১০ বছর পর খুলছে রাজধানীর রাগ-গোসসা নিবারণী পার্ক
রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী ওসমানী উদ্যানটি নগরবাসীর পাশাপাশি ঢাকায় আসা মানুষের কাছে প্রিয় একটি স্থান হিসেবে পরিচিত ছিল। বিশেষ করে গুলিস্তানে নানা কাজে আসা লোকজন নিরিবিলি একটু সময় কাটানোর জন্য এ উদ্যানটিকেই বেচে নিত। কিন্তু গত দশ বছর ধরে এ উদ্যানটিতে কেউ প্রবেশ করতে পারেনি। মূলত অত্যাধুনিক পার্ক নির্মাণে জন্য দীর্ঘ বছর এতে নানা কার্যক্রম চালিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি)। যার নাম দেওয়া হয় রাগ-গোসসা নিবারণী পার্ক। ১০০ কোটি টাকার এ প্রকল্পের কাজ শুরুর দশ মাসের মাথায় শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা আর হয়নি। তবে সব জটিলতা কাটিয়ে আগামী ১৯ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে এটি উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ফলে নগরবাসীর বিনোদন ও শরীরচর্চার সুযোগ বাড়ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পটির কাজ শুরু করে দক্ষিণ সিটি। এতে প্রায় দশ বছর ধরে এ উদ্যানটি আবদ্ধ ছিল। তবে প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতায় এর টিনের বেড়া নানা স্থানে ভেঙে ফেলায় সেসব স্থান দিয়ে আসা-যাওয়া করছে অনেকেই। আর যে লক্ষ্য সামনে রেখে উদ্যানে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে তার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে আসছেন নগর বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদরা। তারা বলছেন, ১০০ কোটি টাকার এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ওসমানী উদ্যান তার প্রধান বৈশিষ্ট্য হারাবে। প্রকৃতপক্ষে উন্নয়নের নামে ঐতিহাসিক এ স্থানকে ধ্বংস করা হচ্ছে বলেও তারা অভিযোগ করেছেন।
রাজধানীর গুলিস্তানে অবস্থিত এই ওসমানী উদ্যানের আয়তন প্রায় ২৪ একর। এই উদ্যানে অসংখ্য গাছপালা ও দুটি জলাশয় রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল মোহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানীর নামে এই পার্কের নামকরণ। সম্রাট আওরঙ্গজেবের প্রধান সেনাপতি মীর জুমলা আসাম যুদ্ধে ব্যবহার করেছিলেন এমন একটি ঐতিহাসিক কামান এই পার্কে রাখা আছে। গত দশ বছর ধরে উদ্যানটির ঐতিহ্য ফেরাতে কাজ করছে দক্ষিণ সিটি। এ উদ্যানের এক পাশে অত্যাধুনিক পার্ক নির্মাণ করা হয়েছে। যার নাম দেওয়া হয়েছে রাগ-গোসসা নিবারণী পার্ক। মূলত দেশের অন্যান্য শহরের তুলনায় নানা কারণে ঢাকা শহরের বসবাসকারীদের মেজাজ খিটখিটে ও গরম এবং রাগ বেশি থাকে। এতে নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে তাদের। ফলে তাদের মেজাজ ঠিক রাখতে ওসমানী উদ্যানে এই রাগ-গোসসা নিবারণী পার্ক স্থাপন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
দক্ষিণ সিটি জানিয়েছে, দীর্ঘ প্রায় ১০ বছর বন্ধ থাকার পর অবশেষে নগরবাসীর জন্য খুলে দেওয়া হচ্ছে ওসমানী উদ্যানের আধুনিক এ পার্ক। আধুনিকায়ন ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ শেষে উদ্যানটি আবারও জনসাধারণের ব্যবহারের উপযোগী করে তোলা হয়েছে। এতে দীর্ঘদিন ধরে সবুজের পরিসর ও উন্মুক্ত বিনোদনস্থলের অপেক্ষায় থাকা নগরবাসীর মধ্যে নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। উদ্যানটি খুলে দেওয়া হলে রাজধানীতে উন্মুক্ত সবুজ স্থানের সংকট কিছুটা হলেও কমবে বলে আশা করছেন অনেকে।
জানা গেছে, উদ্যানটির আধুনিকায়নে অবকাঠামো উন্নয়ন, সৌন্দর্যবর্ধন এবং দর্শনার্থীদের জন্য পরিবেশবান্ধব পরিসর তৈরির বিষয়গুলো গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এখানে জুলাই শহীদ ও জুলাই বীর যোদ্ধাদের স্মরণে বিশেষ জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে, যা আগত দর্শনার্থীদের জুলাই আগস্টের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার বিপ্লব ও শহীদদের আত্মত্যাগের স্মৃতিচারণ করার সুযোগ করে দেবে। এছাড়া, নতুনভাবে সাজানো এই উদ্যানে হাঁটার পথ, পরিবার-পরিজন নিয়ে সময় কাটানোর সুবিধা, রেস্তোরাঁ, আধুনিক লাইব্রেরি, শিশুদের খেলার সুনির্দিষ্ট স্থান, কৃত্রিম পানির ফোয়ারা ও মনোরম জলধারা রয়েছে। এছাড়া সচিবালয় সংলগ্ন এই গুরুত্বপূর্ণ স্থানটির সৌন্দর্য আরও বৃদ্ধি করতে এবং পরিবেশ মনোরম রাখতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন দিনরাত নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তাছাড়া, এটি সংস্কারকাজের আওতায় আর কী কী সুবিধা যুক্ত হয়েছে তা প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের পরই জানা যাবে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, একটি আধুনিক শহরে পার্ক ও উদ্যান শুধু সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য নয়; বরং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, মানসিক প্রশান্তি এবং নাগরিকদের সুস্থ জীবনযাপনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, যানজট, ধুলাবালি ও নির্মাণকাজের চাপে ঢাকায় সবুজ ও উন্মুক্ত স্থানের প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বাড়ছে। এ অবস্থায় ওসমানী উদ্যান পুনরায় চালু হলে নগরবাসীর বিনোদন ও শরীরচর্চার সুযোগ বাড়বে। তবে শুধু আধুনিকায়ন করেই দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। উদ্যানের সবুজ পরিবেশ সংরক্ষণ, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি উদ্যানের ভেতরে যাতে অবৈধ দখল, বাণিজ্যিক অনিয়ম কিংবা পরিবেশবিরোধী কর্মকান্ড গড়ে উঠতে না পারে, সেদিকেও নজর রাখা জরুরি। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ওসমানী উদ্যান খুলে দেওয়ার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তা রাজধানীর নাগরিক জীবনে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। এখন নগরবাসীর প্রত্যাশা উদ্যানটি যেন কেবল আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেওয়া নয়, বরং নিয়মিত পরিচর্যা ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়।
এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম জানান, আধুনিকায়িত ঐতিহাসিক ওসমানী উদ্যান এবং সেখানে নবনির্মিত ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ আগামী ১৯ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। উদ্বোধন ও সুধী সমাবেশ শেষে একই দিনে উদ্যানটি সর্বসাধারণের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। ফলে প্রায় দীর্ঘ ১০ বছর বন্ধ থাকার পর অবশেষে নগরবাসী এই দৃষ্টিনন্দন উদ্যানটি ব্যবহার করতে পারবেন।