এডি’র দ্বিতীয় পর্বে তাকে আবারও দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন অনুরাগীরা।