দেশে মোট কত মানুষ বসবাস করছে এর সঠিক পরিসংখ্যান নেই সরকারি কোন সংস্থার কাছে। তবে বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী দেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি ৫৬ লাখ ৮৬ হাজার ৮৯৯ জন। তবে এ পরিসংখ্যান সত্য বা মিথ্যা যাই হোক এটাই সবাই মেনে নিচ্ছেন। কিন্তু বর্তমানে দেশে জন্মনিবন্ধনের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ২৪ কোটি ৮৮ লাখে। জনসংখ্যার তুলনায় জন্মনিবন্ধনের এই অস্বাভাবিক সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সংশ্লিষ্ট মহলে। এরমধ্যে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশে নতুন করে ৫৩ লাখ ২৪ হাজারের বেশি জন্মনিবন্ধন হয়েছে। একই সময়ে প্রায় ৩৫ লাখ জন্মনিবন্ধন সংশোধন করা হয়েছে। একই ব্যক্তির একাধিক জন্মনিবন্ধন, তথ্যের অসঙ্গতি এবং যাচাই-বাছাইয়ের ঘাটতির কারণে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এখন এর প্রকৃত চিত্র যাচাই করে কতগুলো বৈধ, কতগুলো অবৈধ এবং কতগুলো ভুল বা অকার্যকর তা স্পষ্ট করাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জন্মনিবন্ধন একজন নাগরিকের প্রাথমিক ও গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়পত্র। জন্মের পর একজন ব্যক্তির বয়স, নাম, বাবা-মায়ের পরিচয় ও নাগরিকত্বসংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি থেকে শুরু করে জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, চাকরি ও বিভিন্ন সরকারি সেবা গ্রহণেও জন্মনিবন্ধনের প্রয়োজন হচ্ছে। কিন্তু দেশের প্রকৃত জনসংখ্যার তুলনায় জন্মনিবন্ধনের সংখ্যা কয়েক কোটি বেশি হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে তথ্যভান্ডারের নির্ভুলতা নিয়ে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, বিভিন্ন সময়ে একই ব্যক্তির নামে একাধিক জন্মনিবন্ধন তৈরি হওয়া, পুরোনো তথ্য সংশোধনের পরিবর্তে নতুন করে নিবন্ধন এবং তথ্য যাচাইয়ের দুর্বলতার কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে, দেশের ১৭ কোটি ৫৬ লাখ ৮৬ হাজার ৮৯৯ মানুষের বিপরীতে জন্মনিবন্ধনের সংখ্যা ২৪ কোটি ৮৮ লাখ এই ব্যবধান শুধু পরিসংখ্যানের বিষয় নয়, এটি দেশের নাগরিক তথ্য ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। জনশুমারির হিসাবে দেশে জীবিত মানুষের সংখ্যা নির্ধারণ করা হলেও জন্মনিবন্ধনের তথ্য একটি ক্রমসঞ্চিত হিসাব হওয়ায় দুই সংখ্যার মধ্যে সরাসরি মিল নেই বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। অন্যদিকে, জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এ পর্যন্ত নিবন্ধিত জন্মের সংখ্যা জনসংখ্যার হিসাবকে ছাড়িয়ে গেছে। কেন জনসংখ্যার চেয়ে জন্মনিবন্ধন এত বেশি এ নিয়ে ব্যাখ্যাও দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাদের মতে, জন্মনিবন্ধনের মোট সংখ্যা থেকে মৃত্যুনিবন্ধনের তথ্য বাদ দেওয়া হয় না। ফলে জীবিত মানুষের সংখ্যা এবং মোট জন্মনিবন্ধনের সংখ্যা এক হওয়ার কথা নয়। এর পাশাপাশি পুরোনো হাতে লেখা জন্মসনদ অনলাইনে অন্তর্ভুক্ত করা, এক ব্যক্তির একাধিক জন্মনিবন্ধন এবং ডুপ্লিকেট বা ভুল তথ্যও এ ব্যবধান বাড়িয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের প্রকৃত জনসংখ্যার সঙ্গে নিবন্ধন তথ্যভান্ডারের তথ্যের বড় ধরনের অসঙ্গতি রয়েছে। প্রায় ১৯ কোটি মানুষের দেশে নিবন্ধন ডাটাবেজে এর চেয়ে অনেক বেশি মানুষের তথ্য থাকা উদ্বেগের বিষয়। এ ধরনের অসঙ্গতি দূর করে নিবন্ধন ব্যবস্থাকে নির্ভুল ও বিশ্বাসযোগ্য করতে হবে। শুধু কম্পিউটার বা প্রযুক্তি দিয়ে মানুষের সেবা নিশ্চিত করা যাবে না। প্রযুক্তির পেছনে থাকা মানুষকেই দায়িত্বশীল হতে হবে। একটি সাধারণ জন্মসনদ নিতে কোনো নাগরিককে যেন ইউনিয়ন পরিষদে বারবার যেতে না হয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জন্মনিবন্ধন ব্যবস্থায় কোনো ধরনের অনিয়ম থাকলে এর প্রভাব শুধু সরকারি তথ্যভান্ডারেই সীমাবদ্ধ থাকে না। জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরির সময় তথ্যের গরমিল, পাসপোর্টে জটিলতা, বয়স নির্ধারণ, উত্তরাধিকার ও সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধসহ নানা ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়তে পারে। একই সাথে অতিরিক্ত জন্মনিবন্ধনের কারণে সরকারের জনসংখ্যাভিত্তিক পরিকল্পনাও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, খাদ্য ও অন্যান্য সেবার পরিকল্পনা তৈরিতে সঠিক জনসংখ্যার তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তথ্যের ভান্ডারে যদি একই ব্যক্তির একাধিক রেকর্ড থেকে যায়, তাহলে প্রকৃত চিত্র নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়বে। এ অবস্থায় জন্মনিবন্ধন তথ্যভান্ডারকে আরও নির্ভুল করতে ডুপ্লিকেট নিবন্ধন শনাক্ত, মৃত ব্যক্তিদের তথ্য হালনাগাদ এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের সঙ্গে জন্মনিবন্ধনের তথ্য সমন্বয়ের ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, শুধু নতুন জন্মনিবন্ধন তৈরি করলেই হবে না, বিদ্যমান কোটি কোটি নিবন্ধনের তথ্যও নিয়মিত যাচাই করতে হবে। কার নামে একাধিক নিবন্ধন রয়েছে, কোথায় তথ্যের অসঙ্গতি রয়েছে এবং কীভাবে এসব তথ্য তৈরি হয়েছে তা খুঁজে বের করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, ২০০১ সালে ইউনিসেফের সহযোগিতায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন চালু করেন এবং সেখানে পিতার পাশাপাশি মায়ের পরিচয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু আদমশুমারি অনুযায়ী দেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি ৫৬ লাখ ৮৬ হাজার ৮৯৯ জন হলেও বর্তমানে জন্ম নিবন্ধনের সংখ্যা ২৪ কোটি ৮৮ লাখ এবং মৃত্যু নিবন্ধন ৫৮ লাখ ১৯ হাজার। নির্ভুল নিবন্ধন না হওয়ায় পরিসংখ্যানে গড়মিল হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি জানান এ বিষয়ে নতুন করে আমাদের ভাবতে হবে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান আইডি, ওয়ান ডিজিটাল ওয়ালেট’ উদ্যোগ বাস্তবায়নে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন সিস্টেম (বিডিআরআইএস) একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক ব্যবস্থা। তৃণমূল পর্যায়ে নিবন্ধন আরও নির্ভুল করতে ইউনিয়ন, ওয়ার্ড ও গ্রামভিত্তিক সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।