সংকট কাটাতে আধুনিক ও নাগরিকবান্ধব করা হচ্ছে বর্জ্য অপসারণ ব্যবস্থা
দীর্ঘদিন ধরে অগোছালোভাবেই চলছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের বর্জ্য অপসারণ। ফলে বছরে পর বছর বর্জ্য দূষণের কবলে থাকছে রাজধানীর মানুষ। এ সংকট দূর করতে রাজধানীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আরও আধুনিক, পরিচ্ছন্ন ও নাগরিকবান্ধব করতে উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। এলক্ষ্যে নগরীর বিভিন্ন স্থানে অন্তর্বর্তীকালীন বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্রের (এসটিএস) সৌন্দর্যবর্ধন কাজ শুরু করেছে দক্ষিণ সিটি। গত কয়েক মাস ধরে নগরীকে পরিচ্ছন্ন রাখতে প্রতি মাসের প্রথম শনিবার ‘ক্লিনিং ডে’ পালন করা হচ্ছে। এছাড়া, নগরীর বাসাবাড়ি, সড়ক, বাজার ও বিভিন্ন জনবহুল এলাকায় বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন এবং অপসারণ কার্যক্রমে শৃঙ্খলা আনার পাশাপাশি নাগরিকদের ভোগান্তি কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন নগরী গড়ে তোলাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুই সিটিতে প্রতিদিন প্রায় আট হাজার টন বর্জ্য উদপাদন হচ্ছে। আম কাঁঠাল মৌসুমে এর পরিমাণ আরো বেড়ে যাচ্ছে। রাজধানীর বাসাবাড়ির এসব ময়লা-আবর্জনা আসে দুই সিটি কর্পোরেশনের সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশনে। সকাল থেকেই শুরু হয় বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য আনার কার্যক্রম। দুই সিটির পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা এক গাড়িতেই নিয়ে আসে সব ধরনের বর্জ্য। যে কারণে পচে গলে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বর্জ্যরে গুনাগুন। কাগজ, প্লাস্টিক, বাসাবাড়ি কিংবা হোটেলের অব্যবহৃত খাবার, পলিথিন, ফোম সব বর্জ্যই পাওয়া যায় এসব বর্জ্য ব্যবস্থপনা কেন্দ্রে। ভাল করে খুঁজলে এখানে মিলবে মেডিকেল বর্জ্যও। এসব বর্জ্যরে ৭০ থেকে ৭৫ ভাগই জৈব। আবশিষ্ট ২৫ থেকে ৩০ ভাগ পূর্ণব্যবহারযোগ্য। কিন্তু সব বর্জ্য একসাথে সংগ্রহ করায় নষ্ট হচ্ছে বর্জ্যরে বিশাল সম্ভাবনা। তাই বর্জ্যরে বিশাল সম্ভাবনা কাজে লাগাতে দরকার যুগোপযোগী পরিকল্পনা ও এর বাস্তবায়ন।
এদিকে, দুই সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ময়লা আবর্জনা পরিষ্কার করছে প্রায় ১২ হাজার পরিচ্ছন্নতাকর্মী। এসব কর্মী সনাতন পদ্ধতিতেই বর্জ্য অপসারণ করায় প্রায় শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগ, ক্যান্সারসহ নানা রোগে ভুগছেন। তাছাড়া, সময়মতো সব বর্জ্য অপসারণ না হওয়ায় রাজধানীর গলি থেকে প্রধান সড়কসহ যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনায় অতিষ্ঠ নগরবাসী। দীর্ঘদিন ধরে চলছে এমন অবস্থা। ফলে বর্জ্য দূষণ থেকে মুক্তি মিলছে না। এদিকে তাদের ২০১৮ সালের ১৬ অক্টোবর ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের সব বর্জ্য রাত ১০টা থেকে সকাল ৬টার মধ্যে অপসারণের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। এর পাশাপাশি ঢাকনা ছাড়া ট্রাক বা ভ্যান দিয়ে বর্জ্য সংগ্রহ ও পরিবহন বন্ধেও ব্যবস্থা নিতে বলা হয় ওই আদেশে। হাইকোর্টের নির্দেশনা উপেক্ষা করে রাজধানীর বেশিরভাগ এলাকায় দিনেই বর্জ্য অপসরাণের কাজ চলছে। এতে দুগর্ন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে পড়ছে নগরবাসী।
সরেজমিন রাজধানীর, মগবাজার, রামপুরা, খিলগাঁও, পল্টনসহ বিভিন্ন এলাকার সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ এসটিএসে ময়লা আবর্জনা উপচে সড়কে পড়ছে। এতে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এতে চলাচলকারীদের ভোগান্তি হচ্ছে। ফলে এ ভোগান্তি কমাতে নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর, পরিবেশবান্ধব ও নান্দনিক করে তুলতে দক্ষিণ সিটি বিভিন্ন সময়োপযোগী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে দক্ষিণ সিটির উদ্যোগে কলাবাগান, পুরান এলিফ্যান্ট রোডের সবজি বাগান, মালিবাগ ও বুয়েট-সংলগ্ন পালাশী এলাকার এসটিএস আধুনিকায়ন ও সৌন্দর্যবর্ধন করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য এলাকায় এ কার্যক্রম পরিচালিত হবে। বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্রের সৌন্দর্যবর্ধনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট এলাকার পরিবেশের উন্নয়ন, পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিতকরণ এবং নগরবাসীর মধ্যে পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। দক্ষিণ সিটির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের বাস্তবায়নে এ উদ্যোগ নগরীর পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করার পাশাপাশি পরিবেশসম্মত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে সহায়ক হবে বলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
জানা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য জমে থাকা, সময়মতো ময়লা অপসারণ না করা, দুর্গন্ধ এবং ড্রেন বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টির মতো সমস্যায় দীর্ঘদিন ধরেই ভোগান্তিতে রয়েছেন নগরবাসী। বিশেষ করে আবাসিক এলাকা, কাঁচাবাজার ও বাণিজ্যিক অঞ্চলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ পরিস্থিতিতে বর্জ্য সংগ্রহ থেকে শুরু করে চূড়ান্ত অপসারণ পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার তাগিদ দিয়েছেন নগরবাসী। সংশ্লিষ্টদের মতে, নাগরিকবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ, নির্ধারিত সময়ে ময়লা অপসারণ, পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কার্যক্রম তদারকি এবং বর্জ্য ফেলার ক্ষেত্রে নাগরিকদের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি যত্রতত্র বর্জ্য ফেলা বন্ধ করা এবং নির্ধারিত স্থানে ময়লা ফেলার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সড়ক থেকে ময়লা পরিষ্কার করলেই পরিচ্ছন্ন নগরী নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বর্জ্য উৎপাদন, সংগ্রহ, পরিবহন, পৃথকীকরণ, পুনর্ব্যবহার এবং নিরাপদ অপসারণ প্রতিটি ধাপে সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ করে পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্য আলাদা করে সংগ্রহ করা গেলে পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ কাজে লাগানোর সুযোগ বাড়বে। একই সাথে কমবে পরিবেশদূষণ ও বর্জ্যরে চাপ। এ ক্ষেত্রে বাসাবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাজার ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং সিটি করপোরেশনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। বর্জ্য সংগ্রহের নির্দিষ্ট সময়সূচি প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়ন করা গেলে দীর্ঘ সময় সড়ক কিংবা ফুটপাতে ময়লা পড়ে থাকার প্রবণতা কমানো সম্ভব।
দুই সিটির সংশ্লিষ্ট বিভাগ বলছে, নগরীর পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে করপোরেশনের পাশাপাশি নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। যত্রতত্র ময়লা ফেলা, নালা-নর্দমায় প্লাস্টিক ও পলিথিন ফেলা এবং খোলা স্থানে বর্জ্য জমিয়ে রাখার কারণে পরিবেশদূষণ ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়ে। তাই পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিয়ম ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তবে উদ্যোগের বাস্তব সুফল নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ে এর কার্যকর বাস্তবায়ন, পর্যাপ্ত জনবল ও সরঞ্জাম, নিয়মিত তদারকি এবং বর্জ্য অপসারণের সক্ষমতার ওপর। নাগরিকদের অভিযোগ গ্রহণ ও দ্রুত সমাধানের ব্যবস্থাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সংশ্লিষ্ট উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, জনদুর্ভোগ কমানো এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হবে। তবে এ জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক কার্যক্রম, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম জানান, বিশ্বের দূষিত শহর, যানজট এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নেতিবাচক সূচকে ঢাকার অবস্থান কোনোভাবেই কাম্য নয়। রাজধানীকে একটি আধুনিক, নিরাপদ ও নাগরিকবান্ধব শহরে রূপান্তর করতে সিটি কর্পোরেশনকে আরও কার্যকর, জবাবদিহিমূলক এবং সেবামুখী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আরও আধুনিক, পরিচ্ছন্ন ও নাগরিকবান্ধব করা হচ্ছে। তিনি বলেন, বিশেষ করে বিভিন্ন এলাকার এসটিএস সৌন্দর্যবর্ধন কাজ শুরু হয়েছে। পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন নগরী গড়ে তোলাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য। নগরবাসীর প্রতি বিশেষ আহ্বান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, প্রত্যেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে নিজস্ব ডাস্টবিনে বর্জ্য সংরক্ষণ করতে হবে এবং নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের সামনের অংশ পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। যত্রতত্র বর্জ্য ফেলা থেকে বিরত থাকলে নগর পরিচ্ছন্ন রাখার পাশাপাশি ডেঙ্গুর ঝুঁকিও বহুগুণে কমানো সম্ভব হবে। এ বিষয়ে যেকোনো অভিযোগ সিটি কর্পোরেশনকে জানালে অতি দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও তিনি জানান।