মৃত গরু থেকে এলিয়েন-আতঙ্ক, রহস্যের জালে কোরীয় সিনেমা ‘হোপ’

বিনোদন ডেস্ক

বিনোদন

রহস্যময় এক প্রাণীর সন্ধানে নেমে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয় দক্ষিণ কোরিয়ার সীমান্তঘেঁষা ছোট্ট শহর হোপ হারবার। একের পর এক মৃত্যুর

2026-10-20T14:42:13+00:00
2026-10-20T14:42:13+00:00
  বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬,
৫ কার্তিক ১৪৩৩
 
বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
বিনোদন
মৃত গরু থেকে এলিয়েন-আতঙ্ক, রহস্যের জালে কোরীয় সিনেমা ‘হোপ’
বিনোদন ডেস্ক
মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬, ২:৪২ পিএম 
‘হোপ’ সিনেমার বিভিন্ন দৃশ্য। কোলাজ
রহস্যময় এক প্রাণীর সন্ধানে নেমে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয় দক্ষিণ কোরিয়ার সীমান্তঘেঁষা ছোট্ট শহর হোপ হারবার। একের পর এক মৃত্যুর ঘটনা, ধ্বংসস্তূপ, গুলির শব্দ আর আতঙ্কিত মানুষের আর্তনাদে বদলে যায় শহরটির চেনা পরিবেশ। অজানা এক শক্তির বিরুদ্ধে শুরু হয় মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই। এমনই রহস্য, অ্যাকশন ও আতঙ্কে ভরা গল্প নিয়ে নির্মিত হয়েছে কোরীয় পরিচালক না হং-জিনের সায়েন্স ফিকশন–অ্যাকশন থ্রিলার ‘হোপ’।

প্রায় ১৬০ মিনিটের এই সিনেমায় এলিয়েনের সঙ্গে মানুষের সংঘাতের পাশাপাশি রয়েছে ডার্ক হিউমার, সহিংসতা ও একের পর এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা। তবে দুর্দান্ত অ্যাকশন ও আকর্ষণীয় গল্পের সূচনা সত্ত্বেও পুরো সিনেমায় একই মাত্রার উত্তেজনা ধরে রাখতে পারেননি নির্মাতা।

সিনেমার শুরুতে দেখা যায়, একটি গরু রহস্যজনকভাবে মারা গেছে। প্রাণীটির শরীরজুড়ে গভীর ক্ষত। কে বা কারা এমন নৃশংসভাবে গরুটিকে হত্যা করেছে, তা জানতে তদন্তে নামেন শহরের পুলিশপ্রধান বিওম-সক। কিন্তু তদন্ত যত এগোয়, ততই সামনে আসে ভয়াবহ সব ঘটনা।

শহরের বিভিন্ন স্থানে পড়ে থাকতে দেখা যায় মৃতদেহ। ভবন ভেঙে পড়ে, চারদিকে শোনা যায় গুলির শব্দ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার মতো পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য কিংবা প্রস্তুতি—কোনোটিই নেই বিওম-সকের হাতে। পরিচিত মানুষদের মৃত্যু দেখতে দেখতে তাঁর পেশাদারি আত্মবিশ্বাসেও চিড় ধরে।

এদিকে শিকারি দলের নেতৃত্বে থাকা তাঁর আত্মীয় সুং-কি রহস্যময় প্রাণীটির সন্ধানে বনে যায়। অন্যদিকে নবীন পুলিশ কর্মকর্তা সুং-এ দায়িত্ব পালনে বিওম-সকের সঙ্গে যোগ দেয়। প্রাণীটির শক্তি ও ভয়াবহতা সম্পর্কে তাদের ধারণা যত বাড়তে থাকে, নিজেদের অসহায়ত্বও তত স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

‘হোপ’-এর অন্যতম শক্তিশালী দিক হলো এর শুরুর অংশ। পরিচালক শুরুতেই রহস্যময় প্রাণীটিকে পুরোপুরি সামনে আনেননি। বরং ধ্বংসস্তূপ, মৃতদেহ, গুলির শব্দ এবং আতঙ্কিত মানুষের প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে এর উপস্থিতি অনুভব করিয়েছেন। ফলে দর্শকের মনেও প্রশ্ন জাগে—এটি কি কোনো হিংস্র প্রাণী, নাকি পৃথিবীর বাইরের কোনো অজানা সত্তা?

প্রথম ঘণ্টায় এই রহস্য ধরে রাখার কৌশল বেশ কার্যকর। একের পর এক বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করে দর্শককে গল্পের সঙ্গে যুক্ত রাখেন নির্মাতা। দ্রুতগতির গাড়ির ধাওয়া, বিপজ্জনক বাঁক, বন্দুকযুদ্ধ, বিস্ফোরণ ও প্রাণীটির আক্রমণে সিনেমার অ্যাকশন দৃশ্যগুলো হয়ে উঠেছে বেশ উপভোগ্য।

বিশেষ করে গাড়ির ধাওয়ার দৃশ্যগুলোতে ক্যামেরার ব্যবহার নজর কাড়ে। চিত্রগ্রাহক হং কিয়ং-পিয়ো বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যেও দৃশ্যের গতি ও ব্যাপ্তি ধরে রাখতে পেরেছেন। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে মানুষের ছোটাছুটি কিংবা সরু রাস্তা দিয়ে দ্রুতগতিতে গাড়ি ছুটে যাওয়ার দৃশ্যগুলোতে রয়েছে যত্নের ছাপ।

সিনেমাটিকে কেবল গম্ভীর অ্যাকশন থ্রিলার ভাবলে ভুল হবে। এর বিভিন্ন দৃশ্যে রয়েছে অদ্ভুত কৌতুক, উদ্ভট পরিস্থিতি এবং চরিত্রদের হাস্যকর ভুলভ্রান্তি। কখনো ভুল করে নিরীহ কাউকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো, কখনো আবার বিপদের মধ্যেও অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো ঘটনা গল্পে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।

রক্তপাত ও মৃত্যুর মতো ভয়াবহ ঘটনার সঙ্গে ডার্ক হিউমারের এই মিশ্রণ প্রথমে কিছুটা অপ্রত্যাশিত মনে হতে পারে। তবে পরিচালকের নির্মাণশৈলীর সঙ্গে মানিয়ে নিলে এই বৈপরীত্যই সিনেমাটির অন্যতম আকর্ষণ হয়ে ওঠে।

পুলিশপ্রধান বিওম-সক চরিত্রে হোয়াং জং-মিন সিনেমাটির অন্যতম প্রধান শক্তি। শুরুতে তাঁকে আত্মবিশ্বাসী ও অভিজ্ঞ পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে দেখা যায়। কিন্তু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তাঁর মানসিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটতে থাকে। ভয়, হতাশা ও দায়িত্ববোধের টানাপোড়েন তিনি বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

অন্যদিকে সুং-এ চরিত্রে জুং হে-ইওনও নজর কেড়েছেন। বিপদের মুখে সাহস নিয়ে এগিয়ে যাওয়া, অস্ত্র হাতে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা এবং সহকর্মীদের পাশে দাঁড়ানোর দৃশ্যগুলোতে তাঁর উপস্থিতি চোখে পড়ে। চরিত্রটির দৃঢ়তা ও দায়িত্ববোধ ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন এই অভিনেত্রী।

সুং-কি চরিত্রে জো ইন-সাংও গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে চরিত্রগুলোর ব্যক্তিগত জীবন ও মানসিক জগৎ নিয়ে খুব বেশি বিস্তারিত জানার সুযোগ নেই। নির্মাতা তাদের গভীরভাবে পরিচিত করে তোলার চেয়ে বিপদের মুখে তাদের আচরণ ও প্রতিক্রিয়া দেখানোর দিকেই বেশি মনোযোগ দিয়েছেন।

‘হোপ’-এর গল্পে ধীরে ধীরে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—অপরিচিত কাউকে দেখলেই কি তাকে শত্রু ভাবতে হবে?

উত্তর কোরিয়ার সীমান্তঘেঁষা শহরটির বাসিন্দাদের জীবনে অনুপ্রবেশকারী ও শত্রুর আশঙ্কা যেন নিত্যদিনের বিষয়। ফলে অচেনা কাউকে সন্দেহ করা কিংবা অস্ত্র হাতে প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রবণতা তাদের মধ্যে সহজেই দেখা যায়।

রহস্যময় প্রাণীটির আবির্ভাবের পর এই মানসিকতা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। শহরবাসী প্রাণীটি কী চায় বা কেন এসেছে, তা বোঝার আগেই ভয় ও আগ্রাসনের বশবর্তী হয়ে পড়ে। গল্প যত এগোয়, ততই স্পষ্ট হয়, যাদের বিরুদ্ধে মানুষ লড়ছে, তাদের সম্পর্কেও অনেক কিছু অজানা রয়ে গেছে।

এখানেই প্রচলিত দানবের গল্প থেকে কিছুটা আলাদা হয়ে ওঠে ‘হোপ’। সাধারণত এ ধরনের সিনেমায় মানুষকে দানবের বিরুদ্ধে লড়াই করতে দেখা যায়, আর দর্শকও তাদের জয় কামনা করেন। কিন্তু এই সিনেমায় মানুষের লোভ, সংকীর্ণতা ও সহিংসতাও সামনে আসে। তখন প্রশ্ন জাগে, বিপদের প্রকৃত উৎস কি শুধু রহস্যময় প্রাণীটি, নাকি মানুষের নিজেদের আচরণও সেই বিপর্যয়কে আরও ভয়াবহ করে তুলছে?

পরিচালক এই ভাবনাকে খুব গভীর দার্শনিক আলোচনায় নিয়ে যাননি। তবে চরিত্রদের আচরণ ও গল্পের বিভিন্ন মোড়ের মাধ্যমে দর্শককে বিষয়টি নিয়ে ভাবার সুযোগ দিয়েছেন।

সিনেমাটির সবচেয়ে বড় দুর্বলতার একটি হলো ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস বা সিজিআই। বাস্তব লোকেশনে ধারণ করা দৃশ্যগুলো যেখানে বেশ প্রাণবন্ত ও বিশ্বাসযোগ্য, সেখানে রহস্যময় প্রাণীটির কিছু দৃশ্য প্রত্যাশিত প্রভাব তৈরি করতে পারেনি। যে প্রাণীকে ঘিরে এত রহস্য ও আতঙ্ক, পর্দায় তার উপস্থিতি কখনো কখনো কিছুটা কৃত্রিম মনে হয়।

দ্বিতীয় সমস্যা সিনেমার দৈর্ঘ্য। প্রায় ১৬০ মিনিটের এই ছবির প্রথম ঘণ্টায় যে রহস্য ও উত্তেজনা দর্শককে আটকে রাখে, মাঝের অংশে তার গতি কিছুটা কমে যায়। বনে শিকারিদের অভিযান, প্রাণীটির পরিচয় নিয়ে নানা ইঙ্গিত এবং একের পর এক সংঘর্ষের দৃশ্য কখনো কখনো প্রয়োজনের তুলনায় দীর্ঘ মনে হয়। এতে গল্পের গতি ব্যাহত হয় এবং উত্তেজনার তীব্রতাও কমে আসে।

শেষভাগে সিনেমাটি আবার গতি ফিরে পেলেও এলিয়েনদের পরিচয় ও তাদের জগৎ নিয়ে বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর অমীমাংসিত থেকে যায়। এতে পরবর্তী পর্ব দেখার আগ্রহ তৈরি হতে পারে। তবে স্বতন্ত্র গল্প হিসেবে পুরোপুরি পরিণতি না পাওয়ায় কিছুটা অতৃপ্তি থেকেই যায়।

‘দ্য চেজার’, ‘দ্য ইয়েলো সি’ ও ‘দ্য ওয়েইলিং’-এর মতো সিনেমার জন্য পরিচিত পরিচালক না হং-জিন এবার বড় পরিসরের অ্যাকশন, অস্বাভাবিক পরিস্থিতি ও ডার্ক হিউমারের মিশেলে ভিন্ন স্বাদের একটি সায়েন্স ফিকশন থ্রিলার উপহার দিয়েছেন।

সিনেমাটির গল্পের শুরু আকর্ষণীয়, অ্যাকশন দৃশ্যগুলো উপভোগ্য এবং অভিনয়ও বেশ শক্তিশালী। তবে দুর্বল সিজিআই, মাঝের অংশে গতি কমে যাওয়া ও শেষদিকে কিছু প্রশ্নের উত্তর না পাওয়ায় এটি পুরোপুরি সন্তুষ্ট করতে পারে না।

তারপরও রহস্যময় প্রাণী, এলিয়েন, দ্রুতগতির অ্যাকশন ও অপ্রত্যাশিত ঘটনার সিনেমা যাঁরা পছন্দ করেন, তাঁদের জন্য ‘হোপ’ হতে পারে উপভোগ্য একটি অভিজ্ঞতা। বিনোদনের পাশাপাশি মানুষের ভয়, সন্দেহ ও সহিংসতা নিয়ে ভাবারও কিছু উপাদান রয়েছে এতে।


Loading...
Loading...

বিনোদন- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: