দীর্ঘদিন ধরে ইয়েমেনের সংঘাত থেকে নিজেদের দূরে রেখে অর্থনৈতিক রূপান্তরের লক্ষ্যে এগোতে চেয়েছিল সৌদি আরব। কিন্তু আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে মতবিরোধ, হুতিদের সামরিক তৎপরতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেশটিকে আবারও সংঘাতের ঝুঁকিতে ফেলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ধারাবাহিক কৌশলগত ভুল পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের পরিকল্পনা দেশকে পর্যটন, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও বৈশ্বিক ক্রীড়া আয়োজনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করা। তবে ইয়েমেন ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ায় সেই পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও বিনোদনমূলক আয়োজনেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মিত্রের সঙ্গে বিরোধে দুর্বল হলো সৌদির অবস্থান
ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে সৌদি আরবের সম্পৃক্ততা এক দশকেরও বেশি সময়ের। শুরুতে ইরান-সমর্থিত হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালালেও পরবর্তী সময়ে রিয়াদ সংঘাত কমানোর উদ্যোগ নেয়। তেহরানের সঙ্গেও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে দেশটি।
কিন্তু ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো নিয়ে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) মধ্যে মতপার্থক্য বাড়তে থাকে। ইউএই দক্ষিণ ইয়েমেনকে পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার পক্ষে থাকা সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলকে (এসটিসি) সমর্থন দেয়। অন্যদিকে, ইয়েমেনের বিভক্তি ঠেকাতে চায় সৌদি আরব।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসটিসির জন্য পাঠানো সামরিক যানবাহী একটি চালানে সৌদি বিমান হামলার পর দুই দেশের বিরোধ আরও প্রকাশ্য হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে ইউএই নিজেদের সেনা প্রত্যাহার করে নিলে ইয়েমেনে সৌদি আরবের দায়িত্ব ও চাপ বেড়ে যায়।
দক্ষিণ ইয়েমেনের এক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, আমিরাতি বাহিনী চলে যাওয়ার পর দায়িত্ব হস্তান্তরের জন্য কার্যকর কোনো ব্যবস্থা ছিল না। ফলে স্থানীয় মিত্র বাহিনীগুলোর সঙ্গে সমন্বয় এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় সৌদি আরবকে বাড়তি সমস্যার মুখে পড়তে হয়।
হুতিদের পাল্টা হামলায় বাড়ছে নিরাপত্তাঝুঁকি
ইয়েমেনে হুতিদের সঙ্গে উত্তেজনা নতুন করে বাড়ার পেছনে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের পর পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতি নেতাদের বহনকারী একটি বিমানকে ঘিরে বিরোধের পর সৌদি আরব ইয়েমেনের রাজধানী সানার বিমানবন্দরে হামলা চালায়। বিমানটির চলাচল সৌদি আরবের আরোপ করা বিধিনিষেধ লঙ্ঘন করেছিল বলে অভিযোগ ওঠে।
এর প্রতিক্রিয়ায় সৌদি আরবের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি থেকে সরে আসার ঘোষণা দেয় হুতিরা। পাশাপাশি দেশটির জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার হুমকি এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় এলাকায় তৎপরতা বাড়ানোর খবর পাওয়া যায়।
বিশেষ উদ্বেগের বিষয় বাব আল-মান্দেব প্রণালি। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগকারী এই জলপথ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে অস্থিরতা বাড়লে আঞ্চলিক নিরাপত্তার পাশাপাশি বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এরপর সৌদি আরবের তেল অবকাঠামো ও পাইপলাইন লক্ষ্য করে হামলার খবর সামনে আসে। জবাবে রিয়াদ ব্যাপক বিমান অভিযান চালিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুদ্ধের প্রস্তুতি ও সমন্বয়ে ঘাটতির অভিযোগ
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইয়েমেনবিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক আহমেদ নাগির মতে, হুতিদের নতুন সামরিক পদক্ষেপ মোকাবিলায় সৌদি আরব যথেষ্ট প্রস্তুত ছিল না। একই সঙ্গে ইউএইর সঙ্গে কাজ করা ইয়েমেনি বাহিনীগুলোর সমন্বয়েও দুর্বলতা দেখা গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইয়েমেনে সৌদি আরবের চ্যালেঞ্জ শুধু বিমান হামলা চালানোর সক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয় মিত্রদের নিয়ন্ত্রণ, দখল করা এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ বজায় রাখাও বড় পরীক্ষা।
সামরিক অভিযানে কোনো এলাকা দখল করা গেলেও সেখানে স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা না গেলে সেই সাফল্য দীর্ঘমেয়াদে কাজে নাও আসতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা নিয়ে বাড়ছে প্রশ্ন
সৌদি আরবের নিরাপত্তা কৌশলের আরেকটি বড় দিক যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা। ওয়াশিংটনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করার উদ্যোগ থাকলেও প্রয়োজনের সময় মার্কিন সমর্থন কতটা পাওয়া যাবে, তা নিয়ে রিয়াদের উদ্বেগের কথা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
সিএনএনের উদ্ধৃত সূত্রগুলোর দাবি, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন। তবে ওয়াশিংটন সরাসরি হামলায় যুক্ত হওয়ার পরিবর্তে ওমানের মাধ্যমে হুতিদের সঙ্গে যোগাযোগ ও যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার উদ্যোগ নেয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
হুতিরা একদিকে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অবস্থান জানিয়েছে, অন্যদিকে লোহিত সাগরে মার্কিন জাহাজ চলাচলের বিষয়ে আলাদা অবস্থান নিয়েছে। এতে আঞ্চলিক পক্ষগুলোর স্বার্থ ও কৌশলের মধ্যে জটিলতা আরও স্পষ্ট হয়েছে।
বিকল্প নিরাপত্তা জোট গড়ার চেষ্টা রিয়াদের
পরিস্থিতি সামাল দিতে সৌদি আরব এখন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে। মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গে যুবরাজের বৈঠক এবং ইউএইর নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগকে সেই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফ্রান্স সৌদি আরবকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে সম্মতি জানিয়েছে। যুক্তরাজ্যও সৌদি যুদ্ধবিমানকে জ্বালানি সরবরাহে সহায়তার জন্য একটি উড়োজাহাজ পাঠানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। পাশাপাশি সৌদি আরবে মার্কিন সামরিক উপদেষ্টারা অবস্থান করছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়াতে একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। রিয়াদের লক্ষ্য, বিদ্যমান নিরাপত্তা অংশীদারত্বকে কাজে লাগিয়ে হুতিদের হামলা মোকাবিলা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা।
ইয়েমেনের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখাই বড় পরীক্ষা
ইউরোপিয়ান ইনস্টিটিউট অব পিসের ইয়েমেনবিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা হিশাম আল-ওমেইসির মতে, সংঘাত মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। বিশেষ করে বিভিন্ন বাহিনীর কমান্ড কাঠামোকে কার্যকরভাবে যুক্ত করা এবং পারস্পরিক বিরোধ কমানো প্রয়োজন।
সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকার যদি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকাগুলো সুরক্ষিত রাখতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সামরিক অভিযানের অর্জনও স্থায়ী হবে না বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
সব মিলিয়ে ইয়েমেন পরিস্থিতি সৌদি আরবের জন্য সামরিক ও কূটনৈতিক—দুই ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একদিকে হুতিদের হামলা ঠেকানো, অন্যদিকে আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর প্রশ্ন রয়েছে। এই সংকট কত দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসে, তার ওপর সৌদি আরবের নিরাপত্তা এবং যুবরাজের উচ্চাভিলাষী অর্থনৈতিক পরিকল্পনার ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে।
সূত্র-ভিত্তি: ব্যবহারকারীর দেওয়া সিএনএন-উদ্ধৃত প্রতিবেদন। প্রকাশের আগে মূল প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলোর তারিখ, হতাহতের সংখ্যা এবং সামরিক পদক্ষেপের তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।