আদালতে হাজিরা দিতে এসে আসামির পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে যেন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। কখনো এজলাস থেকে হাজতখানায় নেওয়ার পথে, কখনো হাজতখানায় হস্তান্তরের সময়, আবার কখনো আদালত থেকে কারাগারে ফেরার পথে প্রিজন ভ্যান থেকে পালাচ্ছেন আসামি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে হাতকড়া খুলে, কোথাও পুলিশ সদস্যকে ধাক্কা দিয়ে, আবার কোথাও সুযোগ বুঝে নিরাপত্তাবলয় ভেঙে বেরিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, একবার আদালত থেকে পালানোর অভিজ্ঞতা থাকা আসামিও পরবর্তী সময়ে একই ধরনের সুযোগ পাচ্ছেন। সর্বশেষ গতকাল ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে মো. শরিফুল ইসলামের পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা এ প্রশ্নই নতুন করে সামনে এনেছে। কারণ, যে মামলায় হাজিরা দিতে এসে তিনি এবার পালিয়েছেন, সেটি ছিল আগেরবার আদালত থেকে পালানোর ঘটনায় করা মামলা।
এ ঘটনায় শুধু পুলিশের পাহারার সক্ষমতা নয়, আসামির ঝুঁকি মূল্যায়ন, আদালতে আনা-নেওয়ার প্রটোকল, হাজতখানার নিরাপত্তা, হাতকড়া ব্যবহারের পদ্ধতি এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যদের মধ্যে সমন্বয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে এসব পলায়ন দেখলে সমস্যার মূল কারণ চিহ্নিত করা কঠিন হবে। বরং আদালতে প্রবেশ থেকে কারাগারে ফেরত যাওয়া পর্যন্ত পুরো নিরাপত্তাব্যবস্থা এখনি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
যে মামলায় হাজিরা, সেই মামলাতেই আগে পালিয়েছিলেন : মঙ্গলবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জামসেদ আলমের আদালত থেকে পালিয়ে যান শরিফুল ইসলাম। আদালত ও পুলিশ সূত্র বলছে, একটি মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য তাঁকে কারাগার থেকে আদালতে আনা হয়েছিল। সাক্ষী উপস্থিত না থাকায় ওই দিন সাক্ষ্যগ্রহণ হয়নি। পরে এজলাস থেকে হাজতখানায় নেওয়ার সময় তিনি হাতকড়া খুলে পালিয়ে যান। এর আগে ২০২৫ সালের ১৯ জুনও একইভাবে আদালত থেকে পালিয়েছিলেন শরিফুল। সেদিন ঢাকার তৃতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত থেকে হাজতখানায় নেওয়ার সময় এক পুলিশ সদস্যকে আঘাত করে হাতকড়া খুলে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। পরে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেই ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় যে মামলা হয়েছিল, এবার সেই মামলাতেই হাজিরা দিতে এসেছিলেন তিনি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, আগে আদালত থেকে পালানোর রেকর্ড থাকা একজন আসামিকে দ্বিতীয়বার আদালতে আনার সময় তাঁর জন্য কি বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল? ঝুঁকিপূর্ণ আসামিদের জন্য আলাদা নিরাপত্তা প্রটোকল থাকলে সেটি কীভাবে প্রয়োগ করা হয়েছিল?
আদালত থেকে প্রিজন ভ্যান—কোথাও নিরাপত্তা পুরোপুরি নিশ্চিত নয় : আসামি পলায়নের ঘটনা শুধু আদালত ভবনের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই। আদালতে হাজিরা শেষে কারাগারে ফেরার পথেও নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে এসেছে। এরই মধ্যে গত ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় আদালতে হাজিরা শেষে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে ফেরার পথে প্রিজন ভ্যান থেকে পালিয়ে যান রাজা ওরফে বাদশা ওরফে পিচ্চি রাজা। প্রথম দিকে পুলিশ জানিয়েছিল, গাজীপুরের বাইমাইল এলাকায় শৌচাগারে যাওয়ার কথা বলে তাঁকে গাড়ি থেকে নামানো হলে তিনি পালিয়ে যান। কিন্তু ঘটনার কয়েকটির পর পুলিশের তদন্তে উঠে আসে গাজীপুরের বাইমাইল থেকে নয়, বরং রাজধানীর পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার (প্রিজন ভ্যান) থেকে পালিয়ে যান ৩০ মামলার এই আসামি। এরপর ঘটনাটি তদন্তে দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পাঁচ পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করে তদন্ত কমিটি করা হয়। পরবর্তী সময়ে এ ঘটনায় পুলিশ সদস্য ও পিচ্চি রাজার স্বজনকে গ্রেপ্তারের খবরও প্রকাশিত হয়েছে। এতে বিষয়টি কেবল পাহারার ঘাটতি ছিল, নাকি দায়িত্বপ্রাপ্ত কারও গাফিলতি কিংবা যোগসাজশ ছিল, সেই প্রশ্নও সামনে আসে।
ঢাকার বাইরে একই চিত্র : সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশের বিভিন্ন আদালতেও আসামি পলায়নের ঘটনা ঘটেছে। গত ১৭ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবনের নিচতলায় হাজতখানায় হস্তান্তরের সময় রুবেল হোসেন নামের এক আসামি পুলিশের হাত ফসকে পালিয়ে যান। তাঁর হাতে হাতকড়া থাকলেও তিনি সেটি খুলে ফেলতে সক্ষম হন বলে পুলিশ জানিয়েছিল। পরে প্রায় দুই ঘণ্টার অভিযানে আদালতের পাশের এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে ৩ সেপ্টেম্বর সিরাজগঞ্জ ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের দোতলা থেকে আব্দুল মোমিন নামের এক আসামি লাফ দিয়ে পালিয়ে যান। অভিযোগ অনুযায়ী, হাজতখানার গেটে থাকা পুলিশ সদস্যকে ধাক্কা দিয়ে তিনি বারান্দা দিয়ে দৌড়ে যান এবং পরে দোতলা থেকে নিচে লাফ দেন। ওই বারান্দায় লোহার গ্রিল না থাকার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে আসে। এতে প্রশ্ন ওঠে আদালত ভবনের অবকাঠামোগত নিরাপত্তা নিয়েও। গাজীপুরে চলতি বছরের জুলাইয়ে আদালত পুলিশের হাজতখানা থেকে ৩২ মামলার আসামি সম্রাট মণ্ডল হাতকড়া থেকে এক হাত বের করে পালিয়ে যান। পরে ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ে তাঁকে ময়মনসিংহ থেকে গ্রেপ্তার করে র্যাব।
পলায়নের জায়গাগুলোতে মিল : ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করলে একটি বিষয় স্পষ্ট, আসামি পলায়নের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে স্থানান্তরের সময়গুলো। প্রিজন ভ্যান থেকে নামানো, হাজতখানায় হস্তান্তর, এজলাস থেকে হাজতখানায় নেওয়া কিংবা আদালত ভবনের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার সময়ই নিরাপত্তাবলয়ে ফাঁক তৈরি হচ্ছে।
আদালত প্রাঙ্গণে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ আসা-যাওয়া করেন। আইনজীবী, বিচারপ্রার্থী, সাক্ষী, পুলিশ, কারা সদস্য, কর্মচারী ও সাধারণ মানুষের ভিড়ের মধ্যে আসামিদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন। এর সঙ্গে যদি পর্যাপ্ত জনবল, কার্যকর নজরদারি কিংবা দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যদের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি থাকে, তাহলে পলায়নের সুযোগ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
গত মে মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আদালত থেকে আসামি পালানোর ঘটনায় জনবল সংকট, সমন্বয়ের অভাব ও দায়িত্বে অবহেলার বিষয় উঠে আসে। সেখানে আদালত প্রাঙ্গণে আধুনিক নজরদারি, কার্যকর সিসিটিভি, বডি ক্যামেরা, জিপিএস ট্র্যাকিং এবং ঝুঁকিপূর্ণ আসামি পরিবহনে আলাদা নিরাপত্তা প্রটোকলের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়।
প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থায় কমতে পারে ঝুঁকি : আদালতে আসামি আনা-নেওয়ার ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ মামলায় ভিডিও সংযোগের মাধ্যমে কারাগার থেকেই শুনানির ব্যবস্থা বাড়ানোর বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে ‘ডিজিটাল কোর্ট রুম’ তৈরির উদ্যোগের পেছনেও নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন কারণ ছিল। তবে সব মামলায় এমন ব্যবস্থা কার্যকর করা সম্ভব নয়। তাই ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী আসামিদের শ্রেণিবিন্যাস, আগে পালানোর চেষ্টা বা রেকর্ড থাকা আসামিদের জন্য অতিরিক্ত নিরাপত্তা, আদালতে প্রবেশ ও বের হওয়ার পৃথক পথ, হাজতখানায় নিয়ন্ত্রিত প্রবেশ, কার্যকর সিসিটিভি এবং প্রয়োজনে বডি ক্যামেরা ব্যবহার করা যেতে পারে। একই সঙ্গে শুধু আদালত ভবনের নিরাপত্তা নয়, আদালত থেকে কারাগারে ফেরার পথেও ঝুঁকি মূল্যায়ন জরুরি। প্রিজন ভ্যানের নিরাপত্তা, নির্ধারিত রুট, যাত্রাবিরতির নিয়ম এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যদের জবাবদিহির বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার।
একটি পলায়ন, বহু প্রশ্ন : আসামি পালিয়ে গেলে পরে অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়—এটিই এখন পর্যন্ত অধিকাংশ ঘটনার সাধারণ পরিণতি। কিন্তু এতে মূল প্রশ্নের উত্তর মেলে না। তিনি পালানোর সুযোগ পেলেন কীভাবে? দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যরা কোথায় ছিলেন? হাতকড়া বা নিরাপত্তা সরঞ্জাম ঠিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল কি না? আগে পালানোর রেকর্ড থাকা আসামির ক্ষেত্রে বাড়তি ব্যবস্থা কেন নেওয়া হয়নি? আদালত ভবনের অবকাঠামো ও নজরদারি ব্যবস্থা যথেষ্ট কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর না মিললে একই ধরনের ঘটনা আবার ঘটার আশঙ্কা থেকেই যায়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক (একই সঙ্গে একজন সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ) ড. তৌহিদুল হক ভোরের ডাক’কে বলেন, একজন আসামি আদালত থেকে পালিয়ে গেলে শুধু একটি মামলার বিচারপ্রক্রিয়া ব্যাহত হয় না। মামলার বাদী, সাক্ষী ও ভুক্তভোগীর নিরাপত্তাও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। আর বারবার এমন ঘটনা ঘটতে থাকলে আদালতের নিরাপত্তা এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এমতাবস্তায় তার মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি পলায়ন হিসেবে দেখার সুযোগ কমে আসছে। আদালতে আসামি প্রবেশের মুহূর্ত থেকে হাজতখানা, এজলাস, প্রিজন ভ্যান এবং শেষ পর্যন্ত কারাগারে পৌঁছানোর প্রতিটি ধাপের নিরাপত্তা নতুন করে মূল্যায়ন করা জরুরি। বিশেষ করে যেসব আসামির আগে পালানোর ইতিহাস রয়েছে, তাঁদের জন্য আলাদা ঝুঁকি-ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।