রাজধানীতে বসবাসকারীদের নিত্যদিনের দুর্ভোগের নাম হচ্ছে যানজট। এ যানজটের কবলে পড়ে কর্মঘন্টা নষ্টের পাশাপাশি নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। এ যানজট নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নানা উদ্যোগ গ্রহণ করলেও এর তেমন একটা সুফল আসেনি। ফলে নতুন করে যানজট নিয়ন্ত্রণে ঢাকার সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী বাস টার্মিনাল ফুলবাড়িয়া-গুলিস্তান বাস টার্মিনাল, গাবতলী বাস টার্মিনাল এবং মহাখালী বাস টার্মিনাল সরানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী বাস টার্মিনাল যাবে কাঁচপুরে, ফুলবাড়িয়া-গুলিস্তান বাস টার্মিনালটি কেরানীগঞ্জে স্থানান্তর হবে। মহাখালী বাস টার্মিনাল অস্থায়ীভাবে যাবে পূর্বাঞ্চলে এবং পরে স্থায়ীভাবে টঙ্গির কাছে স্থানান্তরিত হবে। গাবতলী আন্তঃনগর বাস টার্মিনাল হেমায়েতপুর। তবে চলতি বছরেই সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী বাস টার্মিনাল কাঁচপুরে স্থানান্তর করা হচ্ছে। বাকিগুলো পর্যায়ক্রমে সরানো হবে। ফলে কাঁচপুরে থেকে ঢাকায় আসা ও কাঁচপুরে যাওয়া যাত্রীদের জন্য চালু হচ্ছে বিশেষ শাটল সার্ভিস। এতে দূরপাল্লার বাসযাত্রীদের রাজধানীতে প্রবেশ ও গন্তব্যে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে পরিবহন ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) উদ্যোগে এটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরানো এবং যানজট কমানোর লক্ষ্যে সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী বাস টার্মিনাল কাঁচপুরে স্থানান্তরের উদ্যোগ ঘিরে নতুন করে তৎপরতা শুরু হয়েছে। শিগগিরই টার্মিনাল হস্তান্তরের কার্যক্রম সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে কাঁচপুরে তিনটি প্যাকেজের মাধ্যমে এই আধুনিক টার্মিনালের নির্মাণকাজ পরিচালিত হচ্ছে। পুরো প্রকল্পের বর্তমান গড় অগ্রগতি ৩০ শতাংশ। এর মধ্যে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের কাজ ৭৫ শতাংশ এবং অভ্যন্তরীণ প্ল্যাটফর্ম তৈরির কাজ ২৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই প্রাথমিক কাজ শেষ করে টার্মিনাল চালু হচ্ছে। প্রায় ১২ একর জায়গার ওপর নির্মাণাধীন কাঁচপুর বাস টার্মিনালে প্রায় ৪০৫টি বাসের ধারণক্ষমতা, ৩৭৮টি বাস পার্কিং, ২২টি বাস বে, ৫টি ওয়াশিং বে এবং ৪০টি গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এছাড়া যাত্রীদের সুবিধার্থে টার্মিনালে ৪৮০ আসনের ওয়েটিং জোন, ১০৬টি টিকিট কাউন্টার, পুরুষদের জন্য ১০টি এবং নারীদের জন্য ৬টি টয়লেট নির্মাণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ৬৫ বর্গমিটার অফিস স্পেস ও ৫০ বর্গমিটার ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল রুমের সংস্থান রয়েছে। এদিকে, সায়েদাবাদ-যাত্রবাড়ি বাস টার্মিনাল কাঁচপুরে স্থানান্তরের পরিকল্পনাকে ঘিরে ঢাকামুখী যাত্রীদের যাতায়াত সহজ করতে বিশেষ ‘শাটল সার্ভিস’ চালুর উদ্যোগের কথা সামনে এসেছে। কাঁচপুর থেকে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যে যাত্রী পরিবহনের জন্য এ ধরনের সেবা চালু করা হলে দূরপাল্লার বাস থেকে নেমে ঢাকায় প্রবেশের ক্ষেত্রে যাত্রীদের ভোগান্তি কমতে পারে। একই সাথে রাজধানীর প্রবেশমুখে যানজট নিয়ন্ত্রণ এবং গণপরিবহন ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনার সুযোগ তৈরি হবে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নগরবাসীর পাশাপাশি সুফল পাবে ঢাকায় আসা যাওয়া যাত্রীরা।
সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাজধানীর প্রবেশমুখে দূরপাল্লার বাসের চাপ কমানো এবং সড়কে যানবাহনের বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে কাঁচপুরকে গুরুত্বপূর্ণ পরিবহনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। বর্তমানে সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী বাস টার্মিনাল ও আশপাশের সড়কে দূরপাল্লার বাস, গণপরিবহন এবং ব্যক্তিগত যানবাহনের চলাচল ঘিরে তীব্র যানজট তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে অফিসের সময় এবং ছুটির আগে-পরে এই চাপ আরও বাড়ে। ফলে সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী সরানোর কোন বিকল্প দেখছে না কর্তৃপক্ষ। এদিকে, নতুন ব্যবস্থায় কাঁচপুরে আসা যাত্রীরা শাটল সার্ভিসের মাধ্যমে রাজধানীর নির্ধারিত গন্তব্যে যাতায়াতের সুযোগ নিয়েও পরিকল্পনাও নেয়া রয়েছে। এতে দূরপাল্লার বাস থেকে নেমে ঢাকার ভেতরে যাওয়ার জন্য বিকল্প পরিবহন পাওয়া সহজ হতে পারে। তবে শাটল সার্ভিসের নির্দিষ্ট রুট, ভাড়া, সময়সূচি ও চালুর তারিখ আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি।
যানজট কমানোর লক্ষ্য : রাজধানীর সড়কে যানবাহনের চাপ কমাতে দীর্ঘদিন ধরেই আন্তজেলা বাস টার্মিনালগুলো শহরের বাইরে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে। নগরীর ভেতরে দূরপাল্লার বাস প্রবেশ, টার্মিনালকেন্দ্রিক যানজট এবং সড়কের ওপর যাত্রী ওঠানামার কারণে বিভিন্ন এলাকায় চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। কাঁচপুরে টার্মিনাল স্থানান্তর করা হলে এসব চাপের অনেকটা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব বলে আশা করা হচ্ছে। তবে টার্মিনাল স্থানান্তরের পাশাপাশি কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত সংযোগ বাস এবং যাত্রীদের নিরাপদ ওঠানামার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় নতুন টার্মিনালে যাতায়াতের বাড়তি সময় ও খরচ যাত্রীদের জন্য নতুন ভোগান্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে।
নির্ধারিত রুটে চলবে শাটল বাস : পরিকল্পনা অনুযায়ী, কাঁচপুরে টার্মিনালে পৌঁছানো যাত্রীদের রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যে নিতে শাটল সার্ভিস কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী, গুলিস্তানসহ বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াতের সুবিধা বিবেচনায় নিয়ে রুট নির্ধারণ করা হলে যাত্রীরা সহজে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন। বিশেষ করে কর্মদিবসের সকাল ও বিকেলের ব্যস্ত সময়ে পর্যাপ্ত শাটল বাস চালু রাখা জরুরি। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট সময়সূচি, নির্ধারিত স্টপেজ, সাশ্রয়ী ভাড়া এবং বাসের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে যাত্রীদের ভোগান্তি কমানো কঠিন হবে।
যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ার আশঙ্কা : টার্মিনাল কাঁচপুরে স্থানান্তরিত হলে দূরপাল্লার যাত্রীদের একটি অংশকে ঢাকার কেন্দ্রীয় এলাকায় পৌঁছাতে অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিতে হতে পারে। এতে যাতায়াতের সময় ও খরচ বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। বিশেষ করে স্বল্প আয়ের যাত্রী, চাকরিজীবী ও শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনায় রেখে সংযোগ পরিবহনের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি নতুন টার্মিনালে পর্যাপ্ত টিকিট কাউন্টার, অপেক্ষাকক্ষ, শৌচাগার, নিরাপত্তাব্যবস্থা, পার্কিং এবং যাত্রীসেবার প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। টার্মিনাল চালুর আগেই এসব অবকাঠামো প্রস্তুত করা না গেলে যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়তে পারে।
যাত্রীসেবায় বাড়তি গুরুত্ব : কাঁচপুর থেকে ঢাকায় যাতায়াতের ক্ষেত্রে শাটল সার্ভিস চালু হলে নারী, শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী যাত্রীদের সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। টার্মিনালে নিরাপদ অপেক্ষাকক্ষ, পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা, টিকিট কাউন্টার এবং তথ্যকেন্দ্র থাকলে যাত্রীসেবা আরও কার্যকর হতে পারে। বিশেষ করে অফিসের সময় ও সন্ধ্যার ব্যস্ত সময়ে পর্যাপ্ত শাটল বাস না থাকলে যাত্রীদের দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হতে পারে। তাই যাত্রীর চাপ বিবেচনায় নিয়ে বাসের সংখ্যা ও চলাচলের সময়সূচি নির্ধারণ প্রয়োজন। সব মিলিয়ে, কাঁচপুরে আন্তজেলা বাস টার্মিনাল স্থানান্তরের পরিকল্পনার সাথে শাটল সার্ভিস কার্যকরভাবে চালু করা গেলে রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থাপনায় নতুন পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি রাতের যাত্রীদের নিরাপত্তা ও লাগেজ পরিবহনের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখার দাবি যাত্রীদের। সংশ্লিষ্টদের মতে,এ উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ও যাত্রীসেবার মানের ওপর। সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল স্থানান্তর এবং বিশেষ শাটল সার্ভিস চালু হলে রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থায় নতুন অধ্যায় সূচিত হতে পারে। তবে যানজট কমানোর পাশাপাশি যাত্রীদের ভোগান্তি যেন না বাড়ে, সেটিই হবে এই উদ্যোগের বড় পরীক্ষা। রাজধানী ঢাকা মহানগরীর যানজট নিরসন এবং গণপরিবহন ব্যবস্থা সুশৃঙ্খল করার লক্ষ্যে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে দূরপাল্লার বাসগুলো শিগগিরই কাঁচপুরে নির্মাণাধীন নতুন টার্মিনালে স্থানান্তর করা হবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম। তিনি বলেন, ঢাকা মহানগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থা আধুনিকায়নে প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন বাস্তবায়নে দ্রুততম সময়ে কাঁচপুরে টার্মিনাল নির্মাণের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। প্রাথমিক পর্যায়ে অস্থায়ী শেড নির্মাণ করে চট্টগ্রাম, সিলেট, কুমিল্লা ও নোয়াখালীসহ দূরপাল্লার ১৬টি জেলার বাস সায়েদাবাদ থেকে কাঁচপুরে স্থানান্তর করা হবে। পরবর্তীতে এখানে স্থায়ী অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে। তিনি আরও জানান, দূরপাল্লার বাসগুলো রাজধানীর মূল শহরে প্রবেশ না করায় ঢাকা শহরের যানজট উল্লেখযোগ্য হারে কমবে।