হুতির হামলায় অস্থির সৌদি, একের পর এক ভুলের খেসারত দিচ্ছে রিয়াদ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

ইয়েমেনের হুতিদের সঙ্গে নতুন করে সংঘাত বাড়ায় সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক রূপান্তর পরিকল্পনা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র

2026-10-12T15:52:04+00:00
2026-10-12T15:52:04+00:00
  মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬,
২৮ আশ্বিন ১৪৩৩
 
মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
হুতির হামলায় অস্থির সৌদি, একের পর এক ভুলের খেসারত দিচ্ছে রিয়াদ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:৫২ পিএম 
হুতির হামলায় অস্থির সৌদি, একের পর এক ভুলের খেসারত দিচ্ছে রিয়াদ
ইয়েমেনের হুতিদের সঙ্গে নতুন করে সংঘাত বাড়ায় সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক রূপান্তর পরিকল্পনা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কা, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সম্পর্কে টানাপোড়েন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা নিয়ে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে রিয়াদকে। বিশ্লেষকদের মতে, ইয়েমেন নীতি ও আঞ্চলিক মিত্রদের বিষয়ে সৌদি আরবের আগের কিছু সিদ্ধান্তও বর্তমান সংকটকে জটিল করে তুলেছে।

উন্নয়নের পরিকল্পনায় নিরাপত্তার নতুন বাধা
যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে পর্যটন, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, বিনোদন ও বড় ক্রীড়া আয়োজনের কেন্দ্র হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। কিন্তু ইয়েমেনের সংঘাত নতুন করে তীব্র হলে এসব পরিকল্পনার জন্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি বাড়তে পারে।

প্রায় ১১ বছর ধরে ইয়েমেনের যুদ্ধে সামরিক অভিযান ও কূটনৈতিক উদ্যোগ—দুই পথেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে সৌদি আরব। ইরান-সমর্থিত হুতিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর পর একপর্যায়ে তাদের সঙ্গে আলোচনাতেও বসে রিয়াদ। একই সময়ে তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের উদ্যোগ নেয় দেশটি।

তবে কয়েক বছরের তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতির পর ইয়েমেনকে ঘিরে উত্তেজনা আবার বাড়তে শুরু করেছে। এতে সৌদি আরবের সীমান্ত নিরাপত্তা, তেল পরিবহন ও আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ইউএইর সঙ্গে বিরোধে দুর্বল হয়েছে সমন্বয়?
ইয়েমেন ইস্যুতে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দীর্ঘদিনের অংশীদারত্বে টানাপোড়েন তৈরি হওয়াকে বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।

একসময় দুই দেশ ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব মোকাবিলায় ইয়েমেনে একই জোটের অংশ হিসেবে সামরিক অভিযান চালিয়েছিল। কিন্তু ইয়েমেনের বিভিন্ন পক্ষকে সমর্থন দেওয়া নিয়ে তাদের স্বার্থে পার্থক্য তৈরি হয়। গত বছরের শেষ দিকে সামরিক যানবহরকে লক্ষ্য করে সৌদি বিমান হামলার ঘটনার পর বিরোধ আরও প্রকাশ্যে আসে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এরপর সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের সেনা প্রত্যাহার করে নেয়। বিশ্লেষকদের মতে, এর ফলে ইয়েমেনে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় ও সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয়।

দক্ষিণ ইয়েমেনের এক কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, ইউএইর সেনারা চলে যাওয়ার সময় দায়িত্ব হস্তান্তর যথাযথভাবে হয়নি। তাঁর মতে, আমিরাতের বাহিনীর কার্যকর কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার বিকল্প সৌদি আরব দ্রুত গড়ে তুলতে পারেনি।

হুতিদের মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন
আঞ্চলিক সংঘাত বিস্তৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সৌদি আরবের নিরাপত্তা উদ্বেগও বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা ছিল, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ বাড়লে তেহরানের ঘনিষ্ঠ হুতিরা সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে হামলা জোরদার করতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইয়েমেনের সংঘাত ঘিরে উত্তেজনার মধ্যে সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে যুদ্ধবিরতি নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের ঘাটতি এবং বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান হারানোর ঘটনাও রিয়াদের সামরিক কৌশল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইয়েমেনবিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক আহমেদ নাগি সিএনএনকে বলেন, হুতিদের হামলার জন্য সৌদি আরব যথেষ্ট প্রস্তুত ছিল না। তাঁর মতে, সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের অভাব পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করেছে।

হুতিদের হাতে থাকা উন্নত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থানে আঘাত হানতে সক্ষম—এমন উদ্বেগও জানিয়েছেন বিশ্লেষকেরা। তেল অবকাঠামো ও পরিবহনব্যবস্থা ঝুঁকির মুখে পড়লে দেশটির অর্থনৈতিক কার্যক্রমেও প্রভাব পড়তে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কতটা কার্যকর?
সৌদি আরবের নিরাপত্তা কৌশলে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তবে সংকটের সময় ওয়াশিংটন কতটা সামরিক সহায়তা দেবে, তা নিয়ে রিয়াদের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সিএনএনের বরাতে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, গত মাসে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দুবার ফোনে কথা বলেন। হুতিদের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর অনুরোধ জানানো হলেও ট্রাম্প প্রশাসন সরাসরি সংঘাতে জড়াতে আগ্রহ দেখায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

এর পরিবর্তে ওয়াশিংটন ওমানে হুতিদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে নিজেদের যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। এতে সৌদি আরবের নিরাপত্তা অগ্রাধিকার ও যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক কৌশলের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট হয়েছে।

সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র‍্যাটনি মনে করেন, সৌদি সামরিক বাহিনী দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অংশীদারত্বকে কেন্দ্র করে নিজেদের প্রতিরক্ষা কৌশল সাজিয়েছে। ফলে স্বাধীনভাবে সামরিক অভিযান পরিচালনার প্রয়োজনীয় সক্ষমতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে।

নতুন নিরাপত্তা অংশীদার খুঁজছে রিয়াদ
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সৌদি আরব এখন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। গত মাসে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গে কায়রোতে বৈঠক করেন। পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভাইস প্রেসিডেন্ট শেখ মনসুর বিন জায়েদকে রিয়াদে আমন্ত্রণ জানান।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফ্রান্স সৌদি আরবে সামরিক কর্মী ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম পাঠাতে সম্মত হয়েছে। যুক্তরাজ্য সৌদি যুদ্ধবিমানে জ্বালানি সরবরাহের জন্য উড়োজাহাজ পাঠানোর কথা জানিয়েছে। এ ছাড়া গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তার জন্য শতাধিক মার্কিন সামরিক উপদেষ্টা সৌদি আরবে কাজ করছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যেও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, রিয়াদে এক বৈঠকের পর তিন দেশ সম্মিলিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সক্রিয় করার বিষয়ে সম্মত হয়।

অন্যদিকে, ইউএই-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনী হুতিবিরোধী তৎপরতায় অংশ নিচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ পরিস্থিতি সৌদি আরব ও আমিরাতের মধ্যে সম্পর্কের উন্নতির সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে, যদিও দুই দেশের মতপার্থক্য পুরোপুরি দূর হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।

সামরিক অভিযানেই কি শেষ হবে ইয়েমেনের সংকট?
বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশি সামরিক সহায়তা কিংবা ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর সাময়িক অগ্রগতি দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের সমাধান নিশ্চিত করা কঠিন। দেশটির বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে বিরোধ, নেতৃত্বের বিভাজন এবং রাজনৈতিক সমঝোতার অভাব এখনো বড় বাধা।

ইউরোপিয়ান ইনস্টিটিউট অব পিসের ইয়েমেনবিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা হিশাম আল-ওমাইসি সিএনএনকে বলেন, বিভিন্ন পক্ষের কমান্ডব্যবস্থার সমন্বয় বাড়ানোর পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বিরোধও সমাধান করতে হবে। তাঁর মতে, পুনর্দখল করা এলাকাগুলোর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে না পারলে সামরিক সাফল্য দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে না।

ইয়েমেনের সংঘাতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিরোধও গভীরভাবে সম্পর্কিত। ওয়াশিংটন ও তেহরানের উত্তেজনা দীর্ঘায়িত হলে হুতিদের প্রতি ইরানের সমর্থন এবং সৌদি আরবের ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ অবস্থায় সৌদি আরবকে একদিকে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে হবে, অন্যদিকে আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয় এবং কূটনৈতিক উদ্যোগও জোরদার করতে হবে। কারণ, ইয়েমেনের সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে তা শুধু সৌদি আরবের নিরাপত্তা নয়, দেশটির বিনিয়োগ, পর্যটন ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের লক্ষ্যেও প্রভাব ফেলতে পারে।

সূত্র: সিএনএন ও সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন।


Loading...
Loading...

আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: