এলপিজির বাজারে নৈরাজ্য চড়া দামে চরম অস্থিরতা

এসএম শামসুজ্জোহা

জাতীয়

বর্তমানে দেশের বাজারে এলপিজি সিলিন্ডারের দামে এক নজিরবিহীন অরাজকতা চলছে। খুচরা বাজারে হু হু করে বাড়ছে বোতলজাত এলপিজির দাম। অনেক

2026-10-06T11:36:07+00:00
2026-10-06T11:36:07+00:00
  বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬,
২২ আশ্বিন ১৪৩৩
 
বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬
জাতীয়
সারাদেশে ভুগছেন ক্রেতারা
এলপিজির বাজারে নৈরাজ্য চড়া দামে চরম অস্থিরতা
সরকারের নির্ধারিত মূল্য আর সিন্ডিকেটের মর্জির মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান
এসএম শামসুজ্জোহা
মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:৩৬ এএম 
সংগৃহীত ছবি
বর্তমানে দেশের বাজারে এলপিজি সিলিন্ডারের দামে এক নজিরবিহীন অরাজকতা চলছে। খুচরা বাজারে হু হু করে বাড়ছে বোতলজাত এলপিজির দাম। অনেক জায়গায় টাকা দিয়েও মিলছে না সিলিন্ডার গ্যাস। হঠাৎই এই দাম বৃদ্ধিতে সারাদেশের ক্রেতারা ভুগছেন চরম হতাশা ও অস্থিরতায়। যেখানে সরকার কর্তৃক ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারিত হয়েছে ১ হাজার ৩০৬ টাকা, সেখানে রাজধানীর খুচরা পর্যায়ে তা বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়। অর্থাৎ প্রতিটি সিলিন্ডারে ভোক্তাদের পকেট থেকে সরকার নির্ধারিত দামের প্রায় ‘দ্বিগুণ’ বা ১ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এই ভয়াবহ মূল্যবৃদ্ধি মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের ওপর এক প্রকার নীরব ডাকাতি ছাড়া আর কিছুই নয়। সরকারি রেটের কথা তুললে অনেক সময় বিক্রেতারা সিলিন্ডার বিক্রি করতেই অস্বীকৃতি জানাচ্ছে, যা বাজার তদারকি ব্যবস্থার চরম ব্যর্থতাকে ফুটিয়ে তুলছে সিন্ডিকেট নামক বেশকিছু অসাধু কোম্পানী। যদিও সরকারি হিসাবে, আগস্টে দেশে প্রায় এক লাখ ৫৭ হাজার টন এবং সেপ্টেম্বরে প্রায় এক লাখ ৫৬ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। এরপরও রাজধানী থেকে প্রত্যন্ত জেলার বিভিন্ন এলাকার বাজারে সিলিন্ডার নিয়ে তৈরি হয়েছে অস্থিরতা। দেশে বছরে এলপিজির চাহিদা ১৭ থেকে ১৮ লাখ টন। প্রায় এক কোটি গ্রাহক এ জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। চাহিদার ৮০ শতাংশ ব্যবহৃত হয় বাসাবাড়ির রান্নায়। তাই বাজারে সিলিন্ডারের সরবরাহ ও দামের এই অস্বাভাবিকতায় সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম বলেন, বিইআরসির নির্ধারিত দামে কোথাও এলপিজি বিক্রি হচ্ছে না। এতে ভোক্তাদের বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। বর্তমানে এলপিজি খাতের অনিয়ম ঠেকাতে বিইআরসি, প্রতিযোগিতা কমিশন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বিএসটিআইসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যকর নজরদারির প্রয়োজন। 

শামসুল আলমের মতে, অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনে লাইসেন্স বাতিল এবং আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে নতুন করে লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়ও বিবেচনা করা যেতে পারে। এদিকে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের দাবি- সরকার নির্ধারিত মূল্যে গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি নিশ্চিত করতে দেশব্যাপী বিশেষ তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ঢাকা মহানগরসহ দেশের ১৬ জেলায় পরিচালিত এ অভিযানে বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে ৩৯টি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সারাদেশে এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডারের এই বিশাল বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে বেশ কয়েকটি কোম্পানি। এলপিজি বিক্রির জন্য সরকারের কাছ থেকে এ পর্যন্ত লাইসেন্স নিয়েছে ৬০টি কোম্পানি। এর মধ্যে চালু আছে মাত্র ২৯টি কোম্পানি। হাতেগোনা কয়েকটি কোম্পানি কেবল আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এলপিজি আমদানির এলসি করছে। এর মধ্যে মাত্র চারটি কোম্পানি এলপিজির বাজারের ৬৮ শতাংশ সরবরাহ দিচ্ছে। বাকি কোম্পানিগুলো ঋণখেলাপি বা অন্যান্য সমস্যার কারণে এলপিজির আমদানির জন্য এলসি করতে পারছে না। সূত্র জানায়, দেশের এলপিজি বাজারের প্রায় ৯৯ শতাংশ বেসরকারি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে। লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অনেক হলেও নিয়মিত আমদানি করে হাতেগোনা কয়েকটি কোম্পানি। বাজারের বড় অংশ রয়েছে এসব প্রতিষ্ঠানের হাতে। 

সেপ্টেম্বরে এলপিজি আমদানিতেও বড় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য দেখা গেছে। ওমেরা পেট্রোলিয়ামের বাজার হিস্যা ১৯ শতাংশ, পেট্রোম্যাক্সের ১৭, মেঘনা গ্রুপের ১৬ এবং যমুনা স্পেসটেকের ১৬ শতাংশ। অর্থাৎ এ চার কোম্পানি প্রায় ৬৮ শতাংশ বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। বিএম এনার্জির হিস্যা ৮ শতাংশ, ইউনাইটেড আইগ্যাসের ৭ এবং ডেল্টার ৪ শতাংশ।  সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ইউনাইটেড আইগ্যাস ২৩ হাজার ৪৩২ টন, যমুনা স্পেসটেক ২০ হাজার ৬০২, বিএম এনার্জি ১৮ হাজার ২৫২, ওমেরা পেট্রোলিয়াম ১৪ হাজার ৩০১, মেঘনার ফ্রেশ ১৩ হাজার ৪০১ এবং পেট্রোম্যাক্স ১০ হাজার ৬০০ টন এলপিজি আমদানি করেছে। সান গ্যাস আমদানি করেছে আট হাজার ৪০০, এসকেএস চার হাজার এক, টিএমএসএস তিন হাজার ৩০০ এবং প্রিমিয়াম এলপি গ্যাস দুই হাজার ৪৫০ টন। তথ্যমতে, প্রতিবছর দেশে এলপিজির চাহিদা ১৭ থেকে ১৮ লাখ টন। ২০৩৫ সালে এই চাহিদা বাড়তে পারে ৪০ লাখ টনে। দেশে এলপিজির ৮০ শতাংশ ব্যবহার হয় রান্নার কাজে। এরপর ১২ শতাংশ শিল্প বা বাণিজ্যিক খাতে। যানবাহনে ৫ শতাংশ এবং অন্যান্য খাতে ব্যবহার হয় ৩ শতাংশ।

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট মাসেও ১৩টি কোম্পানি এলপিজি আমদানি করেছে। কিন্তু সেপ্টেম্বরে এ সংখ্যা ১০টিতে নেমে এসেছে। কেন তিনটি কোম্পানি এলপিজি আমদানি করেনি সে ব্যাপারে খোঁজখবর নিচ্ছেন সরকারি কর্মকর্তারা। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশে চাহিদার ৯৮ শতাংশের বেশি সরবরাহ করে বেসরকারি কোম্পানিগুলো। সুতরাং এ খাতে বড় ধরনের প্রতিযোগিতা না থাকলে সাধারণ গ্রাহকদের জিম্মিদশা কাটবে না। এ বিষয়ে জেএমআই এলপিজির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, জেএমআই বেশি করে এলপিজি আমদানি করে বাজারে সরবরাহ করতে চায়। কিন্তু ব্যাংকের নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে এখন এলসি করা যাচ্ছে না।

সরেজমিন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, এলপিজি সংকটের কথা বলে ভোক্তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত দাম নিচ্ছেন খুচরা বিক্রেতারা। দাম কেন বেশি রাখা হচ্ছে জানতে চাইলে খুচরা বিক্রেতারা দুষছেন পরিবেশক ও ডিলারদের। আবার পরিবেশক ও ডিলাররা অভিযোগ করছেন, অপারেটরদের কাছ থেকে চাহিদা অনুসারে সরবরাহ পাচ্ছেন না তারা। সারাদেশে গ্যাস সিলিন্ডারের বাড়তি দামের কারণ নিয়ে অপারেটর, ডিস্ট্রিবিউটর ও ডিলারদের মধ্যে চলছে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। ডিলার ও ডিস্ট্রিবিউটরদের অভিযোগ, অপারেটররা চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার দিচ্ছেন না। আমদানি ও মজুত থাকার পরও প্ল্যান্ট থেকে সরবরাহ সীমিত করা হচ্ছে। এতে ডিস্ট্রিবিউটররা প্রয়োজনীয় পণ্য পাচ্ছেন না, যার প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারে। জানা যায়, রান্নাঘরের উনুনের আগুন নিভে যাওয়া মানেই মধ্যবিত্তের হৃৎস্পন্দন এক মুহূর্তের জন্য থমকে যাওয়া। আজিমপুরের গৃহিণী রেহেনা আক্তারের মতো হাজারো মানুষের কাছে সিলিন্ডার শেষ হওয়া এখন এক দুঃস্বপ্ন। এই দুঃস্বপ্ন কেবল গ্যাস ফুরিয়ে যাওয়া নিয়ে নয়, বরং বাজারের সেই নিষ্ঠুর বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া নিয়ে, যেখানে সরকারের নির্ধারিত মূল্য আর সিন্ডিকেটের মর্জির মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। একদিকে সরবরাহ নেই বলে কৃত্রিম সংকট, অন্যদিকে দ্বিগুণ দামে পণ্য বিক্রি—এই দ্বিমুখী যাতাকলে পিষ্ট জনজীবন আজ বিপর্যস্ত।

ঢাকার একাধিক ডিস্ট্রিবিউটরের অভিযোগ, কোম্পানির কাছ থেকে চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার সরবরাহ মিলছে না। এমনকি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে কোম্পানির কাছ থেকে পণ্য কিনতে হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। ব্যবসায়ীদের একাংশের দাবি, ডিলারদের বেশি দামে বিক্রি না করে উপায় নেই। কারণ তারা অপারেটরের কাছ থেকে বেশি দামে সিলিন্ডার কিনছেন।  অপারেটরদের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের দাবি, আমদানি কমেনি; দেশে পর্যাপ্ত এলপিজি এসেছে। সরবরাহ কমার সুযোগ নিয়ে ডিস্ট্রিবিউটর, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের একাংশ সিলিন্ডার মজুত করে বাড়তি দামে বিক্রি করছে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের (লোয়াব) সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, আমদানি কমেনি। খুচরা পর্যায়ের বিক্রেতাদের কারণে সমস্যা তৈরি হয়ে থাকতে পারে। কোনো অপারেটর বেশি দামে বিক্রি করছে- এমন প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: