সেক্সপিয়ার নাকি শেক্সপিয়ার

নওগাঁ সংবাদদাতা

সাহিত্য ও সংস্কৃতি

ভার্সিটিতে পড়ি। সেকেন্ড ইয়ার। নতুন একটা টিউশনি পেলাম। ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের দিকের গেট দিয়ে বের হলে বকশীবাজার। মিনিট দুয়েক হাঁটলেই উমেশ

2026-10-03T16:33:27+00:00
2026-10-03T16:33:27+00:00
  রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬,
১৯ আশ্বিন ১৪৩৩
 
রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬
সাহিত্য ও সংস্কৃতি
সেক্সপিয়ার নাকি শেক্সপিয়ার
মো: সাজিদ রহমান
নওগাঁ সংবাদদাতা
শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:৩৩ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
ভার্সিটিতে পড়ি। সেকেন্ড ইয়ার। নতুন একটা টিউশনি পেলাম। ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের দিকের গেট দিয়ে বের হলে বকশীবাজার। মিনিট দুয়েক হাঁটলেই উমেশ দত্ত রোডের মুখে নবকুমার ইন্সটিটিউট ও ড. শহীদুল্লাহ কলেজের সাইনবোর্ড। গলিতে ঢুকলেই পুরোনো কিছু বাড়ি। এর একটি শাদিদদের।

এর আগেও ইংলিশ মিডিয়ামের বেশ কয়েকজনকে পড়িয়েছি। তখনো দুনিয়াতে ইন্টারনেট এতটা জেঁকে বসেনি। ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম—কোনোটিই তখনো আবিষ্কৃত হয়নি। সেই সময়েও ওরা ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ, লন টেনিস, ইংলিশ সিরিজ দেখত। পশ্চিমাদের নিয়ে চর্চা করত। ইংরেজি কমিকস, গল্পের বই পড়ত।

ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ুয়াদের যেন একটু ভিন্ন মাইন্ডসেট নিয়ে বেড়ে ওঠা। আমাদের সঙ্গে ঠিক মেলে না। এ দেশে থাকলেও মন পড়ে থাকে অন্য কোথাও। নতুন ছাত্রটিও হয়তো ওরকমই হবে—এমনটাই ভেবেছিলাম।

কিন্তু শাদিদ ছিল অন্য রকম।

ও তখন ক্লাস থ্রিতে পড়ে। আমি ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়াতাম। বেশ শান্ত, অত্যন্ত বিনয়ী। আমার কাছে গল্প শুনতে চাইত। পড়ার ফাঁকে ফাঁকে ওর সঙ্গে গল্প করতাম। দেশের জন্মের ইতিহাসের গল্প শোনাতাম। হুমায়ূন আহমেদ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতাম। বাংলাদেশের নাটক, সিনেমা, খেলা—সবকিছু নিয়েই আলাপ হতো।

আমি নিজেও ওকে পড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে হুমায়ূন আহমেদের ‘জোছনা ও জননীর গল্প’ পড়ে ফেলেছিলাম।

ওকে বলতাম, ‘ঠিক আছে, ইংরেজি গান শোন। এর ফাঁকে বারী সিদ্দিকী, লালন, রবি কিংবা নজরুলের কিছু গানও শোন।’

বলতাম, এ দেশে জন্ম নিয়ে, এই মাটির হাওয়া-বাতাস আর জলে বড় হয়েও নিজের দেশ সম্পর্কে কিছু না জানা বড় ধরনের অন্যায়।

আমার কথা শুনে শাদিদ অবাক হতো। একপর্যায়ে একটু একটু করে বুঝতে শিখল। একটু একটু করে গান শুনতে শুরু করল, দেশের খেলার খবর নিতে শুরু করল। ওর ভালো লাগত। ওর সেই পরিবর্তন দেখে আমার ভীষণ তৃপ্তি হতো।

শাদিদের বাবা ব্যবসায়ী ছিলেন, মা প্রশাসনে চাকরি করতেন। দুজনই ব্যস্ত মানুষ। প্রায় তিন বছর ওকে পড়িয়েছি। ওর বাবা-মা নিশ্চয়ই ওর পরিবর্তন খেয়াল করেছিলেন। এসব বিষয়ে তাঁরা কখনো কিছু বলেননি। আমার ধারণা, তাঁরা অখুশি ছিলেন না।

আমি সাজিদ, ছাত্রের নাম শাদিদ। দুজনের নামও বেশ কাছাকাছি।

ওর মা সালমা অ্যান্টি ডাকতেন, ‘শাদিদ।’

আমি শুনতাম ‘সাজিদ’। মনে হতো, আমাকে আবার কেন ডাকছেন? শাদিদ হাসত। জানাত, আমাকে নয়, ওকেই ডেকেছেন। নামের ভেতরের ‘জ’ আর ‘দ’-এর ফারাক বুঝতে প্রায়ই ভুল হয়ে যেত।

ওকে শেষ পড়িয়েছি প্রায় ২০ বছর আগে। এখন নিশ্চয়ই অনেক বড় হয়ে গেছে। শাদিদ ছিল আমার অত্যন্ত প্রিয় ছাত্র। ভালো থাকুক শাদিদ।

আজ ইংরেজি সাহিত্য পড়াচ্ছি। বলছি, ‘সেক্সপিয়ারের…।’

শাদিদ হাসছে।

‘স্যার, সেক্সপিয়ার নয়, উচ্চারণ হবে শেক্সপিয়ার।’

আমি লজ্জায় পড়ে যাই।

এরকম কত ভুল উচ্চারণ যে ওর কাছ থেকে সঠিকটা শিখেছি!

আজ সাফিনের হাতে শেক্সপিয়ারের একটি পোস্টার দেখে শাদিদের সেই স্মৃতি মনে পড়ে গেল। মনে হলো, বিশ বছর পেরিয়েও কিছু ছাত্র আসলে কোথাও হারিয়ে যায় না। কোনো একটি শব্দ, কোনো একটি দৃশ্য, কোনো একটি মুহূর্ত হঠাৎ তাদের ফিরিয়ে আনে।

ভালো থাকুক শাদিদ।

কর্মকর্তা, সড়ক বিভাগ, ঢাকা।


Loading...
Loading...

সাহিত্য ও সংস্কৃতি- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: