জীবনানন্দের কীর্তনখোলা

নওগাঁ সংবাদদাতা

সাহিত্য ও সংস্কৃতি

বরিশাল গেলে কীর্তনখোলার কাছে যেতেই হয়। ছোট ডিঙি নৌকায় কতক্ষণ কীর্তনখোলার বুকে ভেসে না থাকলে বরিশালে আসা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

2026-09-26T17:00:52+00:00
2026-09-26T17:01:20+00:00
  রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১২ আশ্বিন ১৪৩৩
 
রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সাহিত্য ও সংস্কৃতি
জীবনানন্দের কীর্তনখোলা
—মো. সাজেদুর রহমান সাজিদ
নওগাঁ সংবাদদাতা
শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৫:০০ পিএম  আপডেট: ২৬.০৯.২০২৬ ৫:০১ পিএম
মো. সাজেদুর রহমান সাজিদ
বরিশাল গেলে কীর্তনখোলার কাছে যেতেই হয়। ছোট ডিঙি নৌকায় কতক্ষণ কীর্তনখোলার বুকে ভেসে না থাকলে বরিশালে আসা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। নদীর জলের যে কী দুর্বার আবেদন, কীর্তনখোলার কাছে না গেলে টেরই পাবেন না। বৃহস্পতিবারেও সেটার ব্যতিক্রম হয়নি। বরিশাল ঢুকেই ত্রিশ গোডাউন ঘাটে চলে যাই। নদীপাড়, নদীপাড়ে ঝকঝকে পিচঢালা রাস্তা—বরিশাল যেন নতুন করে বাংলার ভেনিস রূপে ফিরছে। শহরঘেঁষে এরকম দুর্দান্ত সুন্দর নদী আছে বলেই হয়তো জীবনানন্দের জন্ম হয়েছে এই শহরে।

এর আগেই পশ্চিম বগুড়া রোডে জীবনানন্দের জন্মভিটায় ঢুঁ মারি। সড়কের নাম কবির নামে রাখা হলেও বগুড়া রোডের নাম এখনও মুছে যায়নি। জন্মভিটায় গড়ে উঠেছে স্মৃতি পাঠাগার। তখনও সেটার খোলার সময় হয়নি। ভেতরেও যেতে পারিনি। তবে সার্বিক অবস্থা দেখে মর্মাহত হয়েছি। ২০১৯-এ শেক্সপিয়ারের জন্মভিটা দেখার সুযোগ হয়েছিল। প্রবেশে আকাশচুম্বী ফি। তবুও প্রতিদিন হাজারও দর্শনার্থীর ভিড়। সঙ্গে স্যুভেনির বিক্রি। কোটি ডলারের ব্যবসা। শেক্সপিয়ারের সঙ্গে জীবনানন্দের তুলনা চলে না। তবুও বলব, জীবনানন্দ ও তাঁর কবিতার আবেদন হাজার বছরেও কমবে না। এরকম একজন কবির জন্মভিটা কত আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করা যেত। গুণীজনের কদর করতে না পারা জাতি হিসেবে গিনেসে হয়তো আমাদের নাম উঠে যাবে যেকোনো সময়।

বরিশাল শহরের সঙ্গে আমার সম্পর্কের কুড়ি বছর পেরিয়ে গেছে। অল্পদিন হলো পাশ করেছি, টেলিকমে কাজ করি। অফিস থেকে এক মাসের জন্য বরিশাল পাঠিয়ে দিল। উত্তরের ডাঙার ছেলে এসে পড়লাম ডোবার জলে। এই শহরে পরিচিত বলতে তেমন কেউ নেই। দিনে এদিক-সেদিক যাই। সন্ধ্যা হলে শহরে ফিরে আসি। প্রায় সময় সদর রোডের হোটেল আলী ইন্টারন্যাশনালে থাকি।

পাশেই অশ্বিনীকুমার হল। কালচারাল প্রোগ্রাম, রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ হয়। অল্প কিছু দূরে বিবির পুকুর। বাঁধানো সুন্দর হাঁটার পথ করে দেওয়া। পুকুরের জল স্বচ্ছ, কোনো ময়লা নেই। এক কোণায় টং দোকান। খুব ভালো আদা-লেবু চা বানায়। সময় পেলে টংয়ে যাই। চা খেতে খেতে বরিশাইল্লা মানুষ দেখি।

একবার মন চাইলো, লঞ্চে ঢাকা ফিরব। সুন্দরবন-৭ নামে অত্যাধুনিক লঞ্চ নামছে। শেরেবাংলা রোডে টিকিট কাটার জন্য কাউন্টার খুঁজতেছি।

এক দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলাম, সুন্দরবনের কাউন্টার কোন দিকে?

সে জানে না। শুনে এগোতে গিয়েই দেখি সেই কাউন্টার।

সামনেই কাউন্টার, অথচ জানেন না? এইটা কোন কথা? আমি ফিরে এসে তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম।

‘হেইয়া জাইন্না মোর কাম কী!’

একথা শুনে সেদিন লোকটার ওপর অসন্তুষ্ট হয়েছিলাম। পরে বুঝেছি, এটা একটা অসাধারণ কথা, এক ভিন্ন দার্শনিক তত্ত্ব। জীবনে বহু মানুষের কাছে এই দর্শনের পাঠ শুনেছি। সেই দোকানদারের কাছে সেটার হাতেখড়ি হয় মাত্র।

সুন্দরবন-৭-এ কেবিন নিয়েছিলাম। সন্ধ্যার আগে আগে বরিশাল নদীবন্দর ছেড়ে কীর্তনখোলায় ভাসতে থাকে। কেবিন ছেড়ে বের হয়ে আসি। উপরের খোলা ডেকের ওপর চলে যাই। আকাশে চাঁদ, চাঁদের আলো নদীর জলে পড়ে সুন্দর দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। বেশ লাগে দেখতে। কয়েকজন ছেলে গান গাচ্ছে। সঙ্গে গিটারও আছে। কেউ কেউ গল্প করছে। রাত গভীর হতে থাকে। শব্দ কমে আসে। নদীর বুক চিরে সুন্দরবন-৭ এগিয়ে যাচ্ছে। কী শীতল বাতাস! ঘোর গরমেও ঠাণ্ডা লাগার ভয় করছে। এরকম একটা পরিবেশ ছেড়ে কেবিনে যেতে ইচ্ছে হয় না। ডেকের ওপরই বসে থাকি। আহ, ভ্রমণ কত সুন্দর হতে পারে! আর লঞ্চে জার্নি করা হয়নি। সেই স্মৃতির জাবর কাটতে বরিশাল লঞ্চঘাটেও ঢুঁ মারি।

সে সময়ের বরিশাল মফস্বলের মতো ছিল। বেশি আপন মনে হতো। এখন বরিশালে কসমোপলিটান ভাব এসেছে। তবুও ভালো লাগা কমেনি। এক ফাঁকে ব্রজমোহন কলেজেও ঢুকে পড়ি। প্রাচীন ও সুন্দর ভবনগুলো এখনও মুগ্ধতা ছড়িয়ে যাচ্ছে। কলেজ ক্যাম্পাসে জীবনানন্দ দাশ চত্বর দেখতে পাই।

সাগরদী, বান্দ রোড, বাইপাস ধরে নথুল্লাবাদের দিকে যাই। এর আগে সড়কের অফিস নজরে পড়ে। বৃষ্টির প্রকোপ বাড়তে থাকে। দেখে-শুনে ভুরঘাটা চলে যাই। আমাদের বরিশাল আগমনের মূল কারণ সেখানে যাওয়া। শেষ পর্যন্ত সেখানে পৌঁছাই।

ফেরার সময় অমল দা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্মভিটায় নিয়ে যান। ততক্ষণে সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। পাথারিয়া বাজার পেরিয়ে পূর্ব মাইজপাড়া। সুনীলের অবস্থা জীবনানন্দের চেয়ে খারাপ। ‘কেউ কথা রাখেনি’ কবিতার সব উপমা, স্থান কিংবা চরিত্র সুনীলের বাড়ির আশপাশেই ছিল। সঙ্গে থাকা এক ভাই কিছুটা ধারণা দিল।

পাথারিয়া বাজারের দুধ চায়ের কথা উল্লেখ না করলে অন্যায় হবে। এক কাপ খেয়ে, আরও এক কাপ হাতে নিয়ে গাড়িতে উঠে পড়ি। ড্রাইভার কুদ্দুস ঢাকার দিকে ছুটতে থাকে।

মো. সাজেদুর রহমান সাজিদ, কর্মকর্তা, সড়ক বিভাগ, ঢাকা


Loading...
Loading...

সাহিত্য ও সংস্কৃতি- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: