যানজট এড়িয়ে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর নতুন প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই। এবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) পরিচালিত চালকবিহীন বৈদ্যুতিক পডের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয়েছে শহরটিতে। ছোট আকারের এই যানগুলো নির্দিষ্ট পথে চলবে এবং যাত্রীদের চাহিদা অনুযায়ী এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছে দেবে।
রোববার দুবাইয়ের ব্লু ওয়াটার্স এলাকায় ‘দুবাই গ্লাইডওয়েজ’ নামের এই পরিবহনব্যবস্থার চার সপ্তাহের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু করে দুবাইয়ের সড়ক ও পরিবহন কর্তৃপক্ষ (আরটিএ)। প্রচলিত বাস বা ট্রেনের মতো নির্দিষ্ট সময়সূচির পরিবর্তে যাত্রীদের প্রয়োজন অনুযায়ী যান চলাচলের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এক পডে ছয় যাত্রী, গতি ঘণ্টায় ৫০ কিলোমিটার
গ্লাইডওয়েজের প্রতিটি পডে চার থেকে ছয়জন যাত্রী বসতে পারবেন। যানগুলো ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৫০ কিলোমিটার গতিতে চলতে সক্ষম। সম্পূর্ণ চার্জে একটি পড সর্বোচ্চ ২৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত চলতে পারবে বলে জানানো হয়েছে।
এই পরিবহনব্যবস্থার জন্য তৈরি করা হবে আলাদা গাইডওয়ে বা নির্দিষ্ট চলার পথ। প্রয়োজন অনুযায়ী এসব পথ মাটির সমতলে কিংবা উঁচু কাঠামোর ওপর নির্মাণ করা সম্ভব। ফলে প্রচলিত সড়কের ওপর চাপ না বাড়িয়েও যাত্রী পরিবহনের বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, পডগুলো দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা চলাচলের উপযোগী হবে। যাত্রীরা যানটির ভেতরে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ও বিনোদনসংক্রান্ত কিছু সুবিধাও নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী ব্যবহার করতে পারবেন।
চালক ছাড়াই কীভাবে চলবে এই যান?
চালকবিহীন পড পরিচালনায় ব্যবহার করা হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্যামেরা, রাডার ও বিভিন্ন ধরনের সেন্সর। প্রতিটি যানে ২০টি উচ্চ রেজল্যুশনের লিডার সেন্সর থাকার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এসব প্রযুক্তির সাহায্যে যানগুলো আশপাশের পরিবেশ শনাক্ত করতে, চলাচলের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে এবং নির্ধারিত পথে চলতে পারবে।
এই ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, একাধিক পডকে প্রযুক্তির মাধ্যমে সমন্বিতভাবে চালানো সম্ভব। এর ফলে যানগুলোর মধ্যে ব্যবধান এক সেকেন্ডেরও কম রাখার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। তবে বাস্তব পরিবেশে এই সক্ষমতা কতটা নিরাপদ ও কার্যকর হবে, তা পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে।
ঘণ্টায় ২০ হাজারের বেশি যাত্রী পরিবহনের পরিকল্পনা
আরটিএর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গ্লাইডওয়েজ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দুই দিক মিলিয়ে ঘণ্টায় ২০ হাজারের বেশি যাত্রী পরিবহনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ছোট আকারের যান ব্যবহার করেও কীভাবে বিপুলসংখ্যক যাত্রীকে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া যায়, এই প্রযুক্তির মূল লক্ষ্য সেটিই। যাত্রীদের চাহিদা অনুযায়ী পডের সংখ্যা ও চলাচল সমন্বয় করা গেলে ব্যস্ত নগর এলাকায় যাতায়াতের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ব্যয় কমানোর সম্ভাবনাও তুলে ধরেছে আরটিএ। কর্তৃপক্ষের দাবি, তুলনীয় পরিবহনব্যবস্থার তুলনায় এই প্রযুক্তির অবকাঠামো নির্মাণে প্রাথমিক মূলধনি ব্যয় সর্বোচ্চ ৯০ শতাংশ এবং পরিচালন ব্যয় সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কম হতে পারে। তবে এগুলো সম্ভাব্য হিসাব; প্রকৃত ব্যয় নির্ধারিত হবে বাস্তবায়ন, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে।
চার সপ্তাহের পরীক্ষায় কী যাচাই হবে?
ব্লু ওয়াটার্স এলাকায় পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চলাকালে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মূল্যায়ন করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে—
চালকবিহীন প্রযুক্তির নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতা।
ক্যামেরা, লিডার সেন্সর ও রাডারের কার্যকারিতা।
যানগুলোর পারস্পরিক যোগাযোগ ও চলাচল নিয়ন্ত্রণ।
যাত্রার সময়, যাত্রীদের স্বাচ্ছন্দ্য এবং ব্যবস্থাটির ব্যবহারযোগ্যতা।
নির্ধারিত পথে যানগুলো কতটা দক্ষতার সঙ্গে চলাচল করতে পারে।
এই পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে বৃহত্তর পরিসরে নেটওয়ার্কটি চালুর সম্ভাবনা বিবেচনা করা হবে।
আরটিএর শীর্ষ কর্মকর্তার পরীক্ষামূলক যাত্রা
পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের উদ্বোধন উপলক্ষে দুবাইয়ের সড়ক ও পরিবহন কর্তৃপক্ষের মহাপরিচালক এবং নির্বাহী পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান মাত্তার আল তাইয়ের একটি চালকবিহীন পডে ভ্রমণ করেন। নির্ধারিত পথে তাঁর যাত্রায় প্রায় পাঁচ মিনিট সময় লাগে।
এর আগে তিনি গ্লাইডওয়েজের প্রতিষ্ঠাতা ও সহপ্রধান নির্বাহী মার্ক সিগার এবং সহপ্রধান নির্বাহী ও প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা ব্লেক বারবারের সঙ্গে প্রকল্পটির প্রযুক্তিগত দিক নিয়ে আলোচনা করেন। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র পরিদর্শন করে যানগুলোর পর্যবেক্ষণ ও পরিচালনব্যবস্থা সম্পর্কেও ধারণা নেন।
আরটিএ ও গ্লাইডওয়েজের সহযোগিতা চুক্তির আওতায় এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্পে সহায়তা করছে দুবাই হোল্ডিং, যারা ব্লু ওয়াটার্স এলাকায় পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ ও অবকাঠামো প্রস্তুত করতে ভূমিকা রাখছে।
ভবিষ্যতের শহুরে যাতায়াতে বড় পরিবর্তন?
দুবাইয়ের এই উদ্যোগ সফল হলে চালকবিহীন পড শহুরে গণপরিবহনের একটি নতুন বিকল্প হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে স্বল্প দূরত্বে দ্রুত যাতায়াত, যাত্রীদের চাহিদা অনুযায়ী যান সরবরাহ এবং প্রচলিত সড়কের ওপর চাপ কমানোর ক্ষেত্রে প্রযুক্তিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে প্রযুক্তির সম্ভাবনার পাশাপাশি নিরাপত্তা, নিয়মিত পরিচালনা, অবকাঠামোর ব্যয় এবং বিপুলসংখ্যক যাত্রী সামলানোর সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। চার সপ্তাহের পরীক্ষায় এসব বিষয় কতটা সন্তোষজনকভাবে যাচাই করা যায়, তার ওপরই নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের সম্ভাবনা।
দুবাইয়ের এই পদক্ষেপ তাই শুধু নতুন ধরনের বৈদ্যুতিক যান চালুর পরীক্ষা নয়; বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিকে নগর পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত করার একটি উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা।
সূত্র: খালিজ টাইমস