জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে হঠাৎ বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনায় অবশেষে মুখ খুলেছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। প্রায় ২ হাজার শব্দের দীর্ঘ এক চিঠিতে নিজের সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দেওয়ার পাশাপাশি সতীর্থ ও সমর্থকদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন পর্তুগিজ অধিনায়ক। একই সঙ্গে নিজের আচরণের জন্য কোনো ছাড় না দিয়ে শাস্তি দেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।
ডেনমার্কের বিপক্ষে নেশনস লিগের ম্যাচের আগে পর্তুগালের ক্যাম্প ছেড়ে বেরিয়ে যান রোনালদো। এরপর থেকেই তাঁর জাতীয় দলে ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয় নানা জল্পনা। মঙ্গলবার প্রকাশ করা দীর্ঘ বিবৃতিতে সেই ঘটনার নিজের ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন ৪১ বছর বয়সী এই তারকা।
রোনালদোর দাবি, পুরো ঘটনার শুরু পর্তুগালের কোচ জর্জে জেসুসের সঙ্গে তাঁর একটি সমঝোতা থেকে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, শারীরিকভাবে ফিট রাখার পরিকল্পনায় নরওয়ে ও ডেনমার্কের বিপক্ষে তাঁর খেলার কথা ছিল না। পরে নরওয়ের ম্যাচের দিন কোচ তাঁকে জানান, ৩০ মিনিট খেলানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
রোনালদো জানান, তিনি বিরতির পর থেকেই ওয়ার্মআপ করছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাঠে নামার সুযোগ পাননি। তাঁর দাবি, এতে কোচের সঙ্গে আগে হওয়া সমঝোতা ভঙ্গ হয়।
ঘটনার পর জেসুসের সঙ্গে আরও একটি বৈঠক হয় বলে জানিয়েছেন রোনালদো। সেখানে আল নাসরের স্পোর্টিং ডিরেক্টর সিমাও কৌতিনিও উপস্থিত ছিলেন বলেও দাবি তাঁর। রোনালদোর ভাষ্য, পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে কোচ বিষয়টি পরিষ্কার করবেন—এমন একটি সমঝোতাও হয়েছিল।
এমনকি তাঁর দাবি, এ নিয়ে আট দফার একটি নোটও তৈরি করা হয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, রোনালদো কখনো খেলার সময় দাবি করেননি, কোচের সিদ্ধান্তকে সম্মান করেছেন এবং তাঁকে ওয়ার্মআপ করিয়ে মাঠে না নামানো ছিল কোচের ভুল।
কিন্তু সংবাদ সম্মেলনে জেসুসের বক্তব্য তাঁদের ব্যক্তিগত আলোচনার সঙ্গে মিলেনি—এমনটাই অভিযোগ রোনালদোর। তাঁর দাবি, এতে দ্বিতীয়বারের মতো কোচের কথার ওপর আস্থা নষ্ট হয়। এরপরই তিনি জাতীয় দলের ক্যাম্প ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন।
তবে নিজের সিদ্ধান্তকে কোনোভাবেই সঠিক বলে দাবি করেননি রোনালদো। বরং চিঠিতে সতীর্থ ও সমর্থকদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন তিনি।
রোনালদো লিখেছেন, ক্যাম্প ছেড়ে চলে যাওয়া তাঁর উচিত হয়নি এবং এর সম্পূর্ণ দায় তাঁর নিজের। বিশেষ করে তিনি যেহেতু দলের অধিনায়ক, তাই তাঁর ভুলকে আরও গুরুতর হিসেবে বিবেচনা করা উচিত বলেও মনে করেন তিনি।
সবচেয়ে চমক জাগানো বিষয়—নিজের শাস্তি নিজেই চেয়েছেন পর্তুগিজ অধিনায়ক।
তাঁর ভাষ্য, এই ঘটনার পরিণতি পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনেরই নির্ধারণ করা উচিত এবং শাস্তির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় বা সহানুভূতি দেখানো উচিত নয়। কারণ জাতীয় দলের অধিনায়ক হিসেবে তাঁর দায়িত্ব অন্যদের চেয়ে বেশি।
রোনালদো একই সঙ্গে জানিয়েছেন, জাতীয় দল থেকে বিদায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত তিনি এখনই নিচ্ছেন না। ২০২৬ বিশ্বকাপের পর অবসর নিয়ে একটি চিঠি আগেই লিখে রেখেছিলেন বলে জানান তিনি। তবে বিশ্বকাপ শেষে পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি তাঁকে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করলে তিনি জাতীয় দলে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
আর তাই শাস্তি পেলেও জাতীয় দলের দরজা বন্ধ করে দিচ্ছেন না রোনালদো। তাঁর বক্তব্য, শাস্তি শেষ হওয়ার পর তিনি যদি শারীরিকভাবে ফিট থাকেন এবং ক্লাবের হয়ে ভালো খেলেন, তাহলে পর্তুগালের হয়ে আবার মাঠে নামতে প্রস্তুত থাকবেন।
রোনালদোর কাছে জাতীয় দলের হয়ে খেলা মানে শুধু বিদায়ী ম্যাচে মাঠে নামা নয়; বরং প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জেতা। তাই কেবল আনুষ্ঠানিক বিদায়ী ম্যাচের বদলে তিনি চান, সামর্থ্য থাকলে আবারও পর্তুগালের হয়ে লড়াই করতে।
কোচ জর্জে জেসুসের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন এখনো কাটেনি। জেসুস অবশ্য রোনালদোর বর্ণিত সমঝোতার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। ফলে দুজনের বক্তব্যে তৈরি হয়েছে স্পষ্ট মতবিরোধ।
তবে নিজের ভুলের জায়গায় আপস করতে চাননি রোনালদো। দীর্ঘ চিঠির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বার্তাটাই সম্ভবত সেটি—তারকা যত বড়ই হোন, জাতীয় দলের নিয়ম সবার জন্যই সমান।
আর সেই কারণেই নিজের শাস্তিও নিজেই চেয়ে নিলেন পর্তুগালের অধিনায়ক।