দেশে সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহতা যেন কমছেই না। গত সেপ্টেম্বর মাসে সারা দেশে ৪৪২টি সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ৪২৩ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ৬৭৪ জন। অর্থাৎ, মাসটিতে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে ১৪ জনের প্রাণ গেছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের (আরএসএফ) সেপ্টেম্বর মাসের দুর্ঘটনাবিষয়ক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। ৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং সংগঠনটির নিজস্ব সূত্রের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে মোট দুর্ঘটনার ১৫৪টি, অর্থাৎ ৩৪ দশমিক ৮৪ শতাংশই ছিল মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৩৯ জন, যা মোট নিহতের ৩২ দশমিক ৮৬ শতাংশ।
সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে পথচারীর সংখ্যাও উদ্বেগজনক। এক মাসে ১০৬ জন পথচারী নিহত হয়েছেন, যা মোট মৃত্যুর ২৫ দশমিক ৫ শতাংশ। এছাড়া চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ৫৩ জন।
দুর্ঘটনায় নিহত যানবাহন ব্যবহারকারীদের মধ্যে ১৩৯ জন মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী, ৮৮ জন থ্রি-হুইলারের যাত্রী, ২৬ জন বাসযাত্রী, ২১ জন মাইক্রোবাস, ব্যক্তিগত গাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স ও জিপের আরোহী, ১৯ জন ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও ট্রলির আরোহী এবং ১৮ জন স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের যাত্রী ছিলেন। এ ছাড়া ছয়জন সাইকেল আরোহীও নিহত হয়েছেন।
এসব দুর্ঘটনায় মোট ৬৯১টি যানবাহন জড়িত ছিল। এর মধ্যে ১৬২টি মোটরসাইকেল, ১২৯টি থ্রি-হুইলার এবং ১১৩টি বাস।
আরএসএফের তথ্য বলছে, সেপ্টেম্বরে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে আঞ্চলিক সড়কে। মোট ১৭৮টি দুর্ঘটনা বা ৪০ দশমিক ২৭ শতাংশ ঘটেছে এসব সড়কে। জাতীয় মহাসড়কে ঘটেছে ১৪৫টি বা ৩২ দশমিক ৮০ শতাংশ, গ্রামীণ সড়কে ৫৬টি বা ১২ দশমিক ৬৬ শতাংশ এবং শহরের সড়কে ৬৩টি বা ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশ দুর্ঘটনা।
দুর্ঘটনার কারণ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৬৮টি দুর্ঘটনা বা ৩৮ শতাংশ ঘটেছে যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে। ১০৯টি দুর্ঘটনায় পথচারীকে চাপা বা ধাক্কা দেওয়া হয়েছে। যানবাহনের মুখোমুখি বা পরস্পরের সংঘর্ষে ঘটেছে ৯৮টি দুর্ঘটনা। আর ৬১টি ঘটনায় একটি যানবাহন অন্যটির পেছনে আঘাত করেছে।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে সেপ্টেম্বরে সবচেয়ে বেশি ১৩২টি দুর্ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৩৪ জন। সবচেয়ে কম ২০টি দুর্ঘটনা ঘটেছে সিলেট বিভাগে; সেখানে নিহত হয়েছেন ২১ জন।
একক জেলা হিসেবে গাজীপুরে সবচেয়ে বেশি ৩৮ জন নিহত হয়েছেন। রাজধানী ঢাকায় সেপ্টেম্বর মাসে ৫২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২১ জন নিহত এবং ৪৭ জন আহত হয়েছেন।
সড়ক দুর্ঘটনার পাশাপাশি গত মাসে নৌ ও রেলপথেও প্রাণহানি ঘটেছে। সেপ্টেম্বরে ১১টি নৌদুর্ঘটনায় ১৬ জন নিহত, সাতজন আহত এবং চারজন নিখোঁজ হয়েছেন। অন্যদিকে, ২৩টি রেলপথ দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৯ জন এবং আহত হয়েছেন ছয়জন।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের মতে, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও সড়কব্যবস্থা, বেপরোয়া গতি, চালকদের ঝুঁকিপূর্ণ মানসিকতা, দক্ষতা ও শারীরিক-মানসিক সক্ষমতার ঘাটতি এবং চালকদের নির্ধারিত বেতন ও কর্মঘণ্টা না থাকা দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।
এ ছাড়া মহাসড়কে ধীরগতির যানবাহন চলাচল, তরুণদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো এবং ট্রাফিক আইন সম্পর্কে পর্যাপ্ত জনসচেতনতার অভাবও দুর্ঘটনা বাড়াচ্ছে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।
সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা চালু এবং চালকদের মোটিভেশনাল প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে আরএসএফ।
পাশাপাশি পথচারী নিহতের ঘটনা কমাতে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানোর জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।