দলীয় নেতাকর্মীদের নানা কর্মকান্ডে বিব্রত সরকার ও বিরোধী দল। রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার, সংঘাত-সহিংসতা, দখল, চাঁদাবাজি, দলীয় কোন্দল এবং কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে জনভোগান্তির মতো অভিযোগে প্রশ্ন উঠছে রাজনৈতিক দলগুলোর শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে। মাঠপর্যায়ের এসব ঘটনা শুধু দলীয় ভাবমূর্তিই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, এর প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশেও। ফলে সরকার ও বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উভয় দলের নেতারা বলছেন, ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক স্বার্থে দলের পরিচয় ব্যবহার করার সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানী ও দেশের অন্যান্য স্থানে সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ে হামলা, ভাঙচুর ও জমি দখলের অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার এবং ইসিবি এলাকায় কনটেন্ট নির্মাতা সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় স্থানীয় বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে কয়েকজনের নাম সামনে এসেছে। এসব ঘটনার তদন্ত চলছে এবং ইতোমধ্যে কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এছাড়া, রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়াসহ তাকে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করতে বলায় ইতিমধ্যে তিনি পদত্যাগ করেছেন। এছাড়া, নেতা-কর্মীদের আরো একাধিক ঘটনায় বিব্রত সরকার।
জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক অভিযোগের পর দলের শীর্ষ নেতৃত্ব বিতর্কিত ব্যক্তিদের তালিকা ও তাদের কর্মকান্ডের তথ্য সংগ্রহ করছে। তৃণমূল থেকে পাওয়া অভিযোগ যাচাই-বাছাই করে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। যেসব ব্যক্তি বারবার চাঁদাবাজি, জমি দখল, সহিংসতা, ভাঙচুর কিংবা দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছেন, তাদের ওপর বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে। তৃণমূল থেকে এসব অভিযোগের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
অন্যদিকে, সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামামের নানা কর্মকান্ড নিয়ে বিব্রত হয়ে ইতিমধ্যে তাকে দল থেকে বহিস্কার করেছে বাংলাদেদশ জামায়াতে ইসলামী। এর রেশ না কাটতেই হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, সরকারি কাজে বাধা এবং দায়িত্ব পালনরত এক নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগে জামায়াতের নেতা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। মামলার এজাহারে বলা হয়, গত বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা ৪০ মিনিটের দিকে মদিনা থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটের (বিজি-৩৩৮) যাত্রীদের চাপের কারণে বিমানবন্দরের ৮ নম্বর লাগেজ বেল্ট এলাকায় ট্রলি সংকট দেখা দেয়। এতে লাগেজ পেতে দেরি হওয়ায় যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। এমন ঘটনায় বিব্রত জামায়াতের হাই কমান্ড। এখন তার বিরুদ্ধে কি ধরনের সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া যায় সে বিষয়ে ভাবছে দলটি। সরকার ও বিরোধী দলের নেতারা বলছেন, ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক স্বার্থে দলের পরিচয় ব্যবহার করার সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না। একইসঙ্গে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দলের বিরুদ্ধে আনা মিথ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগও যাচাই করে মোকাবিলা করা হবে। দলগুলোর হাইকমান্ড দুই ধরনের পদক্ষেপের পথে এগোতে চায়। প্রমাণিত অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মিথ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আনা অভিযোগ রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমতাবস্থায় সরকার ও বিরোধীদলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে রাখা। বিশেষ করে বিভিন্ন এলাকায় ক্ষমতাসীন দলের পরিচয়ধারী নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে প্রভাব বিস্তার, ব্যবসা-বাণিজ্যে হস্তক্ষেপ এবং বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠছে। এসব অভিযোগের কোনো কোনোটি নিয়ে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। তবে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কেউ যাতে বিশেষ সুবিধা না পায় এমন দাবি উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে।
অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলোর নেতাকর্মীদের কর্মকান্ড নিয়েও রয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। সরকারবিরোধী বিভিন্ন কর্মসূচি, মিছিল, সমাবেশ ও অবস্থান কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে অনেক সময় সড়কে যানজট ও জনভোগান্তির সৃষ্টি হচ্ছে। কোথাও কোথাও পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনাও দেখা যাচ্ছে। বিরোধী দলগুলোর দাবি, শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার। তবে কর্মসূচির নামে সাধারণ মানুষের চলাচলে যাতে অযথা বাধা সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকার তাগিদ রয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মতপার্থক্য থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দলীয় নেতাকর্মীদের অনিয়ন্ত্রিত আচরণ সেই রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে সংঘাতের দিকে নিয়ে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীদের কর্মকান্ডের দায় শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ওপরও এসে বর্তায়। এদিকে, দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সরকার বিরোধীদলের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পক্ষ থেকে নেতাকর্মীদের সতর্ক করা হচ্ছে। বিতর্কিত কর্মকান্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আইন ভঙ্গ করলে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে এমন অবস্থান নেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে এর বাস্তবায়ন নেই। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কর্মসূচিও থাকবে কিন্তু সেই কর্মসূচির কারণে যেন নাগরিক জীবন বিপর্যস্ত না হয়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয়কে ব্যবহার করে কেউ যেন বেআইনি সুবিধা নিতে না পারে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। সব মিলিয়ে নেতাকর্মীদের নানা কর্মকান্ড এখন সরকার ও বিরোধী দল দুই পক্ষের জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ। দলীয় শৃঙ্খলা, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সাধারণ মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে না পারলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আস্থার সংকট আরও বাড়তে পারে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, কেউ অপরাধ করলে তাকে দলীয় বিবেচনায় ছাড় দেয়া হবে না। কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ আসলে তদন্তে প্রাথমিক সত্যতা প্রমাণিত হলেই ব্যবস্থা নেয়া হবে। তাছাড়া, দলের কেউ কোন অপরাধের সাথে জড়িত থাকলেও সাংগঠনিকভাবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানিয়েছেন, দলের নামে সন্ত্রাস ও অপরাধমূলক কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে আমরা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে রয়েছি। সম্প্রতি তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, দলের পরিচয় ব্যবহার করে কেউ অনৈতিক, বেআইনি, সহিংস বা অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়ালে তাকে কোনও ছাড় দেওয়া হবে না। বিভিন্ন ঘটনায় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের কয়েক হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তবে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাকে অপরাধী বলা যাবে না। সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রতিটি ঘটনায় পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রকৃত সম্পৃক্ততা যাচাই করইে ব্যবস্থা নেয়া হবে।